সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই: একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া

সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পরিমণ্ডলে একটি পরিচিত নাম। আনন্দবাজার পত্রিকাতে তার ছোটো ছোটো ফিচারগুলি বহুদিন আগেই রসিক পাঠকের আগ্রহ জাগিয়েছে। সে আগ্রহ গভীরতর হয়েছে তাঁর রচিত উপন্যাস পাঠে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মহেঞ্জোদারো, দিনগুলি রাতগুলি, খেরোবাসনা, খাণ্ডবদাহন, ন্যানোপুরাণ এবং প্রবন্ধসংকলন হাম্বা ও বন্দরের সান্ধ্যভাষা।
এদের মধ্যে সবচেয়ে মনোগ্রাহী হল প্রথমটি যা সৈকতের ট্রেডমার্ক। ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের পাশাপাশি হাজির করে এক আশ্চর্য আবেগী মানবীয় চিত্রপট। মহেঞ্জোদারোতে কীসের পর্দা ফাঁস করলেন লেখক! কনুই অব্দি অলংকৃত নগ্নিকা নর্তকী আর গালপাট্টাশোভিত ‘পুরোহিত-রাজার’ কোনো কেচ্ছা নয়, বরং গণতন্ত্রের নামে ঢপবাজিতে আমাদের আন্তরিক আগ্রহের পর্দা ফাঁস -- এইরকম বলা যেতে পারে মহেঞ্জোদারো উপন্যাসটি সম্বন্ধে। পালটে যাওয়া ব্যক্তি ও ব্যষ্টির সম্পর্ক-সমীকরণ আর সেই পরিবর্তনকে বোঝার আন্তরিক প্রয়াসের ঝকঝকে আলেখ্য, উপন্যাস মহেঞ্জোদারো। প্রতিবেশীর পবিত্র গণতান্ত্রিক অধিকার যদি হয় অন্যের হেঁসেলে উঁকি মারার, তাহলে বন্ধুত্ব সে দেশে প্রবল ধান্দাবাজির নামান্তর না হয়েই পারেনা। বিপ্লব সেখানে ‘জঙ্গুলে লাম্পট্য’, নায়কের নাম স্বাভাবিক কারণেই বুনো। তার প্রবল চেষ্টা, অন্যকে নিয়ন্ত্রণের চরম লোলুপতাকে এক আপাত জটিল আয়াসসাধ্য মনঃস্তত্ত্বের বঁড়শিতে গেঁথে তোলার।
চমৎকার বৈপরীত্য অনায়াসে জাল ছড়াতে থাকে, তাকে সাথ দেয় তীব্র শ্লেষ আর হাস্যোজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ততা। বিনি সুতোর মালায় গাঁথার কাজটি করে বহু চেনা আপ্তবাক্য এবং জ্ঞাত, স্বল্পজ্ঞাত প্রবাদসম উদ্ধৃতি ও পংক্তির স্বচ্ছন্দ ব্যবহার। কর্পোরেট, অকর্পোরেট জনগণ সবার মাথা হাঁড়িকাঠে। খোদ ন্যারেটরের অবস্থা সবচেয়ে করুণ! ঠিক মহরমীয় কেতায় পাতলা ইস্পাতের হিসহিসে চুম্মা সারা শরীরে। ভাগ পায় ভ্যানিলা স্কিল সম্পন্নরা আর নিউটনীয় বজ্জাতির উত্তরাধিকারী মার্কেট রিসার্চ খ্যাত বিজ্ঞানীরা।
তবু পম্পেইয়ের লাভাস্রোতে ডুবতে ডুবতে মা যেমন সন্তানকে ধারণ করে উত্তোলিত দু’হাতে, ঠিক তেমনি মরিয়া অথচ মরমী ঢংঙে উঁকি দিয়ে যায় কিছু অনবদ্য মানবিক মুহূর্ত। আদ্যন্ত কাব্যিক! আর তারাই অমোঘ হয়ে থেকে
যায় শবের খোলা চোখের তারায়! যেমন তিন নম্বরী অলৌকিক ঘটনাটি। বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চলে রাজহংসী-গ্রীবা তুলে চিনির হেঁটে যাওয়া অথবা কংক্রিট জঙ্গলে থিরথির ডানা কাঁপানো প্রজাপতিটি!
