No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    শহরের উপকথায় যেভাবে ‘বাদল সরকার’ হয়ে উঠেছেন শুভাশিস

    শহরের উপকথায় যেভাবে ‘বাদল সরকার’ হয়ে উঠেছেন শুভাশিস

    Story image

    নাইজেরিয়াতে বসে ‘বাকি ইতিহাস’ (১৯৬৫) লিখেছিলেন বাদল সরকার। তাঁর লেখা সেই বিখ্যাত তিন অঙ্কের মনস্তাত্ত্বিক নাটক নিয়েই ‘শহরের উপকথা’ বানিয়েছেন পরিচালক বাপ্পা। এই ছবি দিয়েই বড়ো পর্দায় হাতেখড়ি হলো তাঁর। ১৭ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিও পেয়েছে ছবিটি। এই ছবিতেই বাদল সরকারের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে অভিনেতা শুভাশিস মুখোপাধ্যায়-কে। শুধু দেখাই যায়নি, দর্শকদের রীতিমতো চমকে দিয়েছেন তিনি এবং লুক টেস্টের পর নিজেই নাকি অবাক হয়েছিলেন নিজেকে দেখে। এক্কেবারে বাদল সরকার! নেপথ্যে রয়েছেন মেকআপ শিল্পী মহম্মদ আলি, যিনি একসময় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়েরও পছন্দের মেকআপ শিল্পী ছিলেন। অবাক করার বিষয় হলো, কোনও প্রস্থেটিক মেকআপ ব্যবহার হয়নি। নিজের শৈল্পিক কলা দিয়ে শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ের রূপান্তর ঘটিয়েছেন তিনি। কিন্তু, শুধুই মেকআপ? বাংলা থিয়েটারের এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য আলাদা প্রস্তুতি ছিল না? আলাপচারিতায় আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর দিলেন অভিনেতা শুভাশিস মুখোপাধ্যায়।

     

    ডান দিকে বাদল সরকার, বাঁ দিকে মেকআপের পর শুভাশিস মুখোপাধ্যায়

     

    বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ মঞ্চস্থ হতে দেখেছেন আপনি?

    শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ঃ হ্যাঁ…তবে সেটা বহুকাল আগে। খুব একটা মনেও নেই। ‘বহুরূপী’-তে শম্ভুবাবু (শম্ভু মিত্র) যখন করেছিলেন  (৭ই মে, ১৯৬৭ সালে, নিউ এম্পায়ার মঞ্চে) সেই সময়। তখন আমার অল্প বয়স।

    থিয়েটার আর সিনেমার পরিভাষা-আঙ্গিক আলাদা, সেদিক দিয়ে ‘বাকি ইতিহাস’-এর সঙ্গে ‘শহরের উপকথা’র সম্পর্কটা ঠিক কেমন?

    শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ঃ সাহিত্য বা নাটক থেকে যখন সিনেমা হয় তখন অল্পবিস্তর পরিবর্তন হয়ই। মোদ্দা কথা হল, মূল ভাব অক্ষুণ্ণ রেখে একটা পূর্নাঙ্গ ছবি বানানো। এই ছবির ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। ‘বাকি ইতিহাস’ হুবহু ধরে ধরে এই সিনেমাটা বানানো হয়নি, বাদলবাবুর নাটকটির বিষয়-ভাবনার উপর নির্ভর করে পরিচালক নিজের মতো করে একটা আদল দিয়ে তৈরি করেছেন ‘শহরের উপকথা’। যেমন, এটা করতে গিয়ে বাদল সরকার নিজে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি মূল নাটকে নেই কিন্তু এই ছবিতে তাঁর একটা ভূমিকা রয়েছে, এই সিনেমার প্রয়োজনেই তাঁকে আনা হয়েছে। তাই বোঝাই যাচ্ছে, এটা হুবহু থিয়েটারের চলচ্চিত্রায়ন নয়, কিন্তু চলচ্চিত্রটি গড়ে উঠেছে থিয়েটারকে কেন্দ্র করেই।

    শহরের উপকথা ছবির একটি দৃশ্য

    সিনেমায় বাদল সরকারের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য মেকআপের মাধ্যমে বাইরে থেকে না হয় হলো, ভিতরের বাদল সরকারকে চেনাতে-বোঝাতে আলাদা কোনো প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?

    শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ঃ আমি স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র (বাদল সরকারও এই স্কুলেই পড়েছেন)। বাদলবাবুকে আমি একেবারে ছোটোবেলা থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। বাদলবাবু থাকতেন আমাদের স্কুলের ঠিক পাশেই, প্যারিমোহন স্কুল লেনে। ঘটনাচক্রে, ওনার থার্ড থিয়েটারের নাট্যদল ‘শতাব্দি’ নিয়ে আমাদের স্কুলে প্রতি সপ্তাহে বাদলবাবু নাটক পরিবেশন করতে আসতেন। স্কুলের একটা বিল্ডিং ছিল ‘হেডসন ব্লক’ নামে, যার নিচে বিরাট বড়ো ওপেন স্পেস ছিল, সেখানেই উনি নাটক করতেন, আর আমরা গোল হয়ে বসে দেখতাম। এভাবেই আমার বাদল সরকারের নাটক দেখা শুরু কিন্তু, তখন আমি নাটক বা থার্ড থিয়েটার সম্বন্ধে অতকিছু বুঝতাম না। তখন মানে, ছাত্রাবস্থায় অবাক হয়ে দেখতাম আর ভাবতাম, এ আবার কী ধরনের নাটক, কোনো মঞ্চ নেই, একটা খোলা জায়গায় সবাই ঘিরে বসে আছে আর বাদলবাবু মাঝখানে দাঁড়িয়ে নাটক করছেন। সেটা যে শুধু বাচিক অভিনয় এমনটা তো নয়, তার সঙ্গে শারীরিক অভিনয়ও থাকতো, সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ অন্য আঙ্গিকের পরিবেশনা। পরবর্তী সময়ে, বড়ো হয়ে জানলাম বাদল সরকার, থার্ড থিয়েটার আসলে কী এবং এই ছবিটা করতে গিয়ে বাদলবাবুকে নিয়ে আরও পড়াশোনা করলাম। ওঁর অভিনয়, বাচন ও শরীরী ভঙ্গি, সবটাই নতুন করে দেখেছি। এ ব্যাপারে এই ছবির পরিচালক, বাপ্পা আমাকে বেশ কিছু লেখাপত্র দিয়ে সাহায্য করেছে। বাদল সরকার সম্বন্ধে আমি যতটুকু জেনেছি এবং পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি সবটা নিয়েই এই চরিত্রায়ন।

    শুভাশিস মুখোপাধ্যায় ছাড়াও ছবির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন অরুণোদয় (রাহুল) বন্দ্যোপাধ্যায়, জয় সেনগুপ্ত, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপ মন্ডল, লামা হালদার, রজত গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ। শ্রীকৃষ্ণ ইন্টারন্যাশনাল ফিল্মস প্রযোজিত এই ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছেন বাংলাদেশের জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত চিত্রনাট্যকার আশরাফ শিশির।

    শহরের উপকথা ছবির একটি দৃশ্য

    ছবির গল্প অনুযায়ী এবং ট্রেলারে যতটুকু আভাষ পাওয়া গেছে, এই ছবির ভিতরে রয়েছে আমাদের সংস্কৃতি, স্মৃতি, সত্তা সমস্ত কিছুকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকার কথা, ঐতিহ্যকে হারিয়ে যেতে না দেওয়ার কথা। এই সূত্রে মনে পড়ে গেল, ঐতিহ্যকে নিজের ভাষায় প্রাসঙ্গিকভাবে সঙ্গে নিয়ে চলাতেই বিশ্বাসী ছিলেন নাট্যকর্মী হিসেবে বাদল সরকারের স্বজন- সফদর হাসমি। তিনি বিশ্বাস করতেন, 'যদি ঐতিহ্য জীবন্ত হয়, যদি সেটা কারোর মধ্যে থাকে,  তাহলে এমনিই তা সৃষ্টিশীল প্রকাশের মধ্যে একটা স্থান করে নেবে। আমাদের উচিত নিজেদের মতো কথা বলা'।

    ‘শহরের উপকথা’ সেকথা বোঝাতে পারবে কি? দেখা যাক।

     

     

     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @