বাঘ-হাতিদের নিরাপদ জীবন উপহার দিতে লড়ছেন একদল বনপাগল

এই প্রকৃতির কোলেই প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগে মানুষের উৎপত্তি হয়েছিল। এক সময়ে মানুষ আর প্রকৃতির সম্পর্ক ছিল নিবিড়। পরবর্তীকালে নগর সভ্যতা যত প্রসারিত হয়েছে, অর্থনীতি হয়ে উঠেছে ভারী শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, মানুষ ততই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে প্রকৃতির থেকে। প্রকৃতি, পরিবেশ এবং বাস্তুতন্ত্র সুস্থ এবং সজীব থাকলে তবেই মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকবে, তা আমরা জানি। কিন্তু সেই মানুষই প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে নির্বিচারে। বন্যপ্রাণীরা হয়ে পড়ছে বিপন্ন। অথচ প্রকৃতির ওপর সব জীবেরই সমান অধিকার। মানুষ এবং বন্যপ্রাণীদের মধ্যে সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল এবং ইতিবাচক করার লক্ষ্য কাজ করে চলেছে ‘সোসাইটি ফর হেরিটেজ অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল রিসার্চ’ বা ‘শের’ (SHER) নামের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা।
ফটোগ্রাফার এবং অভিনেতা জয়দীপ কুণ্ডু প্রকৃতিকে ভালোবাসেন প্রাণ দিয়ে। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী সুচন্দ্রা কুণ্ডু ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফির নেশায় সারা দেশের নানা প্রান্তের বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তবে শুধুমাত্র ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফিতেই থেমে থাকেনি বন্যপ্রাণীদের প্রতি তাঁদের আকর্ষণ। অরণ্যের অবলা জীবজন্তুদের অসহায়তা নিজের চোখে দেখে তাঁরা পারেননি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো নীরব ও নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে। অরণ্যবাসী প্রাণীদের সুস্থ, নিরাপদ জীবন সুনিশ্চিত করতে এই দম্পতি বন দপ্তরের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। মূলত সুন্দরবনের বাঘদের পাশে দাঁড়াতে তাঁরা নানারকম উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বাঘ গণনার কাজেও অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁরা।
বাঘ নিয়ে কাজ করতে করতে তাঁদের মনের হয়, সমমনস্কদের নিয়ে একটি সংস্থা তৈরি করলে বন্যপ্রাণীদের অধিকার রক্ষায় আরও সক্রিয় হওয়া যাবে। সেই ভাবনা থেকেই ২০১১ সালে আত্মপ্রকাশ করে ‘শের’। মন্দিরা সামন্ত, অপু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো পরিবেশপ্রেমীরাও এখানে রয়েছেন। নানা প্রয়োজনে ‘শের’-এর পাশে দাঁড়িয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, পার্থ দাশগুপ্ত, সনাতন দিন্দা, অরিন্দম শীল, মিমি চক্রবর্তী এবং আরও অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব।
বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের জন্য হাতেকলমে কাজ করার পাশাপাশি গবেষণার দিকেও বিশেষ জোর দেয় ‘শের’। কারণ, পরিবেশ নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চাই একমাত্র পারে প্রকৃতিকে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে। নেচার এডুকেশন তাই সংস্থাটির অন্যতম কর্মসূচি। বনাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষরা যাতে উন্নত জীবনযাত্রার স্বাদ পান, তার জন্যও নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে ‘শের’। বন্যপ্রাণীদের আক্রমণে যেসব মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের পাশে এই সংস্থা নিয়মিত দাঁড়িয়ে থাকে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় মানুষ ও বন্যপ্রাণীদের পারস্পরিক সহায়তা একান্ত প্রয়োজন, সেই বিষয়ে ‘শের’ নামের সংস্থাটি সচেতনতা প্রচার করে চলেছে নিরলসভাবে।