তাই চিনির সিদ্ধান্ত বড় আকস্মিক ঠেকে। সিক্তবসনা জলপরীটির কী তাড়া ছিল সিদ্ধাইয়ের মুহূর্তেই এই বিচিত্র জগতের সব সোপান পেরিয়ে যাবার! অথবা হয়ত এটাই স্বাভাবিক। নিষ্ক্রিয়তাই যখন বীজমন্ত্র, তখন জীবনে চিনি কম পড়বেই। এই মহেঞ্জোদারোতে কার্য ও কারণ সম্পর্ক রহিত। শূণ্য বিশাল রঙ্গমঞ্চে পাঠকের গলা ধরে ঝুলে পড়ার জন্য পেত্নির মতো গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসে নিঃসঙ্গতা আর নির্দয় ঠেলায় এগিয়ে দেয় মৃত্যুর আরেকটু কাছে। এই মৃতের নগরীতে এর বেশী আর কিইবা চাওয়া যেতে পারে!
বিধিসম্মত সতর্কীকরণে খুব সঠিকভাবেই বলা হয়েছে এ কাহিনির সব ঘটনাই কাল্পনিক, কারণ আয়নার মধ্যে কোনও জ্যান্ত মানুষ থাকে না, আর জ্যান্তের শহরে বেঁচে থাকে শুধু প্রত্নতত্ত্ব। এই কল্পনা, এই বাস্তব বিচ্যুতিকে লেখক যে ভাষায় প্রকাশ করেন তার দু-একটি উদাহরণ দিলে বিষয় এবং স্টাইলের অসম্ভব বৈপরীত্যকে পুরোপুরি বোঝা যাবে। লেখক বিনুনি বাঁধার মতো খিল্লি ভাষা ও গম্ভীর বিষয়- এই দুই বিপরীতকে একত্রে গাঁথেন অনায়াস শৈলীতে! এবং এই বৈপরীত্য কখনোই পাঠকের বোধগম্যতার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় না - ‘সময়টাই ভুলভাল। স্বাধীনতা সংগ্রাম, হাংরি, ভিয়েতনাম, নকশালবাড়ি , পথের পাঁচালি, বার্লিন ওয়াল, তিয়েন-আন-মেন স্কোয়ার, এমনকী ইন্টারনেট অবধি সব শেষ। এখন শুধু খুঁটে খাওয়া। পেডিগ্রি ছাড়া আর কিছু হবার নেই। আমি সেখানেও গোল্লা। থাকি কেষ্টপুরে। ফিল্ম ইনস্টিটিউটের গন্ডি মাড়াইনি, জেএনইউ চোখে দেখিনি, ইপিডব্ল্যু আমার কোনও প্রবন্ধ ছাপেনি। বন্ধুবান্ধবরাই পাত্তা দেয় না তো বাইরের লোক। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একবার এক ট্যাক্সিতে উঠেছিলাম। আর পাঁচবছর বয়সে একবার জ্যাোতি বসুর কোলে উঠে ছবি তুলেছিলাম। পেডিগ্রি বলতে এই। কিন্তু সে ছবির নিচেও লিখে না দিলে আমাকে আমি বলে চেনা যাবে না।’ (মহেঞ্জোদারো)
কী মন্ত্রবলে লেখক এই অসাধ্য সাধন করেন সে মন্ত্রগুপ্তি ওঁর একারই জানা। হয়তো বিরল আর কারোরও।
হাম্বা একেবারেই বিশুদ্ধ শ্লেষাত্মক লেখা, বিদ্রূপ-বারুদে বোঝাই একটি কামান-গোলার মতো এর অভিঘাত। গড় বাঙালি পাঠক আবেগের নাগরদোলায় উঠতে নামতে ভালোবাসেন, বিদ্রূপ বুঝতে মগজাস্ত্রের ব্যবহার সাধারণভাবে তার না-পসন্দ। সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষা এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। এমন সহজ ভাবে অবলীলায় বিরোধাভাসের দিকে আঙুল তোলেন তিনি, মিঠে হেসে আচমকা চাবুক চালান, নিজের পিঠে পড়ল কিনা বোঝার আগেই পাঠক হাসতে থাকেন-- যাকে কেউ পাত্তা দেয়না, সেইই ল্যালা। সংখ্যাগরিষ্ঠের রিয়েলিটি আছে, এক্সপ্রেশন নেই। যন্ত্রণা আছে, কণ্ঠস্বর নেই। রিসোর্স নেই, টাকাপয়সা নেই। তত্ত্ব নেই, প্রতিষ্ঠান নেই। এই সবকে এড্রেস করবে ল্যালা ম্যানিফেস্টো। খিল্লিই এযুগের পলিটিক্সের ভাষা। অতএব খিল্লি। নিজেকে প্রকাশ করার চাবিকাঠি।
ল্যাল্যা কথাটি আজকাল আন্তর্জালে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে। এই কয়েনেজ কার তা সঠিক না জেনেই অনেকেই প্রতিষ্ঠানবিরোধী, ইংরেজি-না-জানা, এমনকি সহজ সরল গোবেচারা অর্থেও এই শব্দটি ব্যবহার করছেন। সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অব্যর্থ শব্দসন্ধানের অন্যতম উদাহরণ এটি।
সৈকতের নবতম উপন্যাস দিনগুলি রাতগুলি নিয়ে রবিশংকর বলের উক্তি প্রথমেই মনে পড়ে-- দিনগুলি রাতগুলির চোরা স্রোত আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। কোথায় ? সেই হদিশ জানা থাকলে এ লেখা তো আর উপন্যাস হতো না। মিথ্যার চেয়েও সত্যের বড় বিপজ্জনক শত্রু আত্মবিশ্বাস। সৈকতের উপন্যাস এই আত্মবিশ্বাসের প্রতিস্পর্ধী সত্যের হিরণ্ময় মুখ।
একটি কলেজ ক্যাম্পাসে সহপাঠীর আকস্মিক মৃত্যু দিয়ে যে কথকতার শুরু সে আমাদের নিয়ে যায় বুদ্ধির অগম্য এক বোধে! একটি স্মরণ সভায় স্বপ্ন ও বাস্তব গোলানো এই বোধ শেষ হতে পারেনা, হয়ও না। তাই অন্যকে স্মরণ করতে গিয়ে প্রত্যেকেই কেঁদে নেয় নিজস্ব দুঃখভারে। রবিশংকর বলের কথা মনে পড়ে যায় আবার, --এইরকম এক স্পেস-কে (‘স্থান’ শব্দে কিছুই বোঝায় না; ‘শূন্যতা’ তবু মেনে নেওয়া যায়) মায়াবী না বলে লাভ্ক্রাফট্ বা নীল গাইম্যানের স্পেস বলা যেতে পারে। এখানে কী না ঘটে; সব পরিচয় ওলোটপালোট হয়ে যায়; পূর্বজন্মের স্মৃতির মতো লোকজন হামেশাই গুলিয়ে যায়, চেনা চেনা লাগে, পরের মুহূর্তেই অচেনা, নিশিডাকের মতো ছড়িয়ে যায় গানের পর গান। এখানে স্মরণসভায় কারোর মৃত্যু উপলক্ষে সবাই নিজের কান্না কাঁদতে থাকে। ওই যে শ্বেতায়েভা বলেছিলেন, সবাই একটি সমাধিক্ষেত্রে শুয়ে থাকে- যা আমাদের ভিতরে। একটি উপন্যাস, এই নশ্বর, সেজানীয় স্টিললাইফ ছাড়া আর কীই বা দিতে পারে আমাদের? আমরা দণ্ডিত হয়ে জীবনের শোভা দেখে যাই, চারিদিকে মহাপুরুষের উক্তি কোলাহল করে।
তবে সৈকত ভালো ঔপন্যাসিক, না কি মন্দ সে ব্যাপারে ব্যক্তিগত হওয়ায় আমার সায় আছে। যতই নৈর্ব্যক্তিক হোক লেখা, ভালো অথবা মন্দের আভাস কী করে যেন তার গায়ে লেপ্টে থাকেই। বুদ্ধিদীপ্ত, ভাষার অনন্যতায় উজ্জ্বল মানবিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে এই নামটি এখন বাংলাসাহিত্যে ওপরের দিকে এই কথাটি স্পষ্ট। প্রবাস ও জীবিকা তার সৃষ্টিশীলতাকে কিছুমাত্র হলেও ক্ষুণ্ণ করছে কিনা তা সম্পূর্ণ অন্য ও অবান্তর প্রসঙ্গ। কিন্তু সময় এসে গেছে যে চিহ্নগুলি দিয়ে পাঠক এই ঔপন্যাসিককে শনাক্ত করে তার বাইরে গিয়ে আরো নতুন বিস্ফোরণ ঘটাবার।
পাঠক প্রতীক্ষু।