আলিপুর জেলের ভয়াবহ পাগলা ঘন্টি

ওদের মধ্যে কয়েকজন তরুণ আমাদের সিপিআই (এমএল)-এর সঙ্গে না থাকাটা মানতে পারছিল না। আমরা কেন চারু মজুমদারকে মানি না, স্বয়ং মাও যাকে সমর্থন করেছেন, আমরা, বিশেষ করে আমি কেন তাঁর বিরোধী, আমাকে তার জবাবদিহি করতে হত। আমার খাতাপত্র তো একদিন নিয়ে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে বাইরে ফেলে দিয়েছিল একজন। মেটের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে আমাদের গ্রুপকে আলাদা করে দিয়েছিল বেশ কয়েকবার। এসব কাজে ভোম্বলের সাপোর্ট থাকলেও সাগর তা পছন্দ করত না। ওদের মধ্যে অনেকে সাগর ও প্রলয়েশকে মধ্যপন্থী বিবেচনা করত।
(গত পর্বের পর)
জেলের নিয়ম ছিল – প্রতিদিন সকালে ও রাতে সমস্ত ওয়ার্ডের বন্দিদের গোনার শেষে যোগ করে দেখা হত সংখ্যা মিলছে কিনা। মিললে ঘণ্টা বাজত। আমরা উঠে দাঁড়াতে পারতাম। না মেলা পর্যন্ত আমাদের হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে হত। তিন-চারবার গুনে না মিললে পাগলা ঘন্টি বেজে উঠত। সমস্ত ওয়ার্ডের তালা বন্ধ হয়ে যেত। সমস্ত সেপাই, যাদের ডিউটি ছিল না, তাদেরও জেলের মাঝের চাতালে এসে দাঁড়াতে হত। প্রতিটি ওয়ার্ডে সার্চ করা হত। না মেলা পর্যন্ত জেল সুপার, জেলার, ডেপুটি জেলার, জমাদার সেপাই ও অন্যান্য সেপাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত। হিসেব মিলে গেলে শান্তি।
আরও পড়ুন: নকশাল ওয়ার্ডের কয়েদি
আমরা এই জেলে আসার কিছুদিনের মধ্যে আরেকটি তরুণ আমাদের ওয়ার্ডে এল। সাগর আমাকে জানাল, তোদের এমসিসি’র একটি ছেলে এসেছে, কালীঘাট বাড়ি। সাক্ষাৎ হতেই আমি তাকে চিনে গেলাম। প্রথমবার পাগলা ঘন্টি শুরু হলে জেলে যখন মারমার কাটকাট অবস্থা, তখন ও পায়খানায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসেছিল অনেকক্ষণ। আমারও সেবার ভয়ের চোটে হাত-পা কাঁপছিল। পাগলি ঘণ্টা বেজেছিল গুনতি না মেলায়। অচিরেই গুনতি মেলার ঘণ্টা বাজল। জেলখানায় শান্তি ফিরে এল। আমাদের সেই নবাগত বন্ধুটি “শরীর ভালো লাগছে না” জানিয়ে জেল হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হল। কয়েকদিন পরে ও হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল বটে, তবে আমাদের ওয়ার্ডে আর ফিরল না। ক’দিন ফাঁসির আসামিদের সেলে ছাড়া অবস্থায় থাকার পর জামিন পেয়ে বেরিয়ে গেল। আমাদের কোনো খোঁজ-খবরও নিল না।
ছোটদি আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। প্রায়ই বুধবার দিন সকাল ন’টার মধ্যে ইন্টারভিউর জন্য দরখাস্ত জমা দিয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জেলগেটে এসে ও দাঁড়িয়ে থাকত। তারের জালের মধ্য দিয়ে আমরা কথাবার্তা বলতাম। ছোটদি আমাদের ৫/৬ জনের জন্য খাবার-দাবার, জামা-কাপড় যখন যা প্রয়োজন, সাধ্যমতো দিয়ে যেত। আমরা যাতে খবরের কাগজ পাই, তার জন্য জেলগেটে আমার নামে টাকা জমা রেখেছিল ছোটদি।
আরও পড়ুন: জেলের ভিতরে জানতে পারলাম এক সাংঘাতিক ব্যাপার
জেলের ওয়েলফেয়ার অফিসার আমার খুব নিকটজন হয়ে উঠেছিলেন ক’মাসের মধ্যে। আমি ওনার কাছে বাইরে থেকে রাজনৈতিক বইপত্র আনার আবেদন করলে উনি জানালেন – ডাইরেক্ট বইপত্র আনায় অনেক ঝামেলা। গেটে বই জমা পড়বে, সেটা আবার গোয়েন্দা বিভাগের কাছে যাবে, তারা পারমিশন দিলে উপযুক্ত ছাপ্পা মেরে সেই বই আসবে। সে অনেক হেপা। উনি আমাকে পরামর্শ দিলেন, “আমি যখন ডিউটিতে আসব, তখন আপনার দিদিকে আমার হাতে বই দিয়ে দিতে বলবেন। আমি ভেতরে এনে ‘সেনসরড অ্যান্ড পাসড’ ছাপ্পা মেরে আপনাকে দেবার ব্যবস্থা করব। কাউকে জানানো চলবে না কিন্তু।”
যতদিন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ছিলাম, তিনি এ সাহায্য বজায় রেখেছিলেন। আজ তাঁর নাম মনে না থাকায় খুব খারাপ লাগে। তাঁর ছাপ মারা ও সই করা বাংলায় মার্কস-এঙ্গেলস রচনাবলীর (রুশি) প্রথম খণ্ড এখনও আমার কাছে আছে।
(চলবে…)
ছবি - প্রতীকী