শক্তি চট্টোপাধ্যায় — ছবি আঁকে, ছিঁড়ে ফ্যালে

জীবনানন্দ দাশের কবিতা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন- চিত্ররূপময়। সেই বক্তব্যের সমর্থনে অথবা বিপক্ষে কিছু বলতে এই লেখা নয়। বরং শব্দটির দিকে তাকানো যাক। চিত্র এবং রূপ। সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে চিত্রের একমাত্রিকতা থাকলেও থাকতে পারে, রূপ কিন্তু কখনওই একমাত্রিক নয়। রূপের যেমন বহিঃরঙ্গ থাকে, তেমনই এর এক গভীর অন্তরমহলও আছে বইকি। একমাত্রিক চিত্রের ভেতরে প্রবেশ করে রূপের বহিঃরঙ্গকে ছুঁয়ে অন্তরের রূপকে উপলব্ধিতে উত্তরণ করার নামই ‘চিত্ররূপময়’। অন্তত আমার কাছে এই শব্দের ব্যাঞ্জনা এভাবেই ধরা দিয়েছে।
এখন কথা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ কি এভাবেই ভেবেছিলেন? সেটা আলোচ্য নয়। বরং এই শব্দের অন্তর্নিহিত শক্তির কাছে পৌঁছে যাওয়াই ছিল আমার লক্ষ্য। শক্তি! শক্তি চট্টোপাধ্যায়। চিত্ররূপময় ভাবলে আমার তাঁর কথাই মনে পড়ে। শক্তির যে কবিতাটা আমি প্রথম পড়েছিলাম, সেটি হল ‘জরাসন্ধ’। প্রথমেই শক্তি চিরন্তন প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছেন— ‘আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে’। তীব্র এই জিজ্ঞাসার পথে হেঁটে তিনি তুলে নিয়ে এলেন কিছু দৃশ্য। কিছু চিত্র। অন্ধকারের মতো শীতল মুখ, রিক্ত হ্রদের মতো কৃপণ করুণ চোখ। চরম হাহাকারের এইসব দৃশ্য রচনা করতে করতে তিনি চলে গেলেন এক তীব্র উপলব্ধি-খচিত চিত্রে। তিনি লিখলেন, ‘ধানের নাড়ায় বিঁধে কাতর হ’লো পা’। চমকে উঠতে হয় এই ভাবনার কাছে এসে। ঝিম ধরা নেশার মতো ঘোর লেগে থাকে যে অনুভবের অন্তরমহলে তেমন তীব্রতা ছাড়া এমন চিত্র লিখে ফেলা অসম্ভব। কিন্তু শুধু চিত্ররচনাই কবির কাজ নয়। কবি সেই চিত্র ছিঁড়েও ফ্যালেন। এই ছেঁড়া আক্ষরিক ছিঁড়ে ফেলা নয়। বহিঃরঙ্গ ছেদ করে ঢুকে পড়া ভেতরে।
এই ছেদ করতে কাব্যের যে ছুরিটি বারংবার ব্যবহার করেছেন শক্তি, সেটা হল জিজ্ঞাসা। চিত্রের আপাত একমাত্রিক চলনকে যা ভেঙে দেয়। নির্মাণকে ভেঙে বিনির্মাণের অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রয়োগ করে নিজের কবিতায় প্রাণ ফুটিয়ে তোলায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তাই তো তিনি ভাবনার এক অমোঘ গন্তব্যে পৌঁছে গিয়ে লিখে ফেলতে পারেন- ‘আমার যা-কিছু আছে তার অন্ধকার নিয়ে নাইতে নামলে সমুদ্র স’রে যাবে শীতল স’রে যাবে মৃত্যু সরে যাবে।’ চিত্রের ভেতর দিয়ে হেঁটে রূপের বহিঃরঙ্গ দিয়ে কীভাবে রূপের অন্তরমহলে বোধের কাছাকাছি চলে যেতে হয়, তা বেশ বোঝা যায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই ‘জরাসন্ধ’ কবিতাটি পড়লে। এমন উদাহরণ তাঁর সামগ্রিক কবিতাযাপনে অসংখ্য। সেই কারণেই তাঁকে আমার চিত্ররূপময় বলে মনে হয়। শক্তির কবিতার আরও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এটিও একটি।
তবে শক্তির কবিতার এই চিত্ররূপময় স্বভাবটি মোটেই রুক্ষ এবং আবেগহীন মেধার আত্মমৈথুন নয়। তিনি নিজের আত্মার আধারকে সর্বদা কবিতায় পরিপূর্ণ রেখে দিতে ভালোবাসতেন। আবেগ আর চিত্র। এই দুইয়ে মিলে এগোতে এগোতে তিনি নিজের খেয়ালে চলে যেতেন বোধের ঘরে। এই স্বভাবের বশেই তিনি লিখেছিলেন- ‘যদি কোনো আন্তরিক পর্যটনে জানালার আলো/ দেখে যেতে চেয়ে থাকো, তাহাদের ঘরের ভিতরে-/ আমাকে যাবার আগে বলো তা-ও, নেবো সঙ্গে করে।/ ভুলে যেয়োনাকো তুমি আমাদের উঠানের কাছে/ অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ পড়ে আছে।’ ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত ‘ধর্মে আছো জিরাফেও আছো’ কাব্যগ্রন্থের এই লাইনগুলির কাছে এই ২০২০ সালেও হাঁটুমুড়ে বসতে হয়। চিত্ররূপময়তার অপূর্ব নিদর্শন। কী অপূর্ব ভাবনা! অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ পড়ে আছে! কী অনবদ্য দৃশ্য। সাধারণ জীবনের দৃশ্য। শক্তি দেখে ফেলেছিলেন অন্য চোখ নিয়ে। শুধু জুড়ে দিয়েছিলেন একটি মাত্র শব্দ- অনন্ত। কুয়ার আগে এই শব্দযোগ ছিল কবির মাস্টার স্ট্রোক। এখানেই তিনি দৃশ্যকে অতিক্রম করে উত্তরণ ঘটান বোধে। কুয়া আর কুয়া থাকে না তখন। হয়ে যায় ভাবনার এক গভীর সুরঙ্গ। সেই অন্ধকার সুরঙ্গপথে চলতে চলতে পাঠক খুঁজে পেয়ে যান তাঁর প্রিয় আলোকে। সেই আলোর নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়।