আল্লাদিয়ার শেখানো ‘ভুল রাগে’ কেসরবাঈ-এর দুর্গাবন্দনা

বাঈ দাপটের সাথে অহংকারী ছিলেন। রেওয়াজ করতেন কিন্তু কাউকে রেওয়াত করা তাঁর ধাতে ছিল না। সকলেই মান্যগণ্য করতেন কিন্তু তাঁর মুখ থেকে কারো প্রতি মান্যি গণ্যির শব্দ কেউ শুনতে পেলে মনে করতেন সূর্য পশ্চিম দিকেই উঠেছে। দেমাকি, অহংকারী, আর কটু বাক্যে সবাইকে বিদ্ধ করাই ছিল তাঁর অন্যতম কাজ। কিন্তু কণ্ঠে সরস্বতীকে ধরে রেখেছিলেন পরম যত্নে। লোকে বলতো তাঁর প্রতিটি তানে বাগ দেবী যেন এসে বসে বিশ্রাম করেন। তাই এমন মাধুর্যের রস বিস্তার।
নিত্য দিন অহঙ্কার আর দেমাককে নিজেই নিজের গান দিয়ে জব্দ করতেন। এরকম বাঈয়ের নামে ইংরেজিতে প্রবাদ চালু ছিল যে ‘সি ইজ স্টিল দা কুইন অ্যণ্ড দা টর্চ বেয়ারার অফ উস্তাদ আল্লাদিয়া খান’স গায়কি’। জয়পুর ঘরের এই সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী হলেন কেসরবাঈ কেরকর। এমন কেসরবাইয়ের তখন একটাই স্বপ্ন একবার বাংলায় এসে রবি বাবুকে একটু গান শোনায়। কিন্তু সেও তো বড়ো সোজা কথা নয়। তাই তরিজুত করে পাকড়াও করলেন দিলীপকুমার রায়কে। দিলীপকুমার বাঈয়ের কথা ফেলেনি। তিনি নিজে কেসরবাঈকে নিয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করাতে প্রশান্ত মহলানবিশের বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ সাক্ষাৎ করলেও বলেছিলেন যে তিনি বড়ই ক্লান্ত। তবু শুনেছিলেন কেসরবাইয়ের গান। তারপর!!
তারপর কবির কলম থেকে বেরিয়ে এলো কতগুলি ঝরঝরে শব্দপুঞ্জ। কবি লিখলেন ‘I consider myself fortunate in securing a chance for listening to Kesar Bai’s singing which is an artistic phenomenon of exquisite perfection. The magic of her voice with mystery of its varied modulations has repeatedly proved its true significance not in any pedantic display of technical subtleties mechanically accurate, but in the revelation of the miracle of music only possible for a born genius. Let me offer my thanks and my blessings to kesar Bai allowing me this evening a precious opportunity of experience’. তাই বলতেই হয় যে গোটা ঘটনাটাই পাল্টে গেল এক লহমায়।
এহেন কেসরবাইয়ের সাথে তাঁর গুরু আল্লাদিয়া ঘটিয়েছিলেন এক রহস্যময় ঘটনা। কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বেশ জম্পেশ করে গল্পটি শুনিয়েছেন আমাদের। কুমার বাবু বলছেন “কথাটা উঠেছিলো কেসরবাঈয়ের গাওয়া কাফি কানাড়া ও কুকুভ বিলাবল নিয়ে। আমি শ্রীকৃষ্ণ রতনজনকরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এ কী প্রকারের কানাড়া, যাতে নি পা বা গ_ ম রে সা লাগে না ? এ কাফি কানাড়ার সঙ্গে কাফির তফাৎটা কোথায়?” উনি বললেন, “হক কথা, ওদের ঘরের কাফি কানাড়ার চাল ও তান শুদ্ধ নয়, রেকর্ডে সবটাই কাফির ও বাগেশ্রীর তান করে মরেছহে”... আবার কেসরবাইয়ের কুকুভ বিলাবল আমাদের বিখ্যাত দাদরা ‘শম্ভু পথ শেষ’-এর সঙ্গে কিছুই মেলে না। খাম্বাজ বা জয়জয়ন্তীর অঙ্গ নেই, আছে কিছুটা সাবনী। এ রহস্যের সমাধান করলেন নিবৃত্তিবুয়া। তিনি বললেন, ও গান তো সাওনী বিলাবলের। কেউ কেউ সুখিয়া বিলাবল বলে। আল্লাদিয়া খাঁ ইচ্ছে করে কেসরবাঈকে ভুল শিখিয়েছিলেন। দাগা পাওয়ার পর প্রচুর বদ দোয়া দিয়ে প্রায়ই বলতেন, “আমি চিরকালই জানতাম ও বদ নেমকহারাম স্ত্রীলোক, ঐ কারণে আমি টিপেটুপে শিখিয়েছি”।
কিন্তু পাঠক আজ একটা কথা শুনলে আমাদের অবাক হতেই হবে। সারাজীবন ঐ ভুল গর্বের সঙ্গেই গেয়েছিলেন কেসরবাঈ। শুধু কি তাই, ই এম আই যখন তাঁর রেকর্ড প্রকাশ করল তখন দেখা গেল কেসরবাঈ সেখানেও পরম দরদে গাইলেন আল্লাদিয়ার শেখানো কুকুভ বিলাবল। ঝাঁপ তালে নরম করে জাগিয়ে তুললেন ভোরের আলো। আর তাঁর গানের মধ্যে আমরা দেখতে পেলাম দেবী দুর্গার বন্দনা। মনটা ভরে যায় গানের সেই নিবেদনের আকুতিতে।