No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বাংলা সাহিত্যে ‘গথিক’ কাহিনির ছায়াময় বারান্দা

    বাংলা সাহিত্যে ‘গথিক’ কাহিনির ছায়াময় বারান্দা

    Story image

    “শিঞ্জিত শব্দ আজ ঘাট হইতে ক্রমে ক্রমে অগ্রসর হইয়া মুক্তদ্বারের মধ্যে প্রবেশ করিল। শুনা গেল, অন্দরমহলের গোলসিঁড়ি দিয়া ঘুরিতে ঘুরিতে শব্দ উপরে উঠিতেছে। ফণিভূষণ আপনাকে আর দমন করিতে পারে না, তাহার বক্ষ তুফানের ডিঙির মতো আছাড় খাইতে লাগিল এবং নিশ্বাস রোধ হইবার উপক্রম হইল। গোলসিঁড়ি শেষ করিয়া সেই শব্দ বারান্দা দিয়া ক্রমে ঘরের নিকটবর্তী হইতে লাগিল। অবশেষে ঠিক সেই শয়নকক্ষের দ্বারের কাছে আসিয়া খট্‌খট্ এবং ঝম্‌ঝম্ থামিয়া গেল। কেবল চৌকাঠটি পার হইলেই হয়।

     ফণিভূষণ আর থাকিতে পারিল না। তাহার রুদ্ধ আবেগ এক মুহূর্তে প্রবলবেগে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল, সে বিদ্যুদ্‌বেগে চৌকি হইতে উঠিয়া কাঁদিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল, মণি!”

    যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানবেন উল্লিখিত অংশটি রবীন্দ্রনাথের ‘মণিহারা’র। রবীন্দ্রনাথের লেখা ভূতের গল্পগুলোর মধ্যে ‘মনিহারা’র উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এই গল্পের মধ্যে একরকম ‘গথিক’ গন্ধ পাওয়া যায়। ‘গথিক’ মানেই যে ভূতের গল্প, এরকম কোনো মানে নেই। ভূতের গল্পে 'গথিক'-এর উপস্থিতি নির্ভর করে যিনি লিখছেন তাঁর মতিগতির উপরে। উজ্জ্বল চক্রবর্তীর একটি সাক্ষাৎকারে ‘মণিহারা’ গল্পটিকে ভূতের গল্প না বলে, ভূতের গল্পের উপঘরানা ‘গথিক টেল’ বলা হয়েছে। কেন বলা হয়েছে সে প্রসঙ্গে বলবো, তার সঙ্গে 'গথিক' কী এবং বাংলা সাহিত্যে ‘গথিক’ কাহিনির যে স্থান, তা নিয়েও আলোচনা করবো।

    স্থাপত্যশিল্পে একটি বিশেষ ধারার নাম ‘গথিক’। গথিক শৈলির মধ্যযুগীয় দুর্গ, প্রাসাদ বা তার ধ্বংসাবশেষ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে রোমান্টিক কল্পনাকে আকর্ষিত করেছিল। কথাসাহিত্যের ইতিহাস রহস্য ও আতঙ্কঘেরা সেইসব লেখাই ‘গথিক’ আখ্যা পেয়েছে। গথিক সৌধের অন্ধকার বারান্দা ও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধা, গুপ্তকক্ষ, চোরাদরজা—এসব যেন নির্মম অত্যাচারের গোপন সাক্ষী। মোদ্দাকথা, ‘গথিক’ হল এমন একটা ‘স্ট্রাকচার’, যার ব্যপক শূন্যতায় মনে ঘোর লাগে, আর সেই সুযোগেই ঢুকে পড়ে রহস্য, ভয়, আতঙ্ক, কল্পনা। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে হোরেস ওয়ালপোল রচিত ‘ক্যাসেল অফ ওটরান্টো’-কে গথিক উপন্যাসের পথিকৃৎ বলে মনে করা হয়। ১৮১৮-তে লেখা মেরি শেলির ‘ফ্রাঙ্কেন্সটাইন’ যেমন একটি গথিক উপন্যাস, তেমনই সায়েন্স ফিকশনও। বিশ্বসাহিত্যের বহু লেখককেই গথিক কল্পনা উদ্বুদ্ধ করেছে। পো, হর্থন, ডিকেন্স, পুশকিন, গোগোল এমনকি সত্যজিৎ রায়ও বেশ কিছু গথিক কাহিনি লিখেছেন। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের কথাও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তবে, তাঁদের অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ বাংলায় প্রথম গথিক কাহিনি লিখে ফেলেছিলেন। শুরুতে সেই কথাই বলবো বলেছিলাম। এবার আসি সেই কথায়…একবার কুচবিহারের রানি রবীন্দ্রনাথের কাছে ভূতের গল্প শুনতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁর অনুরোধ রেখে ভাঙা পোড়ো বাড়ি, কঙ্কালের খটখট শব্দ ইত্যাদি যোগ করে ‘মণিমালিকার’ গল্প শুনিয়েছিলেন। ‘মণিহারা’ গল্পের মূল উপাদান ছিল সেটাই। জানালা-ভাঙা, বারান্দা-ঝুলে পড়া জরাগ্রস্ত বৃহৎ অট্টালিকা (যেন হানাবাড়ি), ভূতুড়ে জুড়ি-গাড়ি (যেন হানাগাড়ি)—‘মনিহারা’র এই সব লক্ষণ মূলত গথিক কাহিনির দিকেই নিয়ে যায়। ভূতের অস্তিত্বে বিশ্বাস না-করেও ভৌতিক রসের শিহরণ সৃষ্টি করেছেন রবীন্দ্রনাথ। একটা অনির্দিষ্ট ব্যাপার, কিছু সংশয়ে দুলিয়ে দিয়ে গল্প শেষ হয়ে যায়। গথিক কাহিনিতে ভূতের দেখা মিলবে এরকম কোনো নিয়ম নেই। এ ক্ষেত্রে শুধু ভূত নয়, রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার, অলৌকিক অশরীরীরাও আসতে পারে। ব্রাম স্টোকারের গথিক কাহিনি ‘ড্রাকুলা’ যেমন। এই কাহিনিতে অশরীরী উপস্থিতি নয়, আতঙ্ক সঞ্চারে পরিবেশ একটা বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। সরাইখানা, ঘোড়ার গাড়ি চড়ে যাত্রা, কাউন্টের ক্যাসল ইত্যাদি। শুধু ‘মণিহারা’ নয়, কিশোর বয়সে শাহীবাগ প্রাসাদে বাসের অভিজ্ঞতাকে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছিলেন ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এ।

