বছরে দু’বার সরস্বতী দিবস পালিত হয় ইন্দোনেশিয়ার বালিতে

“সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী বিদ্যাং দেহি নমঃস্তুতে”
— শীতের হালকা আমেজের স্পর্শে, বসন্ত পঞ্চমীর আবাহনে, বাসন্তী রং-এর কাপড় পরা, সলজ্জ নারীত্বের প্রথম উন্মেষের বিভায়, বঙ্গসন্তানেরা যখন এই স্তুতি করি, তখন মা সরস্বতীর বিদ্যারূপিণী মুখটাই আমাদের মনে পড়ে। কিন্তু একটু ভালো করে যদি আবেগ আর বাহ্যিক আড়ম্বরের রেশটা কাটিয়ে ওঠা যায় তবে দেখা যায় দেবী সরস্বতী বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মীও বটে। তার ঐ কমল-স্বরূপ পদ্মনেত্র দিয়ে তিনি সমগ্র বিশ্বের অন্যতম ক্রিয়াশীল শক্তিরূপিণী
বসন্ত পঞ্চমীতে মায়ের আবাহন বহু প্রাচীন আচারণ। কিন্তু এই দেবী সরস্বতী সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই কোথায় যেন আমাদের জীবনচর্যায়, নদীমাতৃক সভ্যতা সৃষ্টিতে, বৈদিক ঋষির প্রথম ধ্বনির উদাত্ততায়, নারী শক্তির শাশ্বতঃ সত্যের উন্মোচনে জগৎকল্যাণে বারংবার নিজেকে উদ্ভাসিত করেছেন। ঋগবৈদিক সরস্বতী দেবী, পৌরাণিক সরস্বতীর কথার মধ্যে দিয়ে আজ এই ২০২১-এও একই রকম গুরুত্ব, ভক্তির দ্বারা পূজিত, শুধু এই বঙ্গভূমি বা ভারতবর্ষেই নয়, তার বাইরে, বৃহত্তরভারত ভূখণ্ডে বা জম্বুদ্বীপের অন্য প্রদেশেও।
শ্রী রূপে অন্নপূর্ণা রূপে সরস্বতীর প্রকাশ
ভারতবর্ষের অধুনা যে বাগদেবীরূপিণী সরস্বতীর পূজা হয়, জ্ঞান-বিদ্যাদায়িণী সেই দেবীর পূজা ইন্দোনেশিয়ার বালি প্রদেশে বছরে দুবার হয়। বালি প্রদেশের প্রায় সকল গৃহস্থের পূজা ঘরে দেবী সরস্বতীর মূর্তি পূজিত হয়। শুধুমাত্র জ্ঞানের দেবীরূপেই নয়, সরস্বতী আরাধনায় আর একটি বিশেষ কারণ সে দেশে মনে করা হয়, তিনিই শষ্য উৎপাদনকারিণী শ্রী, আবার জীবনদায়িণী, সভ্যতার রক্ষাকর্ত্তী জলের উৎসও তিনি। তাই সমগ্র বালি দেশে সরস্বতী দিবস একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
বাড়িতে সরস্বতী মূর্তির সামনে বালির কন্যারা
২০১৭ সালের বালির ডেনপাসার, উবুদে যখন প্রথম এই সরস্বতী বন্দনার সঙ্গে পরিচিত হই, তখন আনন্দ যেমন হয়েছিলো, অবাকও হয়েছিলাম। পরবর্তীকালে এই নিয়ে একটু গভীর ভাবে পড়াশোনা করতে গিয়ে অনুভব করি এই সারদেশ্বরীসরস্বতী,
“অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী
অপ্রশস্তা ইব স্মাসি প্রশস্তিমল্ব নস্কৃধি ॥ (ঋগ্বেদ ২/৪১/১৬)
