জেলখানায় লড়াই, সাহসী কমরেডরা নিহত

আমাদের ওয়ার্ডের পরেই উঁচু টিনের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা যে ওয়ার্ডটা ছিল, তাতে আঠারো বছর এখনো হয়নি, এমন বন্দিরা থাকত। সেখানেও বেশ কিছু ‘নকশাল’ ছেলে ছিল। আমাদের ওয়ার্ড যেখানে শেষ হয়ে টিনের পাঁচিল শুরু হয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ‘বয়েজ ফাইলের’ কয়েকটা ছেলের সঙ্গে আমাদের ওয়ার্ডের কেউ নাকি কথা বলাবলি করতে গেলে অ্যাসিসটেন্ট মেটরা তাদের সরিয়ে দিতে যায়। বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ছেলেরা ধরাম ধরাম করে টিনের দেওয়ালে ইট পাটকেল ছুঁড়ে মারা আরম্ভ করলে একজন জেল সেপাই বাঁশি বাজাতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে পাগলি ঘন্টি বেজে ওঠে।
সকালবেলা ওয়ার্ডের গেট খুলে দেওয়ার পর আমরা বারান্দা-রেলিং ঘেরা জায়গাটুকুতে ঘোরাফেরা করতে পারি, স্নান-পায়খানা করে নিতে পারি। আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ টিফিন দেওয়া হলে বন্দিদের ওয়ার্ডে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দেওয়া হয়। ওয়ার্ডে ঢোকার মূল গেটে সব সময় তালা দিয়ে একজন জেল সেপাই ডিউটিতে থাকেন। লোহার গ্রিলের গেটে শেকল দিয়ে একটি তালা বন্ধ অবস্থায় থাকে। চাবি সেপাইয়ের কাছে।
(গত পর্বের পর)
পাগলি ঘণ্টা বাজতেই আমি ডিউটির জায়গায় চলে গেলাম। গেটের শেকলে বাঁধা তালাটা ছিল বাইরের দিকে। ইট-পাটকেলের ভয়ে গেট থেকে সরে গিয়েছে পাহারাদার জেল সেপাই। আমি শেকলটাকে ধরে তালাটা ভেতরের দিকে ঘুরিয়ে দিলাম, লক্ষ্য, বাইরে থেকে কোনোভাবেই যেন তালাটা খুলতে না পারে। আমাদের ওয়ার্ড তখন ঘিরে রয়েছে জেল সেপাই ও সাজাপ্রাপ্ত জেল মেট-চামচার দল। সকলের হাতে লাঠি। কিন্তু ইট-পাটকেলের ভয়ে কেউ এগুতে পারছে না। একবার দু’জন মেট একটা তোশককে ঢালের মতো সামনে ধরে শেকল-সহ তালাটিকে বাইরের দিকে ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করল, কিন্তু আমাদের সহবন্দিদের ইট-বৃষ্টিতে তারা হটে গেল। এমন সময় ওই ওয়াচ টাওয়ারের ওপর থেকে একটা ইটের টুকরো এসে পড়ল আমার মাথার ওপর। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে লাগল। কপালে হাত দিয়ে দেখলাম রক্ত। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম।
এর পরের সব ঘটনা অন্য বন্দিদের থেকে শোনা – কেননা, আটচল্লিশ ঘণ্টা আমি জ্ঞানহারা অবস্থায় ছিলাম আহত-নিহত বন্দিদের সঙ্গে। আমাকেও মৃতদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে রেখেছিল। আমার পাশে ছিল প্রলয়েশ, সাগর ও আরও কয়েকজন। সাগর মৃত। প্রলয়েশ অর্ধমৃত।
