শাড়ি ও ভারতীয় ঐতিহ্য

শাড়ি শুধু পরিধেয় বস্ত্রই না, শাড়ি বাঙালি জাতির এক গৌরবময় সংস্কৃতির প্রতীক। প্রাচীনকাল থেকে এদেশের বর্ণিল, সূক্ষ্ম ও বাহারি শাড়ির খ্যাতি জগৎবিখ্যাত। এসব শাড়ি যেন এক একটি ক্যানভাস, এক একটি শিল্পকর্ম। মসলিন, বেনারসি, কাতান, চান্দেরী, জামদানিসহ নানা ধরনের শাড়ি বাঙালি সংস্কৃতির নান্দনিকতার পরিচয় বহন করে সব সময়।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভারতীয় উপমহাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম, দর্শন, সভ্যতা ও সংস্কৃতি সমূহের মিলনস্থল। ভিন্ন ভিন্ন নদী যেমন একই সমুদ্রে এসে পতিত হয় তেমনি ভারতের জনজীবনের মহাসমুদ্রে একেকটি নদীর ধারার মতোই এসে মিলেছে আর্য, অনার্য, গ্রীক, শক, হুন, পার্সি, আরব, তুর্কী, চৈনিক বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী। আর সাথে নিয়ে এসেছে তাদের কৃষ্টি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির অংশ। এজন্যই ভারতীয় সমাজে পরিলক্ষিত হয় সংস্কৃতি ও রুচির এমন বৈচিত্র্যময় মেলবন্ধন। স্থূল পর্যবেক্ষণে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রধানতম সংস্কৃতি তিনটি। হিন্দুস্তানী (উত্তর ভারত ও বর্তমান পাকিস্তান), কর্ণাটী (দক্ষিণ ভারত) ও পূর্বভারতীয় (বাংলা, আসাম, উড়িষ্যা)। তবে পূর্বভারতীয় সংস্কৃতি অনেকটাই আর্য হিন্দুস্তান আর অনার্য কর্ণাটী সভ্যতার শংকর। সংস্কৃতির এত ভিন্নতার মধ্যেও যে কয়েকটি মিল রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারীদের পরিধেয় শাড়ি। এই শাড়ি কখনো বাঙালি নারীর সর্বাঙ্গে জড়িয়ে থেকেছে, কখনো রাজপুতানীর ঘাগরা হয়ে কোমরে শোভা পেয়েছে। কখনো মারাঠি কুমারীর ধুতি হিসেবে পরিহিত হয়েছে। তাহলে শোনা যাক ভারতীয় শাড়ির উপাখ্যান –
নারীদের পরিধেয় হিসেবে ভারতে শাড়ির প্রচলন কবে তা ঠিক স্পষ্ট নয়। তেমনি স্পষ্ট নয় শাড়ি শব্দটির উৎপত্তি কোন ভাষা থেকে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী শাড়ি পরার প্রচলন শুরু করে আর্যগণ। সে হিসেবে শাড়ির ইতিহাস প্রায় ৫৫০০ বছরেরও পুরনো। কিন্তু সিন্ধু ও মেহেরগড়ের মতো অনার্য সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে যে চিত্র পাওয়া যায় তাতে নারীর অঙ্গাভরণ হিসেবে শাড়ির মতো বস্ত্রখণ্ড ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই অনুমান করা যায় ভারতে সর্বপ্রথম অনার্য অসুর জাতির মধ্যেই শাড়ির প্রচলন শুরু হয়। তখন অনার্যরা সেলাই পদ্ধতি জানত না। ফলে কালক্রমে অখণ্ড বস্ত্রখণ্ড ধুতি, উত্তরীয় এবং শাড়িই পুরুষ ও নারীদের পোশাক হিসেবে সমাজে স্থান পায়।