তাঁকে তো ঋগবৈদিক ঋষি পূজা করেছেন, প্রার্থনা করেছেন মাতৃগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, নদীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, দেবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠসে সরস্বতী! আমরা অসমৃদ্ধের ন্যায় রয়েছি, আমাদের সমৃদ্ধশালী কর।
শুধুমাত্র বাগদেবী, বা নদীরূপিণী নয়। বালিপ্রদেশের সরস্বতী দেবীর মাহাত্মের কারণ বুঝতে গেলে আমাদের নিজস্ব বৈদিক-পৌরাণিক-শাস্ত্রিয় মাটিতে অবশ্যই নির্যাস খুঁজে দেখতে হবে, নাহলে ভারতবর্ষ থেকে প্রায় ৯০০০ কিলোমিটার দূরত্বে, কলকাতা থেকে প্রায় ৮,৮৯৪.৩ কিমি দূরের দেশে জ্ঞানদিবস রূপে, জাতীয় ঐতিহ্যরূপে সরস্বতী দেবীর এই দুটি উৎসবও আরাধনার ঘটনার পরম্পরা আমরা বুঝতে পারবো না।
বৈদিক যুগের আদি লগ্নে সরস্বতীর বন্দনা আছে আরো দুই অন্য দেবীর সাথে। ইড়া ও ভারতী। আমরা পাই
“তিস্বো দেবী বর্হিরেদং সদন্তিড়া সরস্বতী ভারতী”
— ইড়া, ভারতী ও সরস্বতী এই তিন দেবী যজ্ঞে আগমন করেন। পরবর্তীকালে এই দেবীরা একত্রিত হয়ে গেছেন। যাহা ভারতী তাহাই সরস্বতী বলে পরিচিত হয়েছে। বেদে আরো অজস্র শ্লোকের মাধ্যমে এই ভারতী, সরস্বতীর ব্যাখ্যা আছে। ভরত বা ভারতী ‘সূর্য’ অর্থের সমান। তাই কেউ বলেন এই ত্রিদেবী অগ্নির অংশ, কেউ বলেন সূর্যের অংশ। আবার আচার্য যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে এই তিন দেবী তিন ঋতুর যজ্ঞের অগ্নিরূপিণী, — “ইড়া বর্ষাঋতুর, ভারতী শরৎ ঋতুর, এবং সরস্বতী শীত ঋতুর যজ্ঞরূপা তিন দেবী।” আবার সূর্যদেব যেমন তার প্রকাশও তেজের মাধ্যমে সমগ্র জগৎকে উদ্ভাসিত করে এই সরস্বতীও বাক্ রূপে, ধ্বনি, বর্ণ, স্বরের মাধ্যমে আকাশ, বাতাস, জল, পৃথিবী, অন্তরীক্ষ সর্বত্র তার প্রকাশ করে চলেছেন।
বেদের সরস্বতী যজ্ঞরূপা, তিনি আবার অন্নপূর্নাও। তাই বৈদিক ঋষিরা প্রার্থনা করেছেন সকলের কল্যানের জন্য —
পাবকাঃনঃ সরস্বতী বাজেভির্বাজিনীবতী
যজ্ঞঃ বষ্টু ধিয়াবসুঃ।
শ্রদ্ধেয়রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয় অনুবাদ করেছেন — “পবিত্রা, অন্নযুক্তাবিশিষ্টা, ও যজ্ঞফলরূপ ধনদাত্রী সরস্বতী আমাদিগের জন্য অন্নবিশিষ্ট যজ্ঞ কামনা করুন।” জ্যোর্তিময়ী এই দেবী সর্ব প্রকারে জ্ঞানের উদ্ভাস করেন জগতের। আমাদের কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী তার সারদামঙ্গল কাব্যে লিখেছেন —
“সহসা ললাটভাগে
জ্যোর্তিময়ী কন্যা জাগে
জাগিল বিজলী যেন নীলনবঘনে।”