শুনেছিলাম, গেটের সামনে আমার রক্তাক্ত দেহটা লুটিয়ে পড়তেই জেল সেপাই, মেটদের যেমন সাহস বেড়ে গেল, তেমনি সাধারণ কয়েদি বন্ধুদের মধ্যে একটা ভয় নিমেষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। কয়েকজন বন্ধু আমাকে পাঁজাকোলা করে ধরে ওয়ার্ডের ভেতর নিয়ে গেল রক্তমাখা অবস্থায়। আমাদের বন্ধুরা তখন ইট-পাটকেল-টালির টুকরো মিশাইলের মতো আক্রমণকারীদের দিকে ছুঁড়ে চলেছে। এর মধ্যে সুযোগ পেয়ে মেন গেটের তালা খুলে হরহর করে ঢুকে পড়ল জেল সেপাইরা বাঘের মতো। যে বন্দিকেই সামনে পাচ্ছে, তার উপর নির্মমভাবে লাঠির ঘা মেরে চলেছে। ভয়ে আর্তনাদ করতে করতে তখন সাধারণ বন্দিদের বড়ো অংশটাই ওয়ার্ডে ঢুকে যেতে লাগল। পেছনে লাঠি মারতে মারতে হিংস্র দানবের মতো জেল সেপাই ও মেটরা এগুচ্ছে। বন্দিরা পেছনের দেওয়াল ঘেঁষে কম্বল মুড়ে নিজেদের লাঠির ঘা থেকে বাঁচাতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। রক্তাক্ত হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ছে অনেকে। চারদিকে খালি লাঠির আওয়াজ , মারমুখী দৈত্যদের গর্জন, আহত বন্দিদের আকুল আর্তনাদ।
আরও পড়ুন: জেল ভাঙার ডাক – ধরা পড়লেন চারু মজুমদার
অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে যে বন্ধুরা ওয়ার্ডের ভেতরে নিয়ে এসেছিল, তাদের মধ্যে ছিল নিমাই। নিমাই দাস। বজবজ থেকে গ্রেপ্তার হয়ে এসেছিল। ছিপছিপে কালো, লম্বা চেহারার যুবক। কয়েক দিনের মধ্যে তার জামিনে বের হয়ে যাওয়ার কথা। দু’দিন আগে তার প্রেমিকা ‘স্পেশাল ইন্টারভিউ’ করে তার সঙ্গে দেখা করে গেছে।সেই নিমাই দাস আমার পায়ের নিচে সরষের তেল ঘষে জ্ঞান ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। উন্মাদের মতো ছুটে আসা জেল সেপাইদের একটা লাঠি এসে নাকি নিমাইয়ের মাথায় পড়ে। ফাটা মাথার রক্ত ছিটিয়ে নিমাই আমার ওপর লুটিয়ে পড়ে। এক জ্ঞানহীন বন্ধুর জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে গিয়ে চিরকালের মতো জ্ঞান ফিরে পাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে নিমাই।
পরবর্তীকালে শুনেছি, একদল সেপাই লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে দোতলার ওয়ার্ডের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলে আমাদের সাহসী বন্ধুরা ওয়ার্ডে ঢোকার গেটটা গায়ে দেওয়ার চাদর ছিঁড়ে জড়িয়ে বেঁধে দেয়। ক্ষিপ্ত জানোয়ারেরা আগুন দিয়ে সে চাদর পুড়িয়ে দরজা খুলে ঢুকে পড়ে। কয়েকজন অল্পবয়সী তরুণ বিপ্লবী বন্ধুকে মেরে ওপর থেকে নিচে ফেলে দেয়। বীরের মতো লড়তে থাকে আমাদের নওজওয়ান বিপ্লবী অসীম সাহসী যোদ্ধা গৌর। অবশেষে গৌর-সহ প্রায় পাঁচ-ছয় জনকে হত্যা করে রক্ত মেখে ‘গুন্ডা’রা নিচে নেমে যায়। ওয়ার্ডে তখন আহত বন্দিদের ‘জল’, ‘জল’ – আকুল চিৎকার আর গোঙানি।
