অনাবিষ্কৃত পুরুলিয়াকে চেনাচ্ছেন অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় সৈকত

নিজের জেলা পুরুলিয়াকে একদম অন্যভাবে চেনাতে চেয়েছিলেন পেশায় ইঞ্জিনিয়ার সৈকত দত্ত। বন, পাহাড়, ঝরনায় ঘেরা শালরাজা-লালমাটির এই দেশের আনাচে-কানাচে মিশে বিস্ময়। অযোধ্যা পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তারা হঠাৎ বাঁক নেয় অপ্রত্যাশিত চড়াইতে, কখনো ঢুকে যায় শালবনে। রোমাঞ্চের সমস্ত উপাদান এইসব পথে মজুত। অথচ, শহর থেকে দলে-দলে ভিড় করা পর্যটকরা দিন দুয়েক পিকনিকের মেজাজে কাটিয়েই চিনে ফেলতে চান পুরুলিয়াকে। খুব বেশি হলে বসন্তে পলাশ দেখতে আসেন কেউ কেউ। অথচ, এভাবে পুরুলিয়ার মায়াবী নিসর্গের হৃদপিণ্ড ছোঁয়াই সম্ভব না। বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে এই প্রায় অনাবিষ্কৃত পুরুলিয়াকে জুড়ে দেওয়ার ইচ্ছেটা অনেকদিন ধরেই তাই ঘুরপাক খাচ্ছিল সৈকতের মাথায়।
বলা যেতে পারে, সেই ইচ্ছে থেকেই জন্ম ‘দ্য বেঙ্গল আলট্রা রানের’। পুরুলিয়ার পাহাড়ি পথে ৮০ কিমি দৌড়ের আসর। একদিনে। আলট্রা ম্যারাথন আর ট্রেল রানের যুগলবন্দি। সঙ্গে পাওনা পুরুলিয়ার অসামান্য নিসর্গ। দৌড়ের পথ জনবসতি ছাড়িয়ে ঢুকে যাবে বনে। বনের পর কখনো বা ছোটো গ্রাম। তারপরেই হয়তো পাখি পাহাড় ‘মুরা বুরু’কে পাশে রেখে দৌড় চলবে অযোধ্যার বুক ধরে। অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে পুরুলিয়ার আদিগন্ত ল্যান্ডস্কেপ। আকাশ লাল করে সূর্য অস্ত যাবে বনপাহাড়ের দেশে। সেই মরে আসা আলো, আকাশ জুড়ে বাসায় ফেরা পাখির ঝাঁক, কবেকার সব পাহাড়ে বোনা অলৌকিক দৃশ্য দেখতে দেখতে দীর্ঘ দৌড়ের সমস্ত ক্লান্তি মুছে যাবে দৌড়বিদদের। নিছক দৌড় নয়, এ আসলে প্রকৃতিকে নিজের মতো করে পাঠ করাও। সপ্তাহান্তে ঘুরতে আসায় এইভাবে চেনা সম্ভবই না পুরুলিয়াকে।
পর্যটনের পরিভাষায় একে বলে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম। পুরুলিয়ার ভূমিসন্তান সৈকত দত্ত বুঝতে পারছিলেন, শুধু এই রাজ্য বা দেশের মানুষদেরই নয়, এমনকি গোটা পৃথিবীকেও হাতছানি দেওয়ার মতো বিস্ময় বোনা আছে পুরুলিয়ার নিসর্গে-প্রকৃতিতে। অযোধ্যার বহু জায়গাতেই আজো হয়তো মানুষের পা-ই পড়েনি কোনোদিন। পর্যটকের ঢল কয়েকটা বিন্দু ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যায়। সেখানেই হোটেল, হুল্লোড়। তার বাইরে একটা বিরাট পুরুলিয়া অপেক্ষা করে থাকে মায়াবী সৌন্দর্য নিয়ে। তাকে চিনতেই এই আয়োজন। প্রচুর লটবহর না নিয়েই সোজা ঢুকে পড়া প্রকৃতির কোলে।
অথচ, এহেন পুরুলিয়াকে চেনাতে আলট্রা রানের মতো তুলনায় অপরিচিত অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসকে কেন বেছে নিলেন সৈকত? ছাত্রাবস্থায় অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস, ট্রেকিং ইত্যাদি সম্পর্কে নাকি তেমন কোনো ধারণাই ছিল না তাঁর। ২০১৩ সালে চাকরি করতে করতেই প্রথম দূরপাল্লার দৌড়ের সঙ্গে পরিচয়। তারপর, পেয়ে বসে দৌড়ের নেশা। একে একে ১০ কিমি, ২১ কিমির একাধিক হাফ ম্যারাথন, ম্যারাথন সম্পূর্ণ করেছেন সৈকত। শুরু করেছেন ট্রেকিং। ইতিমধ্যেই একদিন তাঁর চোখে পড়ে বিশ্বখ্যাত কিলিয়ান জরনেটের ট্রেল রানের ভিডিও। দৌড়তে দৌড়তেও যে খুব কম সময়ে পাহাড়ে চড়া যায়—তা জানতে পারেন সৈকত। নিঃসন্দেহে খুবই কষ্টকর এই ‘ট্রেল রান’। কিন্তু, এর আকর্ষণ এড়িয়ে যাওয়াও কঠিন। দৌড়ের কষ্ট আর প্রকৃতিকে আবিষ্কারের আনন্দ—দুইয়ের এমন মিশেল আর কোথাও নেই। ভূতটা সেই থেকেই মাথায় চেপে বসে। মনে হয়, এমন কিছু একটা যদি নিজের জেলা পুরুলিয়াতেও করা যেত! আলট্রা ম্যারাথনের সঙ্গে অযোধ্যার ট্রেককে জুড়ে দেওয়ার মতো কিছু।