দেবী সরস্বতী জ্ঞানবর্ধনকারিণী, অন্নপূর্নারূপিণী, ঐশ্বর্য প্রদায়নী লক্ষ্মী রূপিণীই শুধু নয়, তিনি বেদে রোগনিবারণ কারিণীও। ভিষকাচার্যও। “বাচাসরস্বতী ভিষগিন্দ্রায়েন্দ্রিয়াষি দধতঃ।” তিনি বৈদ্য বা ডাক্তারও ছিলেন। পরবর্তীকালে (১১শ শতাব্দীতে) কথাসরিত সাগরে সোমদেব জানিয়েছেন যে পাটলিপুত্রের নারীরা রুগ্নব্যক্তির চিকিৎসার জন্য সরস্বতীর ঔষধ ব্যবহার করতেন। এই জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী নদীরূপে সর্বাপেক্ষা শ্রদ্ধেয়। সরস্বতীকে কোথাও পঞ্চনদীমাতৃকা বলা হয়েছে, কোথাও অন্নদাত্রীরূপে তার জলে পুষ্ট মানবসভ্যতার কথা আছে।
উবুদের রাজবাড়িতে মা সরস্বতী
সেকালে সরস্বতীর তীরে তীরে ছিল প্রসিদ্ধতীর্থক্ষেত্র। বাগদেবীসরস্বতী, ব্রহ্মাপত্নীসরস্বতী আবার দানবদলনী সরস্বতীর কথাও উল্লেখ আছে বেদ এ। তিনি বৃত্রাসুর ও অন্যান্য মায়াবী দানবকে বধ করেছেন, দেবনিন্দক গণকে বধ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আমরা মনে করতে পারি আমাদের চণ্ডীপাঠেও মহাসরস্বতী রূপে দেবীর অসুর বধের পর্বটিকে। সেই ত্রিবিধ শক্তিরূপা দেবী সরস্বতীর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা আমরা বেদ-পুরাণ, তন্ত্র-শাস্ত্রতে দেখতে পাই। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈনসকলেই এই শুদ্ধবিদ্যাদাত্রী দেবীর আবাহন করেছেন। কখনও তিনি হংসে অধিষ্ঠিত, কখনো বা ময়ূরে। সর্বদা শ্বেতশুভ্রবস্ত্রাবৃতা দেবীর আর এক নাম বর্ণেশ্বরী। সেখানে তিনি রক্তবর্ণা। আবার যে শারদা/সারদা সরস্বতীর উল্লেখ পাই শাস্ত্রে তিনি বর্ণজননী, পঞ্চআননী, দশভুজা, ‘কলা’ তার আত্মা। সর্বকলার অধিষ্ঠাত্রী। বেদের সরস্বতীপুরাণে এসে চর্তুভুজা। তপ্তকাঞ্চনবর্ণা, বীনা, পুস্তক, মালা, ও কমন্তুলধারিণী। কোনও এক সময়ে শুক্লযজুঃবেদে, সারস্বত সূত্রে মেষী বলি দেবার উল্লেখও আছে। ডঃ নীহাররঞ্জন রায়, তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন — “বাঙ্গালা দেশের কোথাও কোথাও সরস্বতী পূজার দিন এখনও ভেড়া বলি ও ভেড়ার লড়াই সুপরিচিত।” — আজকে সে প্রথা কতটা আছে জানা নেই, কিন্তু বর্ণেশ্বরী বাগেশ্বরীর আরাধনায় আজও হলুদ/বাসন্তী বস্ত্র পরিধান করা আছে।
আরও পড়ুন: সংক্রাণ : থাইল্যান্ডের পয়লা বৈশাখ উদযাপন