    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতে, “ভূতের গল্পেরই একটা অংশ ‘গথিক’। পুরোনো বাড়ি বা হানাবাড়ি, যা নিয়েই গল্প লেখা হোক না কেন আসল ব্যাপার তো সেই ‘ভূত’ই। ভূতকে ওভাবে ‘ক্লাসিফায়েড’ করা যাবে না, ভূতের গল্প নানাভাবে হতে পারে। যেমন, তুমি ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর কথা বলছিলে--এই গল্পটাকে তো ঠিক ভূতের গল্প বলা যায় না, এটা অতীত আর বর্তমানের একটা ইলিউসন। পুরোপুরি ভূতের গল্প না হলেও, একটা ‘গথিক’ ভৌতিক পরিবেশ সেখানে ছিল।”  

    রবীন্দ্রনাথের আগে বাংলায় কোনো ‘গথিক’ কাহিনির ট্রাডিশন ছিল না। ১৯৬১ সাল। রবীন্দ্রনাথে জন্মশতবর্ষ। ‘তিন কন্যা’ ও ‘রবীন্দ্রনাথ’ ছাড়াও এই বছরেই বাপ-ঠাকুরদাদার ‘সন্দেশ’কে ফিরিয়ে আনেন সত্যজিৎ রায়। আর নতুনভাবে প্রকাশিত সন্দেশ-এর জন্যই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন কথাশিল্পী সত্যজিৎ রায়। সায়েন্স ফিকশন থেকে শুরু করে গোয়েন্দা, গথিক—সবেরই সূচনা ১৯৬১-এর পর থেকে। ‘ফ্রিৎস’, ‘খগম’, ‘ভূতো’, ‘মি. শাসমলের শেষরাত্রি’র মতো নানা ধরনের ভয়-জাগানো গল্প লিখেছেন সত্যজিৎ। ভূতের ভয় দেখিয়ে সাহেবপ্রীতিও দূর করিয়েছেন তিনি। গথিক গল্প হিসেবে উল্লেখ করার মতো অনাথবাবুর ভয়, বাদুড় বিভীষিকা, নীল আতঙ্ক, গগন চৌধুরীর স্টুডিও, ব্রাউন সাহেবের বাড়ি। ‘অনাথবাবুর ভয়’ গল্পে হালদার বাড়ি সৃষ্টি করেছে গথিক পরিবেশ—টানাপাখার ভাঙা অংশ, অচল গ্র্যান্ডফাদার ক্লক, ভাঙা ফটক ও ভেঙে পড়া নহবতখানা।

    ব্যভিচার ও নিষ্ঠুরতাও মূক সাক্ষী রূপে বাংলা সাহিত্যে সাবেকি আমলের নীলকুঠি, ডাকবাংলো বা ফরেস্ট বাংলো, গথিক দুর্গ বা প্রাসাদের ভূমিকা নেয়। ভৌতিক উপাখ্যানের উপাদানের মধ্যে সমাজ চেতনার এই ধরনের রেশের প্রতি প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুকুমার সেন লিখেছিলেন, গত শতাব্দীতে মহামারি রূপে ম্যালেরিয়া দেখা দেওয়ার পর, এ-দেশে মুখে মুখেও এক ধরনের ভূতের গল্প চালু হয়েছিল। সুকুমার সেনের লেখা থেকে আরও জানা যায়, শুধু বাংলা নয়, সংস্কৃত, পালি ও প্রাকৃত সাহিত্যেও যক্ষ, রক্ষ, ভূত, প্রেত, পিশাচের সন্ধান মেলে। এই জাতীয় ভূতের উপস্থিতি সত্ত্বেও, সেগুলো ঠিক ভূতের গল্প নয়, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো ছিল নীতি উপদেশের জন্য কিংবদন্তিমূলক লেখা, গথিকের কোনো চিহ্ন তাতে ছিল না।

    গ্রন্থঋণঃ

    প্রবন্ধ সংগ্রহঃ সিদ্ধার্থ ঘোষ

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @