৬০ বছরে শংকরের ‘চৌরঙ্গী’ : ১২৫টি সংস্করণের পরেও বিশ্বজুড়ে পাঠক চাহিদা তুঙ্গে

‘শাজাহান হোটেলের লাল আলোগুলো তখনও জ্বলছে, নিভছে।’ – মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ওরফে শংকর (Sankar) লিখিত ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের শেষটা হয়েছিল এভাবেই। ১৯৬২ সালের ১০ জুন, বাংলা সাহিত্যে প্রথম প্রকাশ ধ্রুপদী উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’-র। সময়টা এগিয়ে গিয়েছে ৬০ বছর, কিন্তু শাজাহান হোটেলের সেই আলো আজও নেভেনি। লেখক নিজেই একটি সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলেন, উল্লিখিত পংক্তিটি নাকি জীবনের কথা বলে। যে জীবনে স্থবিরতা নেই। আছে বহমানতা। আলোর এই নিভে গিয়ে আবার জ্বলে ওঠাই বুঝিয়ে দেয়, কিছু এখনও বাকি রয়ে গেছে। রয়ে গেছে বলেই ৬০ বছর পরে ‘চৌরঙ্গী’ আজও অজেয়। উপন্যাসের হীরক জয়ন্তীতে এসে দে’জ পাবলিকেশন থেকে প্রকাশ পেয়েছে ১২৫তম সংস্করণ। এই সংস্করণে লেখক নতুন করে ফিরে দেখেছেন তাঁর উপন্যাস এবং জীবনের নানা ওঠাপড়াকে। ভূমিকা অংশে ১৬ পাতা জুড়ে স্মৃতিচারণা করেছেন তিনি।
ঔপন্যাসিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (Moni Sankar Mukhopadhyay), পাঠকমহলে জনপ্রিয় শংকর নামে। ১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্ম হয় লেখকের। এরপর সপরিবারে চলে আসেন হাওড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি আক্রমণের ভয়ে পরিবারের সবাই বনগাঁ ফিরে গেলেও শংকর তাঁর বাবার সঙ্গে থেকে যান হাওড়াতেই। কিন্তু স্বাধীনতার বছরে পিতৃবিয়োগ হয় মণিশংকরের। সম্বলহীন কিশোর, জীবিকার প্রয়োজনে অফিসের কেরানির চাকরি থেকে গৃহ পরিচারকের কাজ এমনকি হকারিও করেছেন। এরপর তৎকালীন রিপন কলেজে পড়ার সময় তিনি কাজ করতেন হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে। তাঁকে নিয়েই লিখে ফেলেন আস্ত একটি উপন্যাস, ‘কত অজানারে’। সাহিত্য জগতে সেই প্রথম পা রাখা শংকরের।
এরপর লেখেন জীবনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’। ১৯৬২ সালে এটি প্রকাশের পর অভাবনীয় সাড়া ফেলে দেয় বই বাজারে। শংকরকেও পাঠক চিনতে শুরু করে তখন থেকেই। উপন্যাসটি এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার পাশাপাশি বিদেশি বিভিন্ন ভাষাতেও তা অনূদিত হতে থাকে। বিশিষ্ট লেখক অরুণাভ সিনহা উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ২০০৭ সালে সেটি ‘ভোডাফোন ক্রসওয়ার্ড বুক প্রাইজ’ জয় করে। এছাড়াও ২০১০ সালে উপন্যাসটি ‘ইন্ডিপেনডেন্ট ফরেন ফিকশন প্রাইজ’-ও পায়।
বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে ‘চৌরঙ্গী’ এক মাইলফলক। এ উপন্যাসের পুনঃমুদ্রণের হিসেব কষতে বসলে রীতিমতো চমকে যেতে হয় আমাদের। শুধু উপন্যাসটিই যে জনপ্রিয় তাই নয়, উপন্যাস অবলম্বনে পিনাকী ভূষণ মুখোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্র ‘চৌরঙ্গী’-ও সমান জনপ্রিয়তা লাভ করে। এমনকি ছবিটির জনপ্রিয়তার কথা ভেবে বর্তমান দর্শকদের জন্য সৃজিত মুখোপাধ্যায় নতুন করে নির্মাণ করেন ‘চৌরঙ্গী’ ছবিটি। নাম দেন ‘শাজাহান রিজেন্সি’। ১৯৫০-এর কলকাতার বদলে একালের কলকাতা উঠে আসে প্রেক্ষাপটে। চরিত্রগুলিকে একরকম রেখে, সমসাময়িক আর্থসামাজিক অবস্থানে এগোয় নতুন ছবির চিত্রনাট্য। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি একটি নাটক রচিত হয় ‘চৌরঙ্গী’ নিয়ে। ‘চৌরঙ্গী’ তো বটেই, পাশাপাশি শংকরকে আমরা মনে রাখব ‘জন অরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘স্থানীয় সংবাদ’-এর মতো কালজয়ী উপন্যাসগুলির জন্যও। ‘জন অরণ্য’ এবং ‘সীমাবদ্ধ’ অবলম্বনে ছবি নির্মাণ করেছেন সত্যজিৎ রায়।