বালি প্রদেশের সরস্বতীদেবীর আরাধনায় এতোক্ষণ যা লিখলাম সেই বৈদিক, পৌরাণিক আধুনিক, তান্ত্রিক, শাস্ত্রিক সবকিছুই মিলে মিশে রয়েছে। ২১০ দিন অন্তর বালীর মানুষরা সরস্বতী দিবস পালন করেন। যেটি তারা জ্ঞানদিবস বলে উৎসব করেন। এই সরস্বতী আরাধনার সঙ্গে জড়িত থাকে বিভিন্ন প্রকার আচার, আচরণ, পূজা, হোম, আহুতি। তারসঙ্গে থাকে বিভিন্ন প্রকার শ্রী গঠন করা, পূজার উপাচার তৈরি করা। সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান পর্ব চলতে থাকে বেশ কয়েকদিন ধরে। যেদিন সরস্বতী দিবস পালন হয়, তার ঠিক চারদিনের মাথায় পালিত হয় ‘পাগেশ্বরী’ বা ‘বাগেশ্বরী’ উৎসব।
বালি দ্বীপের তালপাতার উপর মা সরস্বতী
সমগ্র বালি প্রদেশে ‘আদি সরস্বতী’ নামে পুস্তক পাওয়া যায়। যা আমাদের পুন্যগীতার মতো। বালিদেশে এটি পরিচিত ‘লোনটার’ নামে। লোনটার মানে আমাদের প্রাচীন তালপত্রের পুঁথি। মা সরস্বতীর হাতে যে পুস্তক থাকে বালি দেশে তা ঐ তালপত্রের পুঁথি। বালিবাসীরা মনে করেন ঐ তালপাতার পুঁথিটিতে মানবজীবনের সমস্ত অভিলাষা জ্ঞান-বিজ্ঞান শিল্পকলার শিক্ষা, আধ্যাত্মিক জীবন গঠনের পন্থাও পথ, প্রাকৃতিক জ্ঞান, অন্নপূর্নার ভাণ্ডার সকল কিছুর ঐশ্বর্য্যরক্ষা আছে। তাই এই আজি সরস্বতী লোনটার বা আজিসরস্বতী পুঁথিটির অত্যন্ত সম্মান সমগ্র দেশে। প্রতিটি মন্দিরে, মিউজিয়ামে, গৃহস্থের ঘরে এই ‘আজি সরস্বতী পুঁথি’ অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে, শ্রদ্ধার সঙ্গে রাখা থাকে। বাড়ির গুরুজনেরা, পরিবারের অন্যসদস্যদের নিয়ে পাঠ করেন এই পুঁথি। ছোটবড় সকলেই সেই পাঠ শোনেন। সমস্ত স্কুল, কলেজ, অফিসে সরস্বতীর আরাধনা হয়। সমস্ত বই, খাতা, বাদ্যযন্ত্র, ও অন্যান্য জিনিস যা এই শাস্ত্রের সঙ্গে জড়িত তা সরস্বতী মূর্তি বা ফটোতে নিবেদন করে দেওয়া হয়।
‘পদণ্ড’ বা বালীদেশীয় পুরোহিতরা পূজার মাধ্যমে এই সকল বই, খাতা, অনান্য বস্তুকে মায়ের আশীর্বাদের জন্য নিবেদন করেন। সেদিন কেউ ঐগুলিতে হাত দিতে পারেন না। সন্ধ্যাবেলা সকলে মিলে আজি সরস্বতী পুঁথি পাঠ করেন।
লোনটার বা সরস্বতী পাঁচালি পড়ছেন বাড়ির গুরুজন
সরস্বতীর আবাহনে বালিদেশে নানারকম মুখোশ নৃত্য, ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সবথেকে বৃহৎ পূজাও অনুষ্ঠানটি হয় উবুদ শহরটির ২কিমি দূরে একটি নৃত্যশিল্পের গ্রামে। পুরা মধ্য বা পুরা মেদ্যা, পেলিনতানে। বালিভাষায় সরস্বতীর বুৎপত্তিগত অর্থ এইভাবে ব্যাখ্যা করা যায় — ‘সর’ মানে অস্ত্র, ‘স্ব’ বা সোয়া — রেখা, এবং ‘তি’ অর্থে আচরন। অর্থাৎ তেজস্বিণী সরস্বতী দেবী মনুষ্য জীবনের ইতিবাচক পথ ধরে জীবনচলার এক রেখা নির্দেশ করে, জ্ঞানের অস্ত্র দিয়ে অজ্ঞানকে কেটে এগিয়ে নিয়ে যায় মানুষকে। বেদের সেই যোদ্ধা সরস্বতী, যিনি মানবমনের অন্ধকার, দস্যুবৃত্তি গুলোকে অপসারণ করেন শুদ্ধ জ্যোতির, সত্যের অস্ত্রে।
