বড়িশার সাবর্ণদের ইতিহাস উৎসবের আকর্ষণ ‘সংগীতশিল্পী’ উত্তমকুমার

বাঙালির ‘ম্যাটিনি আইডল’ তিনি। তাঁকে নিয়ে চর্চায় ছেদ পড়েনি আজও। অথচ, অনেকে আজও তাঁর একটি পরিচিতির সঙ্গে অবগত নন। অনেকেই জানেন না ‘কাল তুমি আলেয়া’, ‘বনপলাশির পদাবলী’ ছবির সংগীত পরিচালনা করেছিলেন স্বয়ং উত্তম! গানের রেকর্ডও রয়েছে তাঁর। নিয়ম করে রেওয়াজ করতেন। বাঙালির ‘মহানায়ক’-এর এই দিকটি তুলে ধরে, তাঁকে বিশেষ সম্মান জানাচ্ছে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ। তাঁদের ১৭তম আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবের এ বারের মূল আকর্ষণ ‘উত্তমকুমার-প্রদর্শনী’।
বড়িশায় সাবর্ণদের বড়ো বাড়ির সংগ্রহশালায় প্রতি বছরই এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। গতবছর অর্থাৎ, ষোড়শ আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবের থিম ছিল ‘সিন্ধু সভ্যতা’ এবং ‘থিম কান্ট্রি’ হিসেবে ছিল দু’টি দেশ—ফ্রান্স ও শ্রীলঙ্কা। সিন্ধু সভ্যতাকে সামনে রেখে স্মরণ করা হয়েছিল বিশ্ববন্দিত বাঙালি ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আর সপ্তদশ ইতিহাস উৎসবে প্রায় এক বছর ধরে উত্তমকুমারের হাতে তৈরি শিল্পী সংসদকে সঙ্গী করে এই প্রদর্শনী আয়োজনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায়চৌধুরী।
উত্তম ছাড়াও ঋষি অরবিন্দ ও গায়ক বিমল মুখোপাধ্যায়কে নিয়েও রেট্রোস্পেক্টিভের আয়োজন করা হচ্ছে ওই সংগ্রহশালায়। আন্তর্জাতিক বিষয়ে তাঁদের থিম দেশ কেনিয়া। সেখানকার সরকারের সহায়তায় হরেক জিনিস হাজির করা হবে। কিন্তু প্রদর্শনীর সিংহভাগ জুড়ে থাকবেন উত্তমই। শিল্পী সংসদের উদ্যোগে এই প্রদর্শনীতে হাজির করা হচ্ছে উত্তমকুমারের রেওয়াজ করার হারমোনিয়াম থেকে শুরু করে তাঁর অ্যাশট্রে, লাইটার, কাপ, কাপলিং, কোর্ট-ব্রাশ, টাই ইত্যাদি। পাশাপাশি, উত্তম অভিনীত কিংবদন্তী ছায়াছবি অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, জতুগৃহ, নায়িকা সংবাদ, কুহকের চিত্রনাট্যের আসল পাণ্ডুলিপিও থাকবে এই প্রদর্শনীতে। থাকবে তাঁকে নিয়ে লেখা অসংখ্য বই ও তাঁর অটোগ্রাফ। উত্তম অভিনীত ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, ‘ঝিন্দের বন্দি’, ‘সন্নাসী রাজা’-র মতো সিনেমার বিরল পোস্টার। সিনেমায় উত্তমকুমার নামে জনপ্রিয়তা পাওয়ার আগে মহানায়ক অরূপকুমার এবং অরুণকুমার নামেও অভিনয় করেছিলেন।
সে সব প্রমাণও থাকবে উত্তমের প্রদর্শনীতে। থাকবে উত্তমকুমারকে নিয়ে তৈরি স্ট্যাম্প, ম্যাক্সকার্ড। নিজের ছবি ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ও ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবির সংগীত পরিচালনা করেছিলেন উত্তম। সেই কাজে তাঁকে কারা সাহায্য করেছিলেন, কী ভাবে হয়েছিল সেই রেকর্ডিং, সে সব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ থাকছে প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনী চলবে ৫-৮ ফেব্রুয়ারি, সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।
এ ছাড়াও উত্তমকুমারের এই প্রদর্শনীকে প্রাণবন্ত করে তুলতে বাজানো হবে তাঁর সিনেমার গান। নিজেদের এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে দেবর্ষি বলেন, ‘‘প্রতি বছর আমরা এ ধরনে প্রদর্শনীর আয়োজন করি। তাতে এক বছর ধরে গবেষণামূলক কাজকর্ম করেই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এ বার আমরা নানা বিষয়ের সঙ্গে উত্তমবাবুকে নিয়েও অনেক পরিশ্রম করে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘শিল্পী সংসদ না থাকলে আমাদের এই উদ্যোগ সফল হত না। শিল্পী সংসদের বৈঠকের মিনিট্সেও উত্তমবাবুর উপস্থিতির কথা আমরা জেনেছিলাম। তাঁদের অনুমতিক্রমে আমরা সেই মিনিটস্টিও প্রদর্শনীতে হাজির করব।’’
তাই, পরিশেষে এ কথা বলাই যায় যে বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাবর্ণদের এই ইতিহাস উৎসব প্রতিবারের মতো এবারও ইতিহাসপ্রেমীদের সমৃদ্ধ করবে।