No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    রবীন্দ্রনাথ ও অতুলপ্রসাদের সম্পর্ক

    রবীন্দ্রনাথ ও অতুলপ্রসাদের সম্পর্ক

    Story image

    নূপুরছন্দা ঘোষ
    রবীন্দ্রনাথ ও অতুলপ্রসাদের সম্পর্ক ছিল বড় মধুর। রবীন্দ্রনাথ ও অতুলপ্রসাদের এই মধুর সম্পর্কের শুরুর কথা বলতে গেলে বলতে হয় তাঁদের পরিচয় হয় ১৮৯৫-৯৬ সালে যখন অতুলপ্রসাদ ব্যারিস্টার হয়ে বিলেত থেকে ফিরে কলকাতায় এলেন সেই সময়ে। তখন অতুলপ্রাসাদের বয়স মাত্র ২১ বছর। সরলাদেবী পরিচয় করিয়ে দেন অতুলপ্রসাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের। খামখেয়ালী’র আসরে প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হয়েছিলেন অতুলপ্রসাদ রবীন্দ্রনাথের প্রতি। অমন অনিন্দ্যসুন্দর স্নিগ্ধকান্তি দিব্যরূপ দেখে তিনি বিমোহিত হয়েছিলেন। সেই আসরে রবীন্দ্রনাথের গান শুনে মুগ্ধ অতুলপ্রসাদ। সেখানে অতুলপ্রসাদেরই এক বন্ধু কবিগুরুকে জানান যে, অতুলপ্রসাদ গান রচনা যেমন করেন আবার সুগায়কও বটে। এরপর রবীঠাকুরের অনুরোধে লজ্জায় অবনত হয়ে একটি স্বরচিত গান শোনান। এরপর সেই আলাপ গভীর স্নেহের বন্ধনে পরিণত হয়।

    রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে ১৮৯৬ সালে ‘খামখেয়ালী’ নামে একটি সাহিত্য ও সঙ্গীতসভা স্থাপিত হয়। অতুলপ্রসাদ এরপর এই খামখেয়ালী ক্লাবের সদস্য হন। তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। অন্যান্য সদস্য পদে ছিলেন জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, মহারাজা জগদীন্দ্র নারায়ণ রায়, লোকেন পালিত, রাধিকামোহন গোস্বামী প্রমুখ। এই সভার বাঁধাধরা কোনও নিয়ম ছিল না। সাহিত্য, সঙ্গীত, হাস্যরস ইত্যাদির দ্বারা সভ্যদের আনন্দ পরিবেশন করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অতুলপ্রসাদের অন্তরঙ্গতা ও ঘনিষ্ঠতা গাঢ় হয় ক্রমে ক্রমে। তিনি এইসময় বেশ কিছু অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছিলেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ীর এককোণে। কবিগুরু অতুলপ্রসাদকে দ্বিপ্রহরে আসবার জন্য অনুরোধ করতেন এবং সেখানে বসত অন্তরঙ্গ চায়ের আসর। ছোট্ট একখানি ঘরে বাতায়নের ফাঁক দিয়ে বর্ষার মেঘের রূপের ছটা দেখে মুগ্ধ হতেন রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ ও কবিবন্ধু লোকেন পালিত। তিনজনের বৈঠকে চলত সাহিত্য চর্চা। অতুলপ্রসাদের বয়স তখন কম, তরুণ হৃদয় মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতেন ও উপভোগ করতেন মধুর কবিসঙ্গ।

    রবীন্দ্রনাথের উপর অতুলপ্রাসাদের ছিল অপরিসীম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। রবীন্দ্রনাথের ডাকে সর্বদাই সাড়া দিয়েছেন অতুলপ্রাসাদ। প্রবাসী বাঙালীদের একটি মিলন ক্ষেত্র যেখানে সকলে সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ভাবের আদান প্রদান করতে পারেন এই প্রয়াসে একটি সংস্থা গঠন হয় এবং তারই প্রথম অধিবেশন বসে সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজ কাশী নরেশ নামাঙ্কিত প্রাঙ্গণে, ১৯২৩ সালে কাশীতে, নাম হয় ‘উত্তর ভারতীয় বঙ্গীয় সাহিত্য সন্মেলন’। এই অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে অতুলপ্রসাদ কর্মক্ষেত্র লখনৌ থেকে ছুটে এলেন এবং বাঙালির হৃদয় জুড়ানো জাতির উদ্‌বোধনের বীজমন্ত্র প্রথম গাইলেন,

    মোদের গরব মোদের আশা
    -আ মরি বাংলা ভাষা।।

    রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেলেন (১৯১৩) সেই আনন্দ অতুলপ্রসাদকে এমনই অভিভূত করল তিনি সেই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নিজে রচনা করলেন “মোদের গরব মোদের আশা”। কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে উত্তর ভারতীয় বঙ্গ সাহিত্য সন্মেলনে গাইলেন,

    বাজিয়ে রবি তোমার বীণে
    আনল মালা জগতজিনে
    তোমার চরণ তীর্থে আজি
    জগত করে যাওয়া আসা।।

    ১৯২৩ সালে কবিগুরু লখনৌ আসবেন। তাঁকে স্টেশন থেকে সংবর্ধনা জানিয়ে শহরে আনতে অতুলপ্রসাদ রচনা করলেন,

    এসো হে এসো হে ভারত ভূষণ
    মোদের প্রবাস ভবনে
    আমরা বাঙালী মিলিয়াছি আজি
    পূজিত ভারত রতনে।।

    কবিগুরু লখনৌ পৌঁছে দেখলেন স্টেশন জনারণ্য। পুষ্পবৃষ্টি, সানাই বাদন, গান, বাজনা, জয়ধ্বনিতে লখনৌর আকাশ বাতাস মুখরিত। রবীন্দ্রনাথ পুলকিত, বিস্মিত। অতুলপ্রসাদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলেন কবি।

    রবীন্দ্রনাথ ও অতুলপ্রসাদের যোগাযোগ সবসময় ছিল। মাঝে মাঝেই রবীন্দ্রনাথ লখনৌ আসতেন আবার অতুলপ্রসাদও কাজের ফাঁকে শান্তিনিকেতনে কবির কাছে কয়েকটি দিন কাটিয়ে আসার জন্য ব্যকুল হতেন। প্রতি বছর রবীন্দ্রনাথের কোন নিষেধাজ্ঞা না শুনে গ্রীষ্মের প্রথমেই কবির মনোমত লখনৌর সুপ্রসিদ্ধ সফেদা দশেরী আম ঝুড়ি ভরে পাঠিয়ে দিতেন শান্তিনিকেতনে।

    অতুলপ্রসাদের যেমন প্রবল শ্রদ্ধা ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রতি কবিগুরুর তেমনি স্নেহের ফল্গুধারা ছিল অতুলপ্রসাদের প্রতি। কবি তাঁর ‘পরিশোধ’ কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেন স্নেহের পাত্র অতুলপ্রসাদকে।

    রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির কবি। তিনি দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন। একবার হিমালয় থেকে ফেরার পথে রবীন্দ্রনাথ রামগড় পাহাড়ে এসে কিছুদিন রইলেন এবং সেই সময় অতুলপ্রসাদকে লিখলেন ” গ্রীষ্মের আতিশয্যে সকলেই মেঘের জন্য লালায়িত। আমি ভাবিতেছি অতুল কবে আসিয়া আমাদিগকে স্নিগ্ধ করিবেন।” অতুলপ্রসাদ কবিসঙ্গ সুখের স্বপ্নে বিভোর হয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন রামগড়ে। কবি স্বয়ং তাঁকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন অতুলপ্রসাদ আনন্দে আত্মহারা। সেখানে ত্রিবেণী সঙ্গমে অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ ও দিনেন্দ্রনাথ একত্রিত হওয়ায় এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল তা ‘রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃস্মৃতি’ থেকে পাই।

     – “বাবা প্রতিদিন নতুন গান রচনা করতে লাগলেন আর আমরা বাগানের এক প্রান্তে গুহার সামনে আখরোট গাছ তলায় বসে সেই গান শুনতে লাগলুম। বাবা ঘরের বাইরে উন্মুক্ত আকাশের নীচে বসে গাইতেন, তাঁর গানে গাছপালা পাহাড় যেন কেঁপে উঠত। অতুলপ্রসাদের গলা ছিল যেমন মিষ্টি, গাইবার ধরনও ভারী সুন্দর। সবচেয়ে ভালো লাগতো তিনি যে আন্তরিকতার সঙ্গে ভাবে বিভোর হয়ে গান করতেন।”

    রামগড়ে থাকাকালীন আর এক অবিস্মরণীয় ঘটনা অতুলপ্রসাদ স্বচক্ষে দেখেছিলেন। এক স্বর্গীয় দৃশ্য যেখানে রবীন্দ্রনাথ সূর্য্যোদয়ের আগেই ঘর ছেড়ে প্রকৃতির মধ্যে গিয়ে রচনা করতেন প্রতিদিন নতুন নতুন সঙ্গীত। কবি ভোরের আকাশে আলো ফোটার আগেই ঘর ছেড়ে বাইরে একটি বিরাট শিলার উপর গিয়ে বসলেন। তাঁর সম্মুখে অনন্ত দিগন্তব্যাপী হিমালয়ের তুঙ্গ গিরিশ্রেণী। তাঁর প্রশান্ত স্নিগ্ধ মুখমণ্ডল সূর্যের মৃদু আভায় উজ্জ্বল অথচ শান্ত ধ্যানরত, বিমোহিত। হঠাৎই গুন গুন করে গেয়ে ওঠেন –“এই লোভিনু সঙ্গ তব সুন্দর হে সুন্দর”।

    অতুলপ্রসাদও ঐ ভোরে কবিকে একলা বেরিয়ে আসতে দেখে চুপিচুপি তাঁর পিছু এসে কবিকে তো প্রাণভরে দেখলেনই। উপরন্তু গানটির সদ্যরচনা ও সুরবিন্যাস শুনে মুগ্ধ হলেন। এমনই করে ২-৩ দিন এই লুকোচুরী খেলা খেলতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলেন। এবং স্বীকার করলেন তাঁর সদ্য রচিত “এই লোভিনু সঙ্গ তব” গানটির রচনা তিনি শুনেছেন লুকিয়ে। কবি প্রত্যুত্তরে স্নেহের শাসনে বললেন “তুমি তো ভারী দুষ্টু, এইরকম রোজ শুনতে বুঝি?” সকলেই ভারী মজা পেয়েছিল সেই ঘটনায়। অতুলপ্রসাদ ছিলেন রবীন্দ্রভক্ত, তাঁর মনে কবিগুরু সম্পর্কে ছিল গভীর শ্রদ্ধা। একটি চিঠির উদ্ধৃতি দিলে অতুলপ্রসাদের মনে যে রবীন্দ্রনাথের স্থান কত উঁচুতে ছিল তার প্রমাণ পাই।

    পরম শ্রদ্ধাস্পদেষু,
    বাসনা ছিল যে কাহাকেও না জানাইয়া হঠাৎ আপনার জন্মদিনের মহোৎসবে উপস্থিত হইয়া আপনার চরণে মাথা ছোঁইয়াইব। কিন্তু কর্মের শৃঙ্খলে এমন আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছি য যাইতে পারিলাম না। আমি জানি আজ আপনার উপর অজস্র পত্রবৃষ্টি হইতেছে, তবে ইহাও জানি যে আপনি আমার ধৃষ্টতা মাপ করিবেন, কেন না, এক সময়ে আমি আপনার স্নেহের ও অনুগ্রহের পাত্র ছিলাম। আমি আপনাকে ভক্তিভরে প্রণাম করিতেছি। বঙ্গ ও সাহিত্য তীর্থের সর্ব্বপ্রধান পুরোহিত ও ধর্মসিদ্ধ ও অগ্রণী সংগীতকুঞ্জের মাধব বাংলার দুলাল এবং আমার পরম ভক্তিভাজনের চরণে আজ প্রণত হইতেছি। কায়মনবাক্যে আমি ভগবানের নিকট প্রার্থনা করি আপনি দীর্ঘায়ু হয়ে দেশের ধর্ম, স্বদেশানুরাগ, সাহিত্য ও সৌজন্যের নেতৃত্বপদে অধিষ্ঠিত থাকুন।

    কৃপাকাঙ্খী অতুলপ্রসাদ সেন

    রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে যদি অতুলপ্রসাদের গানের তুলনামূলক আলোচনা করা যায় তাহলে বলতে হয় অমন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের পাশে থেকেও অতুলপ্রাসাদ কিন্তু কখনোই কবিগুরুকে অনুকরণ করেননি। তিনি স্বমহিমায় আজও উজ্জ্বল। এই প্রসঙ্গে সাহানা দেবীর কিছু কথা বলা যেতে পারে। ১৯২৩ সালে সাহানা দেবী কাশীর বাস উঠিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন। সেই সময় ইউনভার্সিটি ইন্সটিটিউট হল-এ বসন্তের উৎসবের জন্য রবীন্দ্রনাথ সাহানা দেবী ও চিত্রলেখা দেবীকে গান শেখাচ্ছেন। এইসময় সাহানা দেবী রবীন্দ্রনাথকে নানারকম গান শোনাতেন, তার মধ্যে দু’চারটি হিন্দি গানও ছিল। সুর শুনেই কবির এমন পছন্দ হল সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, রোস রোস আমি বাংলাতে কথা বসিয়ে দিচ্ছি।

    সাহানা দেবী গাইতে লাগলেন “মহারাজা কেওয়ারিয় খোল” – গানটি তিনি অতুলপ্রসাদের কাছেই শিখেছিলেন। সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথ ভেঙে করে দিলেন "খেলার সাথী বিদায় স্বার খোল"। আর একটি হিন্দী গান “নর্‌মা কানহাইয়া” ভেঙ্গে কবি করেন –