‘চৌরঙ্গী’-র প্রেক্ষাপট ১৯৫০ সালের কলকাতা (Kolkata)। যেন লেখকের নিজের জীবনেরই একটি অধ্যায়ের গল্প। কাহিনির ওঠাপড়ার সঙ্গে মিলে গিয়েছে তাঁর বাস্তব জীবন। জীবন সংগ্রামে লেখক যখন ক্লান্ত, তখন হঠাৎ তাঁর জীবনে উদয় হন বায়রন সাহেব। সাহেবের অনুরোধেই অভিজাত হোটেল শাজাহানের রিসেপশনে চাকরি পান লেখক। এই হোটেলের চিফ রিসেপশনিস্ট ছিলেন স্যাটা বোস। ‘স্যাটা বোস’ (Sata Bose) চরিত্রটিকে ঘিরেই উপন্যাসের অবতারনা। উপন্যাসের এ চরিত্রটি যেন আমাদের প্রত্যেকের জীবনে আজও রয়ে গেছেন নিজস্ব ভঙ্গিমায়। পথপ্রদর্শকের মতো পাশে রয়েছেন তরুণদের। এক সাক্ষাৎকারে এই স্বপ্নের চরিত্র নিয়ে লেখক বলেন, “ইস্টার্ন রেলওয়েতে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর নাম ছিল সত্যসুন্দর বসু। আমি তখন ওখানে চাকরি করি। তিনি সাহেবদের সঙ্গে খুব মিশতেন। স্কাউটিং করতেন। স্মার্ট লোক ছিলেন। কায়দা করে ইংরেজি বলতেন। সব সময় বলতেন আমার নাম স্যাটা বোস। খুব পপ্যুলার ফিগার ছিলেন। আমি অবশ্য দূর থেকে দেখেছি। অতটা আলাপ ছিল না। আবার স্পেনসেস হোটেলে একজনকে পেয়েছিলাম, যিনি পরে গ্রেট ইস্টার্নে চলে যান। তাঁর মধ্যে একটা অভিভাবক সুলভ ব্যাপার ছিল। তাঁরও ধারণা ছিল ওঁকে ভিত্তি করে লিখেছি।”
চৌরঙ্গী উপন্যাস যেন বাস্তব কলকাতার ব্যস্ত রাজপথ চৌরঙ্গীর মতোই এক জায়গা, যেখানে এসে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে মানুষের হাসি, কান্না, ভালোবাসার আনন্দ আর হারানোর বেদনাময় গল্প। সমাজের লোভ, অপকর্ম ও লজ্জাজনক ব্যবহার এসবকে অতিক্রম করে উপন্যাসের কেন্দ্রে থেকেছে প্রেম। বইয়ের পাতার পাশাপাশি রুপোলি পর্দায় উত্তমকুমার (Uttam Kumar) , সুপ্রিয়াদেবী (Supriya Devi), অঞ্জনা ভৌমিক (Anjana Bhowmick) , শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের (Shubhendu Chattopadhyay) মতো তাবড় তাবড় অভিনেতাদের অভিনয়ে আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে ‘চৌরঙ্গী’। তাই, এখনও এ উপন্যাস নিজগুণেই ‘বেস্ট সেলার’ হয়ে যায়। এতবছর পরেও বইপাড়ায় চাহিদার পারদ একটুও পড়ে না তার। আর এই স্বীকৃতির আলো অচিরেই ম্লান করে দেয় ‘চৌরঙ্গী’ প্রসঙ্গে সেকালের নামজাদা লেখকদের নাক-উঁচু ঘেন্না, সমালোচনা এবং অভিযোগকে।
বইয়ের পাতার পাশাপাশি রুপোলি পর্দায় উত্তমকুমার, সুপ্রিয়াদেবী, অঞ্জনা ভৌমিক, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের মতো তাবড় তাবড় অভিনেতাদের অভিনয়ে আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে ‘চৌরঙ্গী’। তাই, এখনও এ উপন্যাস নিজগুণেই ‘বেস্ট সেলার’ হয়ে যায়।
চৌরঙ্গী চলচ্চিত্রের দৃশ্য
সাহিত্যজগতে এ এক বিরল দৃষ্টান্ত যেখানে কোনো উপন্যাসের ৬০ বছর বয়সেও সে তেজি ঘোড়ার মতো পাঠকদের আকর্ষণের বিষয়। উপরন্তু বাড়তি পাওনা উপন্যাস নিয়ে লেখকের স্মৃতিচারণা। নয়া সংস্করণে স্মৃতির পথ ধরে লেখক আরও একবার পাঠকদের নিয়ে গেলেন শাজাহান হোটেলের অন্দরে। ফিরে দেখালেন চৌরঙ্গীর আকাশে কালো মেঘ, নিওন আলোয় ভরা সেকালের গ্র্যান্ড হোটেল, স্পেনসেস এবং উইলসন-সহ আরও কত কী! নিমেষেই যেন রুপকথার মতো ধরা দিল সেকালের তিলোত্তমা। পাঠক খুঁজে পেল সেই ঝলমলে চৌরঙ্গীকে। অথচ লেখক রয়ে গেলেন ছাপোষাই। নিন্দুক, শত্রু, মিত্র সকলকে পেরিয়ে ‘চৌরঙ্গী’র ষাট বছরের পুরোনো প্রচ্ছদটুকু নিয়ে শাজাহান হোটেলের কোনো এক চিরন্তন পাহারাদারের মতো।
তথ্যসূত্র –
১। চৌরঙ্গী উপন্যাস, মণিশংকর মুখোপাধ্যায়
২। আনন্দবাজার পত্রিকা/ ‘জীবনটাই তো একটা চৌরঙ্গী’/ সাক্ষাৎকার গ্রাহক গৌতম ভট্টাচার্য
৩। একমাত্র লেখকই পারেন মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকতে, অমূল্য সাক্ষাৎকারে শঙ্কর, শর্মিলা শো হাউস ইউটিউব চ্যানেল
৪। বর্তমান পত্রিকা