সমগ্র বালি প্রদেশে ‘আদি সরস্বতী’ নামে পুস্তক পাওয়া যায়। যা আমাদের গীতার মতো। বালিদেশে এটি পরিচিত ‘লোনটার’ নামে। লোনটার মানে আমাদের প্রাচীন তালপত্রের পুঁথি। Washington DC-তে আছে ইন্দোনেশিয়ান সরকারের দেওয়া ১৬ ফুটের একটি অপূর্ব সুন্দর সরস্বতী মূর্তি।
এই সরস্বতীদেবীর অন্নপূর্না রূপকে খুব অদ্ভুতভাবে বালিদেশের কৃষিকার্যের মধ্যে রূপ দেওয়া হয়েছে। নদীতমে সরস্বতী আর লক্ষ্মীরূপী শ্রী-কে বালিবাসী ‘সুবাক’ নামে এক অপূর্ব জলপ্রনালীর মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রায় সমগ্র ইন্দোনেশিয়ার কৃষিকাজে। সরস্বতীর নদীরূপের যে জলাধারার প্রবাহ, তাকে দেবীর আশীর্বাদ স্বরূপ মনে করা হয়। আর তাই যাতে সব কৃষি জমিতে সমানভাবে পর্বত প্রদেশ থেকে নেমে আসা জলস্রোতে পুষ্টি লাভ করে তার জন্য অত্যন্ত খেয়াল রাখা হয়। দেশবিদেশের মানুষ আসে এই ‘সুবাক’ system-এর কৃষিবণ্টন দেখতে। নামটাও খেয়াল করুন — ‘সুবাক’, সেই বাক্দেবী, বাগেশ্বরীর চিন্তনে। সমগ্র বালিদ্বীপেই সরস্বতী উপাসনা তাই অত্যন্ত মহত্ত্বপূর্ণ। অসংখ্য বৈচিত্র্যময়, নানারকমের উপাখ্যান সরস্বতীর সঙ্গে যুক্ত করে গ্রামবাসীরা, শহরবাসীরা জীবনযাপন করেন।
কিছু বিশেষ অনুষ্ঠান থাকে ঐ উৎসবে। মিটনিন একটি আধ্যাত্মিক পরীক্ষা, ম্যাকাস একটি শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান, মেলাষ্টি — সমুদ্রে স্নান করে আভ্যন্তরীণ ও বাহ্য শুচিতা গ্রহণ। একটি বিশাল শোভাযাত্রাও এসময়ে হয়। কুলুতে যেমন দশেরার সময় নিজেদের গৃহদেবতা নিয়ে শোভাযাত্রা হয়, এখানেও পুরুষ, নারী, শিশু বৃদ্ধ সবাই সুন্দর ভাবে নতুনকাপড়ে, ফুলের গহনায় সেজে একটি শোভাযাত্রা করে নিকটবর্তী সমুদ্রের কাছে যায়। সেখানে তারা অপূর্ব সুন্দর সিংহাসন বা পালকি করে তাদের ‘প্রতিমা’কে কাঁধে করে নিয়ে যায়। সমুদ্রের কাছে প্রার্থনা করেন, স্নান করেন। এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি সেদেশে Nyangsung বা ন্যুয়ংসুং নামে পরিচিত।
বিভিন্ন রকম পতাকা, ব্যারং নৃত্য ও নানাস্তোত্র পাঠ করতে করতে তারা এই শোভাযাত্রা নিয়ে চলেন।
শোভাযাত্রা