    বুঝি ওই সুদূরে ডাকিল মোরে
    নিশীথেরি সমীরণ হায়
    মম মন হল  উদাসী দ্বার খুলিল
    বুঝি খেলারি বাঁধন ওই যায়।।

    ওই “নর্‌মা কানহাইয়া“র সুরে অতুলপ্রসাদও রচনা করেন

    শ্রাবণ ঝুলাতে বাদল রাতে
    তোরা আয়গো কে
    ঝুলিবি আয়।।

    একই হিন্দি গানকে দুইজনেই ভেঙে নিজের মত করে রূপ দিয়েছিলেন। কবির ছায়ায় থেকেও যে অতুলপ্রসাদ রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক প্রভাবিত হননি একথা জোর গলায় বলা যেতেই পারে।

    অতুলপ্রসাদ রবীন্দ্রনাথের থেকে ১০ বছরের ছোট ছিলেন। কিন্তু তার জন্যে তাঁদের অন্তরঙ্গ মধুর সম্পর্কের কোনভাবেই কোন বাধা হয়ে ওঠেনি। অতুলপ্রসাদের গানে ছিল তাঁর মনের স্বতস্ফূর্ত প্রকাশ। বয়সের সঙ্গে যতই অভিজ্ঞতা বেড়েছে, জীবনের সমস্যা যতই প্রখর হয়েছে ততই তিনি সংস্কারমুক্ত হয়েছেন, মন খুলে জীবন দেবতার উদ্দেশ্যে গান গাইতে পেরেছেন। তাই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গানের প্রতি এত অনুরক্ত ছিলেন আর মানুষ অতুলপ্রাসাদের স্নেহের বন্ধনে ছিলেন আপ্লুত। তাই যখন মাত্র ৬১ বছর বয়সে অতুলপ্রসাদ অমৃতলোকে যাত্রা করলেন তখন শত মনোব্যথা নিয়েও তাঁর স্মৃতিসভায় লখনৌতে এসে উপস্থিত হয়ে আলোচনা সভাতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। তবে অতুলপ্রসাদ চলে যেতে তাঁর যে বেদনা, প্রিয়জন হারানোর ব্যাথায় যে কতটা ব্যাথিত হয়েছিলেন তাঁর সেই বেদনার মূর্ত রূপটি বিখ্যাত কবিতাটি তুলে দিলেই পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে –

    বন্ধু, তুমি বন্ধুতার অজস্র অমৃতে
    পূর্ণ পাত্র এনেছিলে মর্ত্য ধরণীতে।
    ছিল তব অবিরত
    হৃদয়ে সদাব্রত
    বঞ্চিত করনি কভু কারে
    তোমার উদার মুক্ত দ্বারে।
    দিন পরে দিন গেছে মাস পরে মাস
    তোমা হতে দূরে ছিল আমার আবাস।
    “হবে হবে দেখা হবে”
    একথা নীরব রবে
    ধ্বনিত হয়েছে ক্ষণে ক্ষণে
    অকথিত তব আমন্ত্রণে।
    এখানে গোপন চোর ধরার ধূলায়
    করে সে বিষম চুরি যখন ভুলায়।
    যদি ব্যথাহীন কাল
    বিনাশের ফেলে জাল
    বিরহের স্মৃতিলয় হরি
    সবচেয়ে সে ক্ষতিরে ডরি।।
    মৈত্রী তব সমুচ্ছল ছিল গানে গানে
    অমরাবতীর সেই সুধাঝরা দানে
    সুরে ভরা সঙ্গ তব
    বারে বারে নব নব
    মাধুরীর আতিথ্য বিলালো,
    রসতৈলে জ্বেলে ছিলে আলো।
    আমারও যাবার কাল এলো শেষে আজি
    “হবে হবে দেখা হবে” মনে ওঠে বাজি
    সেখানেও হাসিমুখে
    বাহুমেলি লবে বুকে
    নব জ্যোতি দীপ্ত অনুরাগে
    সেই ছবি মনে মনে জাগে।
    তাই বলি দীর্ঘ আয়ু, দির্ঘ অভিশাপ,
    বিচ্ছেদের তাপ নাশে সেই বড় তাপ।
    অনেক হারাতে হয়
    তারেও করিনা ভয়;
    যতদিন ব্যথা রহে বাকি,
    তার বেশী যেন নাহি থাকি।।

    রবীন্দ্রনাথ
    ১৯ ভাদ্র ১৩৪১
    শান্তিনিকেতন

     

    (ঋণ – homeroam.info)

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @