‘দোহাই আলি!’ ৬০ বছর পরেও ঋত্বিকের দেশ কাঁদছে

গ্রামের নাম হিঙ্গলগঞ্জ। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কালিন্দী। নদীর ওপারে বাংলাদেশ। নামটা অনেক পরে জেনেছি, বসন্তপুর। একটি নদীর ওপারে আরেকটি গ্রাম থাকতে পারে; আস্ত একটি দেশ থাকতে পারে, তা আমার কল্পনাকে ছুঁতে পারেনি। বিসর্জনের বিকেলে ওপার থেকে যারা আসে এপারে, তাদের তো ভিনদেশী মনে হয় না। একইরকম পোশাক, একইরকম ভাষা, একইরকম আনন্দ চোখে-মুখে। তবু ওপারটা বিদেশ, বিনা পাসপোর্টে যাওয়া যায় না ওদেশে। বিষয়টা পরে জেনেছি, ইতিহাস বইয়ে, ভূগোল যাকে অস্বীকার করতে চেয়েছে বারবার।
২০১৩। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগ। প্রিয় সঞ্জয়দা (অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়) পড়াচ্ছেন ঋত্বিক ঘটকের ছবি। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’। আগেও দেখেছি কয়েকবার। অনেককিছু না বুঝেও চোখের কোন দিয়ে জল গড়িয়েছে। কিন্তু এবার যেন শুধু দেখা নয়। আবিষ্কার। চেনা দৃশ্যপট দিয়ে যে এমন দমবন্ধ করা ইতিহাসকে আঁকা সম্ভব, সেই রোমঞ্চকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) এবছর ষাটে পা দিল, তবু বুড়ো হল না। ইতিহাস তো বহমান, তার বার্ধক্য আসে না। ইতিহাসের আবর্তে যখন অতীত এসে বর্তমানে ধরা দেয়, কিংবা বর্তমান অতীতের প্রতিফলক হয়ে ওঠে তখনই তো কালজয়ী শিল্পের কাছে মাথা নোয়াতে হয়।
আরও পড়ুন: ঋত্বিক ঘটকের ‘ভীষণ হাসির, জমজমাট কমেডি’ ছবি
‘কোমল গান্ধার’ (A Sweet Note on a Sharp Scale) নামটি ঋত্বিক চয়ন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থ থেকেঃ “নাম রেখেছি কোমল গান্ধার/ মনে মনে”। কোমল গান্ধার একটি রাগের নাম। রাগ কাফি ঠাটের অন্তর্গত দেবগান্ধার রাগের অবরোহণে গাওয়া হয় এই রাগ। তাত্ত্বিকভাবে কোমল গান্ধার ছবিটি প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বগুলিকে বর্জন করে সমস্ত অবরোহী তত্ত্বের সুসংবদ্ধ এক বিন্যাস। ঋত্বিকের ভাষায়- “কোনও পূর্ব নির্ধারিত তত্ত্বের আক্ষরিক অনুসরণ সৃষ্টিশীলতার পক্ষে বিশেষ অনুকূল নয়।”
তাই কোমল গান্ধারে কোনও চিত্তাকর্ষক গল্প খোঁজার পরিবর্তে কতগুলি দৃশ্যপট, কতগুলি আর্কিটাইপ্যাল ইমেজ বা প্রতীক এবং কতগুলি সুরের সন্ধানই দর্শককে কৃতার্থ করতে পারে। মহাকাব্যিক এই ছবির পরতে পরতে খুঁজে পাওয়া যায় সময়ের ছাপ, বোবা ইতিহাসের সপাট চাবুক।
ছবির শুরু ও শেষে আমরা শুনতে পাই গ্রামীন, পুরোনো বিবাহের গান। বিবাহ মিলন, একই সঙ্গে বিচ্ছেদও। ঠিক যেন ছবির মাঝে বাফার শটে দেখতে পাওয়া পরিত্যক্ত ট্রেনলাইনটির মতো; ছবির নায়ক ভৃগুর ভাষায় যা ছিল একসময় ‘যোগচিহ্ন’, এবং যেটি এখন ‘বিয়োগচিহ্ন’। দ্বিধাবিভক্ত বাংলাদেশ, বাংলার দ্বিধাবিভক্ত নাট্য-আন্দোলন এবং শকুন্তলা (চরিত্রঃ অনসূয়া)-র দ্বিধাবিভক্ত মনে ত্রিকোণ কাঠামোয় ধরা পড়া রাজনীতি, টানাপোড়েনের ইতিহাস এ ছবির ষাট বছরে পা দেওয়ার মুহূর্তেও বারবার মনে করায় কিছুই যেন এগোয়নি, একই রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে আমরা যেন ঘুরে চলেছি। সত্যি! কী হয়ে গেল এ দেশটার।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি অসহায় বোধ হয় যখন ঋত্বিকের একই ধারার অন্য একটি ছবির (মেঘে ঢাকা তারা) দৃশ্যকে ফ্যাসিস্টরা এক বর্বর চক্রান্তের প্রোপাগান্ডা হিসাবে ব্যবহার করতে দু’বার ভাবে না। যে শিকড় হারানোর যন্ত্রণাকে ঋত্বিক বারবার প্রকাশ করতে চেয়েছেন তাঁর শিল্প-মাধ্যমে, সেই শিল্পকেই যখন যন্ত্রণার বিপরীতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করা হয়, তখন শুধুমাত্র সেই শিল্প-শিল্পী-শিল্পপ্রেমীদেরই অপমান করা হয় না, জাতীয় সংস্কৃতির উপর তা সবচেয়ে বড়ো আঘাত। এ লজ্জা বাঙালি হিসাবে, ভারতবাসী হিসাবে আমাদের সবার। দোহাই আলি!
কোমল গান্ধারের চরিত্ররা কেউই সেই অর্থে প্রকৃতস্থ নয়। কেউ দ্বিধাগ্রস্ত, কেউ অবদমিত, অবহেলিত, কেউ বিকারগ্রস্ত, আবার কেউ বা সুযোগসন্ধানী এবং বিভাজনকামী। একটি অস্থির সময়ের স্নায়ুকে অনুভব করা যায় তাদের সংলাপে, চিত্রণে। গণসংগীত এবং রবীন্দ্রসংগীতের যুগল বাহন বোধহয় একমাত্র ঋত্বিকই। “ক্ষুদিরাম থেকে রবীন্দ্রনাথ”- একটি জাতির শিরদাঁড়াকে উন্নীত দেখার যে আকুতির প্রকাশ এ ছবিতে, তা তো বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শূন্যতারই প্রতিচ্ছবি।
ছিন্নমূল এবং প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের যন্ত্রণা ও অধিকারের কথাই বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে ঋত্বিকের ছবিতে। সাতচল্লিশের দাঙ্গায় সন্তানহারা নাটুর মা তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে ভৃগুদের কাছে, যাতে তার মৃত ছেলে বেঁচে ওঠে সারা দেশের হৃদয়ে। মাতৃহারা ভৃগুও তার কৌলিন্যের চৌকাঠ পেরিয়ে শূদ্র মায়ের পায়ের ধুলো নিতে পারে অনায়াসে। যে বর্বরতার সন্ধিক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে, সেখানে রোহিত ভেমুলা, তাবরেজ আনসারির মায়েরা কার কাছে এসে দাঁড়াবে? সত্যিই আমরা আজ দিশাহীন। আমাদের আকাশটাতেও আজ শুধু ধোঁয়া। হে রাম!
“ফিল্মের প্রেমে আমি পড়িনি মশাই! আমি মানুষের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে চাই। কাল যদি এর চেয়ে বেটার মিডিয়াম পাই, সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাব।’’ - যিনি একথা বলতে পারেন, তিনি অবশ্যই শিল্প-মাধ্যমকে প্রতিবাদের ভাষা করে তুলতে চেয়েছিলেন। আমাদের ব্যর্থতা, সেই ভাষা আমরা পড়ে উঠতে পারিনি। যে যুগ-পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল একদা, তা সঞ্চারিত হতে পারেনি সমগ্র জনমানসে। তাই সেইসব মহান সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়ন আজও বাকি থেকে গেছে। কোমল গান্ধার-এর ষাট বছরে তাই আবার ফিরে দেখা যাক কীভাবে মিরান্দাকে ছাপিয়ে যায় শকুন্তলা, কীভাবে অবদমনকে অতিক্রম করে মিছিল, কীভাবে কোমলতার বুক চিরে উৎসারিত হয় বজ্র-কঠিন শপথ।