ডাকটিকিটের আজব-দেশ এবার কলকাতায়

দেড়শো বছরের বেশি সময় ধরে অ্যালিস, আজব ওয়ান্ডারল্যান্ডে নানা কাণ্ডকারখানা করে বেড়াচ্ছে। বিদেশিনীর কথা বাদ দিলেও আমাদের রয়েছে কঙ্কাবতীর আজব কীর্তি। গাছপালা, জন্তু জানোয়ার ভীষণরকম প্রাণবন্ত হয়ে কঙ্কাবতী কিংবা অ্যালিসের গল্পে হাজির হয়েছে। খোদ কলকাতায় বসে আমারও মনে হচ্ছিল যেন আমি অ্যালিস বা কঙ্কাবতীর মতো অন্য জগতে এসে গেছি। সৌজন্যে ভারতীয় ডাক বিভাগ (India Post)।
ছোটোদের মনে তো অ্যালিস আছেই, বড়োদের মনেও সেই আজব দেশ গড়ে দিতে পেরেছেন ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর সৃষ্টিকর্তা লিউইস ক্যারল বা ‘কঙ্কাবতী’র সৃষ্টিকর্তা ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়। কেন মনে নেই সুকুমার রায় বা উপেন্দ্রকিশোরের গল্প? ঘুড়ি, দৈত্যদানোর রাজ্যে পৌঁছাতে সময় লাগত না মোটেই। না, তবে রূপকথা মোটেই নয়, বাস্তবের কথাই বলছি। একদম খোদ সল্টলেকের সিসি ব্লকে অবস্থিত ডাকটিকিটের রাজ্যে পৌঁছে গেলাম। ভালো করে বললে, ফিল্যাটেলিক পার্ক (Philatelic Park)।
ডাকটিকিট নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা জানেন, ফিল্যাটেলি শব্দের অর্থই হল ডাকটিকিট সংক্রান্ত। পৃথিবীর বহু মানুষই কিন্তু ডাকটিকিট সংগ্রহে আগ্রহ দেখান। উপমহাদেশের প্রথম ডাকটিকিট চালু করা হয় সেই কবে- ১ অক্টোবর, ১৮৫৪। এক পয়সা মূল্যের পোস্টকার্ড এবং আধা আনা মূল্যের খামে ভারতের যে কোনও অংশে চিঠি পাঠাবার ব্যবস্থা শুরু হয়। আজকাল চিঠি লেখার চল কমে গেছে যুগের নিয়মে। কেবল জগজিৎ সিং, হৈমন্তী শুক্লা, পঙ্কজ উদাসের সেই কালজয়ী গানগুলোতেই যেন চিঠি তার ঐতিহ্য রেখে গেছে। এমনকি বেশ কিছু বছর ধরে ডাক টিকিট সংগ্রহও ক্রমাগত নিম্নমুখী। তাই এই নেশা ও শিল্পকে উৎসাহিত করতে ভারতীয় ডাক বিভাগ নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ডাক টিকিট সংগ্রাহকদের জন্য ডাকঘরের বিশেষ কাউন্টার থেকে সংগ্রহের উপযুক্ত স্ট্যাম্প বিক্রি করা হচ্ছে। দেশের প্রধান ডাকঘরগুলিতে ২০০ টাকা দিয়ে ডাক টিকিট সংগ্রহ খাতা খুলে, সহজেই ডাক টিকিট বা স্পেশাল কভার সংগ্রহ করা সম্ভব। এমনকি যে কেউ হাজার টাকা দিয়ে একটি ফিল্যাটেলিক ডিপোজিট এক্যাউন্ট খুললে পৃথিবীর যে কোনো দেশে বসে ডাকটিকিট পেয়ে যেতে পারেন।
উপমহাদেশের প্রথম ডাকটিকিট চালু করা হয় সেই কবে- ১ অক্টোবর, ১৮৫৪। এক পয়সা মূল্যের পোস্টকার্ড এবং আধা আনা মূল্যের খামে ভারতের যে কোনও অংশে চিঠি পাঠাবার ব্যবস্থা শুরু হয়। আজকাল চিঠি লেখার চল কমে গেছে যুগের নিয়মে।
তবে অল্প সংখ্যায় এই ডাক টিকিট ছাপা হওয়ার দরুন, স্মারক ডাক টিকিট শুধুমাত্র এই নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। তাই বলাই বাহুল্য যে নানাভাবে ডাক টিকিটকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যেই ডাকবিভাগ উৎসাহীদের জন্য এইসব ব্যবস্থা করেছেন। কলকাতার বুকে সেই ডাকটিকিটের পার্ক গড়ে তোলার পেছনেও ভারতীয় ডাক টিকিটের উদ্দেশ্য হল, মানুষের ডাকটিকিট জমানোকে আরও উৎসাহিত করা।
আরও পড়ুন: ব্রিটিশ কলকাতাতেও ছিল কোয়ারেন্টিন হাসপাতাল
সল্টলেকের সিসি ব্লকের পোস্টঅফিসটি বেশ সুন্দর ছোট্ট, ছিমছাম। পাশের একখণ্ড জায়গাতেই গড়ে উঠেছে ডাকটিকিটের উদ্যান। ওখানেই শুনলাম গতবছর ২২ এপ্রিল পার্কটির উদ্বোধন করেন মুখ্য পোস্টমাস্টার জেনারেল মারভিন আলেকজান্ডার। উপস্থিত ছিলেন কলকাতা (Kolkata) সার্কেলের পোস্টমাস্টার নীরজ কুমার। ৯১ ফুট লম্বা ও ২৫ ফুট চওড়া পার্কে খুঁজলেই পাওয়া যাবে নানা বর্ণের রঙিন ডাকবাক্স। সাধারণভাবে যেগুলি আমরা পোস্ট অফিসের বাইরে লাল রঙের দেখে থাকি।
ডাকটিকিট চিরকালই আমরা দেখেছি চিঠিপত্রের ওপর বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলিল দস্তাবেজে। বাড়িতে একসময় যখন প্রিয়জনের চিঠি আসত, তখন খাম বা ইনল্যান্ড লেটারের নীলাভ শরীরের এক কোণে ডাকটিকিট সাঁটানো থাকত। যুগের হাওয়ায় ক্রমশ পাল্টেছে যোগাযোগের মাধ্যম। এখন ফোরজি যুগে বাস করে মনে হয়, সে যেন কতকাল আগের কথা। তাই বুঝি ডাকটিকিটের উদ্যানে গিয়ে মনে হচ্ছিল অন্য জগতে পৌঁছে গিয়েছি। হ্যাঁ, সময়ের এই বিবর্তন কিন্তু ডাকটিকিটেও ধরা রয়েছে। ডাকটিকিটের রেপ্লিকা করে তাতে ধরা হয়েছে ভারতীয় ডাক টিকিটের নানা সময়।
ডাকটিকিট চিরকালই আমরা দেখেছি চিঠিপত্রের ওপর বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলিল দস্তাবেজে। বাড়িতে একসময় যখন প্রিয়জনের চিঠি আসত, তখন খাম বা ইনল্যান্ড লেটারের নীলাভ শরীরের এক কোণে ডাকটিকিট সাঁটানো থাকত।
কিংবদন্তি গায়িকা এবং ভারতরত্ন লতা মঙ্গেশকরের (Lata Mangeshkar) সম্মানে এবার একটি ডাকটিকিট ইস্যু করতে চলেছে ভারত সরকার। শুধু এই শিল্পী নন, ভারতীয় ডাকটিকিটের বিপুল ভাণ্ডারে কত কী যে রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই! পশু, পাখি, স্থাপত্য, শিল্পকলা, ঐতিহ্য, কৃতী মানুষ সব কিছুই ডাকটিকিটে স্থান পেয়েছে। তারই অল্প নমুনা রয়েছে সল্টলেকের সিসি ব্লকের ফিল্যাটেলিক পার্কে। প্রতিটা ডাকটিকিটে রয়েছে তার মূল্য এবং প্রকাশকাল। অর্থাৎ কোন বছর কোন ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়েছিল তা একনজরে চোখে পড়বে। কোভিডকালে (Covid-19) ডাককর্মীরা কীভাবে জরুরি পরিষেবা দিয়েছিলেন, ইত্যাদি বিষয়ও ডাকটিকিটে স্থান পেয়েছে।
বাঙালি হিসেবে গর্ব হবে, যখন চোখে পড়বে দ্বিতীয় হুগলি সেতু (Second Hooghly Bridge), ডাবল ডেকার বাস কিংবা যামিনী রায়ের (Jamini Roy) আঁকা চিত্রও ঠাঁই পেয়েছে ডাকটিকিটের রেপ্লিকায়। তাতেই রয়েছে হরেক ফুল, সিংহ, হাতি ইত্যাদি বন্য জন্তু, ময়ূর বা পেঙ্গুইনের মতো পাখির উপস্থিতি। ছোটোদের ভালো লাগবে পার্কের দোলনা, বাঁশের তৈরি ছোট্ট সাঁকো এবং সুদৃশ্য টায়ার দিয়ে তৈরি ঠেলাগাড়ি দেখতে। তবে পার্ক থেকে বেরিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে চোখ রেখে মনে হল, আবার চিঠির যুগে ফিরে যাই, “চিঠি পেলুম চখাচখির বালুচরের কিচিমিচি,/ ঢেউ-এ ঢেউ-এ বর্ষা সেথা লিখে গেছে কত কি কি!”