দেবভাষায় চিরন্তন প্রকৃতির শিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক প্রদর্শনী

এই প্রথমবার নয়, এর আগে ২০১৫ সালেও শিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ramananda Bandyopadhyay) একক প্রদর্শনীর (Solo Exhibition) আয়োজন করেছে দেবভাষা (Debovasha)। তবুও এবারের প্রদর্শনীটি আলাদা কারণ, এই ছবিগুলি কোনওটিই আগে কখনও কোনও প্রদর্শনীবদ্ধ হয়নি। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আঁকা ৯২টি ছবির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই প্রদর্শনীর নাম—ইন সার্চ অফ বিউটি। তাছাড়া, প্রকৃতির সঙ্গে যাঁর শিকড়ের টান, সেই শিল্পীর কাজ প্রদর্শিত হবে এই ঘোর বসন্তে, সেটাই তো স্বাভাবিক। হলফ করে বলা যায় এই নাগরিক কর্কশের ভিতর তাঁর ছবি মনের সঞ্জীবন, বিশুদ্ধ ঠাণ্ডা হাওয়ার স্নিগ্ধতা। শোনা যায়, নন্দলাল বসুর (Nandalal Bose) এই সুযোগ্য ছাত্র নিজেই বহুবার বলেছেন, ‘এই শহরে আমি গ্রামের প্রতিনিধি’। এই গ্রাম তাঁর মননের, চিরন্তনের লৌকিক চেতনা, যা কখনও হারিয়ে যায় না।
১
২
রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় চিত্রকর, শিল্পশিক্ষক, শিল্পচিন্তক। তাঁর চিত্রকলার সঙ্গে অনেক পাঠকেরই পরিচয় রয়েছে। বহু বিখ্যাত বই, পত্রিকা, সংবাদ পত্র তাঁর চিত্রকলায় সমৃদ্ধ। পুরাণ এবং সাহিত্যের সম্ভারে ওঁর শিল্পে ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রভাব সুস্পষ্ট। পাশাপাশি বেঙ্গল স্কুল (Bengal School) ঘরানার যে ঐতিহ্য সেই ঐতিহ্যের একজন প্রধানতম প্রতিনিধি তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত বিশ্বভারতী কলাভবনে (kalabhavana) নন্দলাল বসুর তত্ত্বাবধানে আঁকার খুঁটিনাটি রপ্ত করেছিলেন বলেই হয়তো শিকড় বাঁচিয়ে রেখে স্বচ্ছন্দে নিজস্ব শিল্পরীতি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। গড়েছেন, ভেঙেছেন, স্বীকার করেছেন আবার অস্বীকারও। তাঁর ছবির সামনে দাঁড়ালেই তার আঁচ পাওয়া যায়। প্যাস্টেল, ইংক, পেনসিল স্কেচ –মিশ্র মাধ্যমে বিভিন্ন ধারার যেসব কাজ এই প্রদর্শনীতে রয়েছে, তা আরও একবার মনে করিয়ে দেবে তাঁকে কখনই শুধুমাত্র ‘অ্যাকাডেমিক’ চিত্রশিল্পী বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। এছাড়াও এই প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে তাঁর ব্যবহৃত আঁকার ও অন্যান্য সরঞ্জাম। প্রাতিষ্ঠানিক পাশ্চাত্য শিল্পরীতির থোড়-বড়ি-খাড়া পেরিয়ে ৬০-এর দশকে যেসব শিল্পী নিজস্ব ঘরানা তৈরি করতে পেরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম।
১৯৩৬ সালে বীরভূমের (Birbhum) বনপারুলিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। যে গ্রামীণ রূপ নাগরিক জীবনের নয় অথচ হওয়া উচিত ছিল, যা নেই অথবা আর ফিরবে না, তাকেই রামানন্দবাবু উদ্ধার করে আজকের বাস্তবতায় ফেলতে চান। শিল্পী কৃষ্ণেন্দু চাকীর মতে- “রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গত দু'দশকের কাজ নিয়ে অসাধারণ এই প্রদর্শনী সব শিল্পরসিকের অবশ্যই দেখা উচিত। ওঁর পুরোনো দুষ্প্রাপ্য সব কাজের এরকম উঁচু মানের প্রদর্শনী সাম্প্রতিককালে আর হয়নি।”
৩
৪
শুরুতেই বলছিলাম, যে গ্রামের কথা তিনি বলেছেন তা তাঁর মননের, বাস্তব-অবাস্তব ছাপিয়ে যা চিরন্তনের লৌকিক চেতনা, যা কখনও হারিয়ে যাবে না। সেই চেতনা আবারও জাগ্রত করার সুযোগ করে দিলেন দেবভাষার দুই কর্ণধার সৌরভ দে (Saurav Dey) এবং দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় (Debojyoti Mukhopadhyay)। সাধারণ মানুষের মধ্যে শিল্প রুচি বা বোধ তৈরি করার লক্ষে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে প্রদর্শনী এবং বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প-উৎসাহীদের কাছে বিশিষ্ট শিল্পীদের কাজ পৌঁছে দেওয়ার জন্য, যাঁরা ভালোবেসে শিল্পকর্ম সংগ্রহ করতে চান কিন্তু বড়ো প্রদর্শনীতে ঢুকতে ইতিস্তত বোধ করেন তাঁদের জন্য মুক্ত পরিসর তৈরি করেছে দেবভাষা। সেই মুক্ত পরিসরেই ১১ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক প্রদর্শনী। চলবে ২৮ মার্চ পর্যন্ত। মঙ্গলবার বাদে রোজ দুপুর আড়াইটা থেকে রাত সাড়ে ৮টা।