শাড়ি শব্দটির উৎপত্তি কোন ভাষা থেকে হয়েছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়না। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে সংস্কৃত ‘সত্তিকা’ শব্দ থেকেই শাড়ির উৎপত্তি। তবে অনার্য সভ্যতায় অনেক আগে থেকেই ‘শাটী’ শব্দের প্রচলন পরিলক্ষিত হওয়ায় কেউ কেউ মনে করেন শাটীই শাড়ির মূলশব্দ।
ভারতের একেক অঞ্চলে শাড়ি পরার কায়দা ভিন্ন। উত্তর ভারতে নারীরা শাড়িকে কোমরে কুঁচি দিয়ে গুঁজে ঘাগরা হিসেবে পরেন। মারাঠি রমণীরা ধুতির মতো পা দুটিকে ঢেকে শাড়ির কুঁচিকে কোমরের পিছনে পরেন। দক্ষিণ ভারতে পূর্বে স্তনকর নামে এক অদ্ভুত ট্যাক্স হিন্দু রাজাদের সময়ে বিদ্যমান ছিল। উপমহাদেশে পূর্বভারত তথা বঙ্গের নারীরা আটপৌরে ভাবে সারা অঙ্গ জড়িয়ে শাড়ি পরতেন। তবে অন্তর্বাসের প্রচলন ছিল না বললেই চলে। ব্রিটিশ আমলে অভিজাত জমিদার পরিবারসমূহে অন্তর্বাসের প্রচলন শুরু হয়। সেসময়েই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বধূ জ্ঞানদানন্দিনী পার্সি কায়দায় কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরার স্টাইল আরম্ভ করেন।
ভারতীয় উপমহাদেশের জনপ্রিয়, ঐতিহ্যবাহী শাড়ির মধ্যে বেনারসি, চান্দেরী, ভেঙ্কটগিরি ও গাদোয়াল বিশ্বে সমাদৃত।
ভারতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে চান্দেরী শাড়ির সম্পর্ক অনেক প্রাচীন। মধ্যপ্রদেশের চান্দেরী অঞ্চলে তৈরি এই শাড়ি প্রধানত তিন ধরনের কাপড়ে বোনা হয়। বিশুদ্ধ রেশম, চান্দেরী সুতি আর রেশম ও সুতির মিশ্রণ। প্রাচীন কিংবদন্তী অনুযায়ী চান্দেরী শাড়ির উৎপত্তি মহাভারতের বিখ্যাত চেদীরাজ শিশুপালের সময়। সম্ভবত চেদী থেকেই চান্দেরী নামটি এসেছে। বুননের দক্ষতার জন্য চান্দেরী শাড়ি অন্যান্য শাড়ির তুলনায় অনন্য। আসল চান্দেরী শাড়ির উপর হাত বোলালে বরফে হাঁটার মতো আওয়াজ শোনা গেলেই শনাক্ত করা যায়। এই শাড়ির সমস্ত জমিন জুড়ে থাকে চেক ও ফুলের নকশা আর আঁচল ও পাড়ে জরির বর্ডার। সূক্ষতার জন্যও চান্দেরী ভারতবিখ্যাত। কথিত আছে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময় এই শাড়ি দ্রৌপদীর পরনে ছিল বলেই দুঃশাসন তাকে নিরাভরণা করতে পারেনি। মুঘল আমলে বাদশাহ আকবরকে ছোট্ট বাঁশের কৌটোয় করে এই শাড়ি উপহার দেয়া হয়। এবং সম্রাটের কথামতো সূক্ষ্মতা পরীক্ষার জন্য সেই শাড়ি দিয়ে একটি হাতিকে সম্পূর্ণরূপে মুড়ে দেয়া হয়। মুঘল আমলে মুসলিম তাঁতিরাই সাধারণত চান্দেরী বুনত। ব্রিটিশ শাসনের সময় হিন্দু কারিগররাও এর বুনন কৌশল আত্মীকরণ করে নেয়।