জেল কর্তৃপক্ষের কেউ নাকি নিহত-আহত বন্দিদের ওখান থেকে সরানোর চেষ্টা করেনি। ৯টার সময় জেলপ্রেসের টিফিন (বা ছুটি) হলে দীর্ঘমেয়াদি বন্দিরা প্রেস থেকে বেরিয়ে এসে আহত-নিহতদের জেল-চাদরে শুইয়ে ধরাধরি করে জেল-হাসপাতালে নিয়ে যায়। যাবার পথে মার-পাগল এক কুখ্যাত জমাদার চাদর উল্টে উল্টে নাকি ‘মাল’গুলোকে চেক করে। তারপর মড়ার ওপর আবার খাঁড়ার ঘা। আমার অজ্ঞান দেহকে ওরা নাকি বুটপরা পা দিয়ে দলে দিয়েছিল। বেরিয়ে এসেছিল আমার রেকটামটা। এসবই আমার শোনা কথা। কেননা আমি তখন জ্ঞানহীন। ব্যথাবেদনা আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। বেদনা সজাগ মানুষের অনুভূতি। আমি তখন তার উর্দ্ধে।
তারপর আটচল্লিশ ঘণ্টা বাদে আমার জ্ঞান ফিরে আসে। আমি তখন প্রেসিডেন্সি জেলের পাশের পুলিশ হাসপাতালে শয্যাশায়ী। মাথা-সহ শরীরের নানা জায়গায় সাদা ব্যান্ডেজের বাঁধন। আমি চোখ মেলে দেখি, একটা বিরাট হলে অসংখ্য বিছানায় আমার মতো ব্যান্ডেজ মোড়া অবস্থায় লাইন দিয়ে শুয়ে আছে অসংখ্য মানুষ। আমার দৃষ্টি ঝাপসা। হাত-পা নাড়ার ক্ষমতা নেই। ইলেকট্রিক লাইটের আলো চারদিকে। দিন না রাত বোঝার উপায় নেই। হঠাৎ মনে হল নার্স এক ভদ্রমহিলাকে নিয়ে এলেন আমার বিছানার পাশে। জিজ্ঞাসা করলেন, “চিনতে পাচ্ছেন?”
আরও পড়ুন: আলিপুর জেলের ভয়াবহ পাগলা ঘন্টি
আমি চিনতে চেষ্টা করলাম। চারদিক কেমন ঝাপসা। সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আকুল নয়নে চেয়ে আছে। আমাকে তার জিজ্ঞাসা, “কেমন আছো?”
আমি বলতে চাইলাম, “ভালো।” কিন্তু বলতে পারলাম না। আমার জিভটা জড়িয়ে গেছে। কোনো কথা বলার ক্ষমতা নেই। আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। হ্যাঁ, আমি চিনতে পারছি, ও তো ডলু। ডলি, আমার ভালোবাসার মেয়ে। যাকে নিয়ে আমার ‘থানা গারদ থেকে মাকে’ কবিতা সংকলনের প্রথম কবিতা – ‘প্রিয়তমাসু’। আমি গ্রামে চলে যাওয়ার আগে শেষ যেদিন ওর সাথে দেখা হয়েছিল – ও বলেছিল, “হতাশ হয়ো না, ভেঙে পড়ো না, পিছিয়ে এসো না।” আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল, “আমি ভেঙে পড়িনি ডলু, পিছিয়ে আসিনি।” কিন্তু গলা দিয়ে একটা বিকট শব্দ ছাড়া কিছুই বেরোল না। নার্স ছুটে এসে ‘ডলি’কে আমার শয্যার পাশ থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। আমি আবার জ্ঞান হারালাম।
জীবনের গল্প এর পরেও অনেক রয়ে গেল বলার। যদি সুযোগ ঘটে, সেটা আবার নতুন করে বলা যাবে। আমার আখ্যান আপাতত এখানেই শেষ করছি। তাই নটে গাছটি মুড়োল…
সমাপ্ত
(ছবি- প্রতীকী)