সরস্বতী দিবস থেকে বাগেশ্বরী উৎসব বা পাগেশ্বরী অবধি বালিবাসী অত্যন্ত সংযমের সঙ্গে দিন কাটান। পাগেশ্বরী একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক কর্মের দিন। ঐদিনটি প্রতীকী উপায়ে নিজেদেরকে যেন অন্য কোনকিছুর লোভে প্রলোভিত না হতে হয় এভাবে বন্ধন দেওয়া হয়।
পাগেশ্বরী উৎসবে সামিল এক পরিবারে
আজি সরস্বতী পুঁথির থেকে পাঠ, অথবা ধ্যান, উপাসনার মধ্যদিয়ে এই দিনটি পালিত হয়।
এই সরস্বতী পূজা উপলক্ষে যে মুখোশ নৃত্য হয়, সেখানে একজন পুরুষ পঞ্চানন শিব সাজেন, আর একজন উমা বা দুর্গা রূপে অভিনয় করেন। তোপেং নৃত্য বলে আর একটি মুখোশ নৃত্যে নৃত্যকাররা বিবৃত করেন কিরূপে মা সরস্বতীর থেকে সকল অক্ষরের সৃষ্টি হয়েছে। এই উৎসবে আর একটি বিশেষ ধরনের চরিত্রের দেখা পাওয়া যায়, যাকে ‘সিদ্ধকার্য’ বলা হয়। তারা সরস্বতী রূপি পূর্ণ-ব্রহ্মের বিষয়ে নানা সঙ্গীত ও ব্যাখ্যা পরিবেশন করে। আমাদের জাগতিক বিষয়কেন্দ্রিক জগতের সঙ্গে অপার্থিব জগতের আধ্যাত্মিক মেলবন্ধন ঘটনার চেষ্টা করেন।
শুধু আচার, ধর্মাচারণ, নৃত্য, গীতই নয়, সরস্বতী দিবসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক অপূর্ব খাদ্যশৈলী। বালির হিন্দুরা বিশ্বাস করেন অমৃতের শক্তিতে। তাঁরা বিশ্বাস করেন এই জগতের প্রকৃত সত্যকে জানতে গেলে অমৃতের সন্ধান করতে হবে। বালি ভাষায় যাকে বলা হয় ‘আমৃতা’। এই বিষয়ে বিশেষ যে নৃত্য হয়, কিভাবে সমুদ্রমন্থনে অমৃতের সৃষ্টি হলো, সেটি দেখানোর আগে, যিনি দালাং বা প্রধান শিল্পনির্দেশক হন তিনি সরস্বতী দেবীর আরাধনা করেন — “সরস্বতী স্বাহা জ্ঞানম, প্রজ্ঞা ন্যায়া”। — সঠিক বৈদিক বা সংস্কৃত উচ্চারন হয়তো নয়, কিন্তু যে প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও সম্মান তাঁরা সরস্বতীদেবীকে করেন তা অবশ্যই আমাদের জানা উচিত।
অপূর্ব সুন্দর এক ধরনের শ্রী তৈরি করে গ্রামের সব মহিলারা একসঙ্গে। তাঁরা প্রায় এক মিটার উঁচু এই শ্রীগুলি তৈরি করেন রঙিন চালগুঁড়োর মণ্ড দিয়ে। বানজার টেঙ্গার গ্রামের মহিলাদের বানানো এই অপূর্ব খাদ্যশিল্প শৈলীটি প্রতিবিম্বিত করে ঈশ্বরও মানুষের মধ্যের সুক্ষ্ম সম্পর্ককে। বালির বিখ্যাত পর্বত শীর্ষ গুনুং আগুং এর প্রতিরূপ যেন ঐ ‘শ্রী’র মধ্যে প্রতিফলিত হয়।
বহুরকমের শিল্পকলা, কৃষিপূজা, শিক্ষার সামগ্রীকে বিভিন্ন ধরনের Exhibition, অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরা হয়। বালির কন্যারা তাদের পরিধানে সেদিন হলুদ রং-এর বস্ত্র রাখেন। মাথায় অপূর্ব সুন্দর ফুলও বাহারি সাজ গ্রহণ করেন। হাতে বাঁশপাতার টুকরিতে নৈবেদ্য সাজিয়ে, ধূপ, দীপ জ্বালিয়ে যখন মায়ের মন্দিরে, বা ঘরের বেদীতে মায়ের ছবির সামনে রাখে তখন আর কোনও প্রভেদ পাই না সেই ধ্রুবসত্যের সনাতনী ভক্তির রূপটিতে। ॐমন্ত্রের ধ্বনিতে অনুরনন হয় চতুর্দিকে।