চান্দেরীতে যেমন শুধু আঁচল ও পাড়ে জরির বর্ডার থাকে দক্ষিণ ভারতের ভেঙ্কটগিরি শাড়িতে ঠিক তার উল্টো। ভেঙ্কটগিরিতে সূক্ষ্ম সুতির বুননে অথবা সিল্কের শাড়িতে জরির নকশা থাকে বিভিন্ন জায়গায়। এর নকশার অর্ধেকে থাকে সুতি সুতোর পশু পাখি কিংবা ফুলেল প্যাটার্ন আর বাকি অর্ধেক জরির সুতোয় বোনা। পাড়ে ও আঁচলে সোনালি মোহর, পাতা, কল্কা, পাখির নকশা থাকে। হাল্কা রঙের জমিনে অনুজ্জ্বল সোনালি বর্ণের মোহর একে আকর্ষণীয় করে তোলে। হায়দরাবাদের ভেঙ্কটগিরি অঞ্চলের নামানুসারে এই শাড়ি পরিচিত।
বাঙালির জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান বিবাহ। আর বিবাহের সাথে হাজার বছর ধরে যে নামটি মিশে আছে তা হচ্ছে বেনারসি শাড়ি। ভারতের বেনারস থেকে বাংলাদেশের মোহাম্মদপুর ও মিরপুর, ইতিহাস তার আপন গতিপ্রবাহে এসে মিলেছে উত্তরভারত থেকে পূর্বভারতে। কিংবদন্তী অনুযায়ী বেনারসি কারিগরদের পূর্বপুরুষরা মদিনা থেকে মুসলিম শাসনামলে উত্তরভারতের বারাণসী শহরে আগমন করেন। বেনারসি শাড়ির প্রথম কারখানা স্থাপিত হয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের আমলে। মুঘল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই শিল্প জমজমাট হয়ে উঠে। ভারতভাগের পর অনেক কারিগর বিহার ও অযোধ্যা থেকে পূর্বপাকিস্তানের মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে চলে আসেন। এভাবে বেনারসি শাড়ির ঐতিহ্য বাংলাদেশে আরও গভীর স্থান লাভ করে। বেনারসির মূল উপাদান রেশম। চীন থেকে আমদানিকৃত সুতো দিয়েই মূলত আসল বেনারসি বা কাতান তৈরি করা হয়। এজন্য প্রথমেই আঁকা হয় শাড়ির নকশা। তারপর আঁকা হয় গ্রাফ। গ্রাফের বর্ণনা অনুযায়ী সুতো রং করে তাঁতে তোলা হয় নকশা অনুযায়ী বুননের জন্য। একে বলা হয় জাকট। তারপর শুরু হয় বুননের কাজ। প্রতিটি শাড়ি বুনন করতে সময় লাগে ৫-৮ দিন। তারপর শুরু হয় জরি, চুমকি বসানোর মতো হাতের কাজ। এভাবে একটি বেনারসি শাড়ি সম্পূর্ণ তৈরি করতে সময় লাগে দুই থেকে তিন সপ্তাহ। আসল বেনারসি শাড়ি শনাক্ত করার সহজ উপায় হলো হাতে বোনা আসল বেনারসি শাড়ির রং এবং সুতো অত্যধিক জমকালো নয় বরং অকৃত্রিম ও স্থায়ী হয়। সুতোয় হাত বোলালে পেলব অনুভূত হয়। বর্তমানে ভারতীয় নকল বেনারসি শাড়ি দিয়ে বাজার ভর্তি। ফলে বাংলার বেনারসি শিল্প প্রায় ধ্বংসের সম্মুখীন।
ভারতীয় উপমহাদেশের নারী আর শাড়ির যোগসূত্র হাজার হাজার বছরের পুরনো। বর্তমান যুগে আধুনিকতার ঢেউয়েও শাড়ি ধরে রেখেছে তার ঐতিহ্য। অনন্তকাল টিকে থাকুক নারীর চিরন্তন সৌন্দর্যের এই প্রতীক এটাই কামনা।
(ঋণ – টেক্সটাইলবাংলা২৪.কম)