পশ্চিমবঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের পরিধি এমনিতেই বেশ ছোটো। এমন ট্রেল রানের দৃষ্টান্তও নেই এই রাজ্যে। ফলে, গোটা পরিকল্পনাটাই খুব নতুন আর অভিনব ছিল শুরু থেকেই। সৈকত এরপর যোগাযোগ করেন অভিজ্ঞ ট্রেল রানার নীলেন্দু মুখার্জির সঙ্গে। রুট ঠিক করা, কোথায় কোথায় হাইড্রেশন পয়েন্ট থাকবে ইত্যাদি নানা বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছিলেন নীলেন্দু। সুদীপ ঘোষ, নিশান্ত মাহেশ্বরীর মতো কয়েকজনও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। সবটা মিলিয়ে ২০১৮-তে বেশ হইহই করেই নেমে গেল প্রথম ‘দ্য বেঙ্গল আলট্রা রান’। প্রতিযোগীদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় গ্রামবাসীরাও। পুলিশ-প্রশাসনও সাহায্য করেছিল সম্পূর্ণ মাত্রায়। অভিজ্ঞ ও নতুন দৌড়বিদদের কথা মাথায় রেখে দূরত্বকে তিনভাবে ভাগ করা হয়েছিল—১০ কিমি, ২৫ কিমি আর ৫০ কিমি। সেইসঙ্গে ছিল গ্রামের ভিতরেই ক্যাম্প, ছৌনাচের আসর। প্রথম বছরেই অপ্রত্যাশিত সাফল্য পেয়েছিল সৈকতের স্বপ্নের এই ইভেন্ট।
কিন্তু, স্বপ্নের পোকারা তো এত সহজেই শান্ত হয় না। পুরুলিয়াকে বিশ্ব মানচিত্রে স্থায়ী ঠাঁই দেওয়ার কাজের শুধু শুরুটাই হয়েছে প্রথমবারে। অতএব, চাকরি, ব্যস্ততার পরেও এই ইভেন্টকে আরো বড়ো করে তোলার চেষ্টা জারি থাকল। ঠিক হল, দ্বিতীয়বারের ইভেন্টে দৌড়ের দূরত্ব বেড়ে হবে যথাক্রমে ২৫ কিমি, ৫০ কিমি আর ৮০ কিমি। অযোধ্যা পাহাড়কে বের দিয়ে ঠিক হল রুট। আন্তর্জাতিক ট্রেল রান অ্যাসোসিয়েশনের স্বীকৃতিও মিলল। এবারের ইভেন্টের আসর বসবে ১৬ আর ১৭ ফেব্রুয়ারি। ১৫ তারিখ রাতে কলকাতা থেকে প্রতিযোগীদের নিয়ে যাওয়া হবে পুরুলিয়ার সোনকুপী বানজারা ক্যাম্পে। সেখানেই রাত্রিবাস। পরেরদিন ভোরবেলা থেকে শুরু হবে দৌড়। অযোধ্যার অপূর্ব পথ ধরে ট্রেল রান চলবে সন্ধে পর্যন্ত। দৌড়ের শেষে ক্যাম্পেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধামসা মাদল, গান। স্থানীয় তাঁতিদের হাতে বোনা গামছা আর পোড়ামাটির পদকও অপেক্ষা করে থাকবে প্রতিযোগীদের জন্য। নিছক দৌড় নয়, পুরুলয়ার হস্তশিল্প, নিসর্গ একাকার হয়ে যাবে এই দু’দিনের ইভেন্টে।
ঠিক এটাই চাইছিলেন সৈকত দত্ত। এই ট্রেল রানের মধ্যে দিয়ে পুরুলিয়ার প্রকৃতি, লোকাচারকে একদম অন্যভাবে উন্মুক্ত করে দিতে দেশ-বিদেশের নানা প্রতিযোগীদের কাছে। এই ইভেন্ট তো গৌরচন্দ্রিকা মাত্র। এর সূত্র ধরেই এরপর ভিন্ন স্বাদের পর্যটনের দরজাও খুলে যাবে এই জেলায়। সেইসঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গেও অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস, ট্রেল রান, আলট্রা রানের মতো শব্দগুলি ক্রমশ জনপ্রিয় হতে শুরু করবে। পুরুলিয়ার স্থানীয় দৌড়বিদরাও সুযোগ পাবেন এমন আন্তর্জাতিকমানের ইভেন্টে যোগ দিতে। সবটা মিলিয়ে, ‘দ্য বেঙ্গল আল্ট্রা রান’-এর আড়ালে থাকা স্বপ্নগুলো বহরে নেহাত ছোটো নয়।
স্বপ্নেরও যে অ্যাডভেঞ্চার হয়, সেটাই প্রমাণ করছেন সৈকত। দ্বিতীয় বছরেরর ‘দ্য বেঙ্গল আলট্রা রান’-এর ঢাকে কাঠি পড়তে আর মাত্র দু’দিন। শেষ শীত আর প্রাক বসন্তে নিজের সমস্ত সৌন্দর্যকে উপুড় করে অপেক্ষা করছে সুন্দরী পুরুলিয়াও।