শেষ করবো ইন্দোনেশিয়া সরস্বতী মন্দির ও বিশ্বের দরবারে মা সরস্বতীকে উপহার দেওয়ার ঘটনার উল্লেখ করে।
বালিদ্বীপে উবুদের পুরাতামান সরস্বতী মন্দিরটি বিশ্বখ্যাত অধুনা। এটিকে ওয়াটার গার্ডেন নামেও অভিহিত করা হয়। সমগ্র মন্দিরটি দেবী সরস্বতীর নদীরূপা রূপকে শ্রদ্ধা জানিয়ে জলের বিভিন্ন প্রাকার দিয়ে সাজানো। অপূর্ব পদ্মফুলের দিঘী দিয়ে মন্দিরটি নিবেদিত দেবী সরস্বতীকে। অত্যন্ত মনোরম, আধ্যাত্মিক পরিবেশ এই মন্দিরের। গামেলানের মৃদু আওয়াজে, নদীর সিন্ধতায় ঘেরা মন্দিরটি। বিভিন্ন বারং মুখোশ, অসংখ্য ফলফুলের প্রাকৃতিক নির্যাসে অপূর্ব এক দেবালয়। সরস্বতি দিবসে মন্দির প্রাঙ্গন পূর্ণ হয়ে থাকে বালিদ্বীপের ভক্তিমান বাসিন্দাদের আরতিতে।
বালিদ্বীপে উবুদের পুরাতামান সরস্বতী মন্দির
শুধু বালিদ্বীপেই নয়, সুরাবায়ার জগতকারণ হিন্দু মন্দিরেও প্রত্যক্ষ করে এসেছি অপূর্ব সরস্বতী প্রতিমা। যিনি হংসবাহিত আবার ময়ূর বাহনও বটে। এক বিশাল প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর প্রতিষ্ঠিত চতুর্ভুজা এই অপূর্ব প্রতিমা যেন সাদরে জ্ঞানের আলোক জ্বেলে অন্ধকার ঘুচাও এর আশীর্বাদ দিচ্ছেন।
বাঙালিরা বলে বারোমাসে তেরো পার্বণ। সরস্বতী পূজা নিয়ে কত স্বপ্ন কতকিছু। কিন্তু কখনো কি ভেবেছি যে আমাদের সরস্বতী ঠাকুর বিদেশের ওয়াশিংটন ডিসিতে উপহার দেয়া যায়! ১৬ ফুটের একটি অপূর্ব সুন্দর সরস্বতী মূর্তি উপহার দিয়েছিল, ২০১৩-তে ইন্দোনেশিয়ান সরকার।
ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ১৬ ফুটের সেই অপূর্ব সুন্দর সরস্বতী মূর্তি
ভাবলে অবাক লাগে যে পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার দেশটি যখন তার কোনো উপহার দেওয়ার প্রয়োজন হয় তারা উপহার দেয় একজন হিন্দুদেবীকে। মাত্র ৩% হিন্দুর দেশ সগর্বে প্রতিষ্ঠিত করে জ্ঞানের দেবীকে। Washington DC-র যে রাস্তাটি চলে গেছে সর্বদেশের পতাকা সমন্বিত হয়ে সেখানে গেলে আপনি দেখতে পাবেন অনিন্দ্যসুন্দর সরস্বতী মূর্তি রাখা রয়েছে ইন্দোনেশিয়ান এমব্যাসির সামনে। রয়েছে ইন্ডিয়ান এমব্যাসি ঢিল ছোড়া দূরত্বে। গান্ধিজীর মূর্তি রয়েছে সেখানে। এই সরস্বতী মূর্তিটি অপূর্ব।