“তুমি দুষ্টু লোক” – ঠিক ৪৫ বছর আগে আজকের দিনেই মুক্তি পেয়েছিল ‘সোনার কেল্লা’

ষাটের দশকে এক জাতিস্মর বালককে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর উৎসাহেই কলকাতায় তৈরি হয় প্যারাসাইকোলজি সোসাইটি। অফিস ছিল লালমোহন ভট্টাচার্য রোডে। উত্তমকুমারের মতো সত্যজিৎও ছিলেন সেখানকার আজীবন সদস্য। সোসাইটির কাজকর্মের মধ্যে দিয়েই সত্যজিতের সঙ্গে বিখ্যাত রাজনীতিবিদ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাকা, বিমলবাবুর পরিচয় হল। সোসাইটির মাধ্যমে হেমেনবাবুর গবেষণা বিষয়ে ওয়াকিবহাল হয়ে উঠলেন রায় সাহেবও। ‘সোনার কেল্লা’ উপন্যাস ও সিনেমার পিছনে ছিল এই রোমাঞ্চকর গা শিউড়ে ওঠা বাস্তব। সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতেও জাতিস্মর মুকুলের আড়ালে লুকিয়ে ছিল প্রভু নামের রাজস্থানের এক ছেলে, আর প্যারাসাইকোলজিস্ট ড. হেমাঙ্গ হাজরার মধ্যে ধরা পড়েছিল জয়পুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি।
১৯৭৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর, আজকের দিনেই ৪৫ বছর আগে মুক্তি পেয়েছিল ‘সোনার কেল্লা’। মূল উপন্যাস রচনার তিন বছর পরে এই ছবির কাজে হাত দেন তিনি। যার বাজেট ছিল প্রায় ৭ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। বক্সঅফিসে অর্জন হয়েছিল প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা। মুকুল ধরের চরিত্রে অভিনয় করা কুশল চক্রবর্তীকে আজও মনে রেখেছেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের দর্শক।
‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় প্রজিতবিহারী মুখোপাধ্যায় লিখছেন,
“খোকা, তোমার নাম কী?’’
“আগের জন্মের নাম না এ জন্মের নাম বলব, হুজুর?”
“তোমার আগের জন্মের বাড়ির কথা মনে পড়ে?”
“হ্যাঁ। একটি ছোট্ট দুর্গের ভিতর কয়েকটি বাড়ি আছে। তারই মধ্যে একটা হাভেলি আমার ছিল।”
প্রশ্নকর্তা ভরতপুরের তৎকালীন মহারাজা কিষণ সিংহ, আর উত্তর দিচ্ছিল সেলিমপুর গ্রামের ছোট্ট একটি ছেলে, নাম প্রভু। প্রভু ছিল জাতিস্মর। পূর্বজন্মের অনেক কথা সে হুবহু মনে করতে পারত। এমনকী বলেছিল পূর্বজন্মে হাঠোরি গ্রামে দুর্গের মধ্যে তার হাভেলির সামনে মাটিতে পুঁতে রাখা পাঁচটি পুরোনো টাকার কথাও। পরে মহারাজার লোকেদের সামনে মাটি খুঁড়ে উদ্ধারও হয় সেই টাকা। প্রভু নামের সেই রাজস্থানি ছেলেটির গল্পই কি ধরা পড়েছে সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’য়?”
গল্পের সমস্ত লেয়ার জুড়ে মিশে রয়েছে বাস্তব আর কল্পনার অদ্ভুত এক মিশেল। ৪৫ বছর ধরে এখনও কানে বাজে “তুমি দুষ্টু লোক”। মুকুল নামের সেই একরত্তি ছেলেটাকে কেই বা ভুলতে পারে! মায়াপুরীকে চোখের সামনে চিনিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে অদৃশ্য রহস্য, তা সত্যজিৎবাবু নিজের সবটুকু দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। মুকুলের জন্য সংলাপ লিখে বলেছেন, “এটা ময়ূর, আমি ময়ূর দেখেছি। এটা উট, আমাদের বাড়িতে উট ছিল। এটা আমার বাড়ি, আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার বাড়ির সামনে। এটা যুদ্ধ হচ্ছে, আমি যুদ্ধ দেখেছি। আর এটা কেল্লা, সোনার কেল্লা।”