নারী পাচারের বিরুদ্ধে অপরাজেয় সৈনিক রাজু নেপালি

১৯৯৪ সালের এক মনোরম শীতের বিকেলে মায়া (অনুরোধক্রমে নাম পরিবর্তিত)-র সঙ্গে রাজু নেপালির (Raju Nepali) পরিচয় হয়েছিল হয়েছিল নেপালের এক সাইবার ক্যাফের আড্ডায়। ধীরে ধীরে তাঁরা পারিবারিক বন্ধু হয়ে ওঠেন। মায়ার বিয়েতেও হাজির ছিলেন রাজু। প্রায় এক দশক পর দু'জনের আবার দেখা হয়। রাজু পুনে গিয়েছিলেন এক মিশনারি কনফারেন্সে যোগ দিতে। আর মায়া তখন পুনের এক গণিকালয়ের বাসিন্দা। নিজের জীবন বিপন্ন করে রাজু কাস্টমার সেজে গণিকালয় যান এবং মায়াকে উদ্ধার করেন। মুম্বাই থেকে প্লেন ধরে সোজা রওনা দেন বাগডোগরা বিমানবন্দর। মায়া যদিও বেশিদিন বাঁচেননি। উদ্ধার হওয়ার কয়েকমাস পর এইডসের কারণে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হয় তাঁর।
এই ঘটনায় রাজু একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন, কীভাবে প্রচুর মহিলা এবং তাঁদের পরিবার বিয়ের নামে প্রতারিত হন। নেপাল-উত্তরবঙ্গ সীমান্ত মহিলা এবং শিশু পাচারের বাড়বাড়ন্তের জন্য বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত অঞ্চল হয়ে উঠছে – তাও জানতে পারেন। এইভাবে অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চের একজন মিশনারি পরিণত হলেন পাচারের বিরুদ্ধে লড়াকু যোদ্ধায়। যোগ দিলেন দশকের অন্যতম বৃহৎ উদ্ধার অভিযানে। এর আগে তিনি 'ট্রাফিকিং' শব্দটির সঙ্গেই পরিচিত ছিলেন না। দার্জিলিং থেকে ফোনে তিনি বললেন, "ট্রাফিকিং মানে আমি বুঝতাম রাস্তার ট্রাফিক। মায়ার ঘটনার পর, যাঁকে তাঁর স্বামী পুনের এক গণিকালয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল, আমি উত্তরবঙ্গ এবং নেপালের পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁরা আমাকে বেশ কিছু তথ্য দেন এবং জানান কীভাবে উত্তরবঙ্গ এবং নেপালে নারী ও শিশু পাচার বেড়ে চলেছে। আমার চেতনা জেগে ওঠে এবং মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে মায়ার ঘটনা। তখন প্রতিজ্ঞা করি, জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা প্রচার করে একাই পাচারকারীদের বিরুদ্ধে লড়ব।"
ডুয়ার্সের চা বাগানে সচেতনতা অভিযান, বহু শিশু এবং মহিলা এখান থেকে পাচারের শিকার হন
একের পর এক গ্রাম, ছোটো শহর, চা-বাগানে ঘোরা শুরু করেন রাজু নেপালি। ওইসব জায়গার গরিব মানুষেরাই পাচারকারীদের প্রধান শিকার। শিশু এবং মহিলাদের কাজ অথবা বিয়ের নামে তুলে দেওয়া হয় ক্রেতাদের হাতে। মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্য কিংবা দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর, কলকাতার মতো শহরে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। তথ্য থেকে উঠে আসে, সীমান্ত অঞ্চলে পাচার বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। সরকারের ‘ট্র্যাক চাইল্ড পোর্টাল’ অনুযায়ী ২০১২-র জানুয়ারি থেকে ২০১৭-র মার্চ পর্যন্ত প্রায় ২৫০,০০০ জন শিশুর হারিয়ে যাওয়া নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় উধাও হয়ে যায় ৫ জন করে শিশু। তবে এই পরিসংখ্যান কেবল হিমশৈলের চূড়া। কারণ, বহু ঘটনা নথিভুক্তই হয় না। পালিয়ে যাওয়া মনে করে অভিভাবকেরা এবং পুলিশেরা অনুসন্ধান বন্ধ করে দেন।
রাজুর কথায়, “মায়ার ঘটনাই নথিভুক্ত ছিল না। বিয়ের পর ওর সঙ্গে যোগাযোগই করতে পারেনি ওর পরিবার। আমি যখন পরে ওর পরিবারের সঙ্গে দেখা করি, জানতে পারলাম যে মায়ার কোনো হদিস নেই। তখন ওর স্বামীর ফটো নিয়ে যোগাযোগ করলাম নেপাল পুলিশের সঙ্গে। পুরোনো ফাইল বের করে তাঁরা জানালেন, এই তথাকথিত ‘স্বামী’-র নামে একাধিক কেস রয়েছে। এমনকি ওয়ারেন্টও ইস্যু করা হয়েছে তার নামে।”
রাজু তাঁর মিশনারি কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম ‘ডুয়ার্স এক্সপ্রেস মেইল’। এমন নামকরণের কেন? রাজুকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি হেসে বলেন, সচেতনতা অভিযান তিনি শুরু করেছিলেন উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার নিউ মাল জংশন থেকে। প্রচুর মহিলা সেখানে রেললাইনে দিনমজুরের কাজ করেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে রাজু জানতে পারেন কীভাবে শিশু এবং কন্যাদের হারিয়েছেন তাঁরা। মেয়েদের বিয়ের পর যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে অনেকের। “সেই মহিলারা যখন আমাকে ভয়াবহ যন্ত্রণার কথা বলতেন, পাশ দিয়ে মহানন্দা এক্সপ্রেস যাতায়াত করত। সেই ট্রেন থেকেই ‘ডুয়ার্স এক্সপ্রেস মেইল’ নামের আইডিয়া পেয়েছি।”
জলপাইগুড়ি সদর থানা, উদ্ধার করা এক শিশুর বিস্তারিত তথ্য নেওয়ার কাজ চলছে
দার্জিলিং থেকে কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের ৮টি জেলা এবং নেপালের গ্রামীণ এলাকায় তাঁর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করে। স্কুল, রেললাইন, বস্তি, চা বাগান – নানা এলাকায় গিয়ে রাজু মাইকে প্রচার করেন, "কাউকে বিশ্বাস করবেন না। সবার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে খোঁজ নিন। যিনি স্বামী হতে চলেছেন, তাঁরও।" ভিড় জমায়েত করতে মাইকে গান বাজান। স্থানীয় গানগুলিও থাকে তার মধ্যে। লোকজন ভিড় করলে তিনি বক্তৃতা শুরু করেন। মুখোমুখি প্রচারে বিশ্বাস করেন রাজু, যাকে আমরা হুইসপারিং ক্যাম্পেনিং বলে থাকি। তাঁর মতে সেটাই শ্রেষ্ঠ পন্থা। লিফলেট বিলি করলে বরং গরিব নিরক্ষর মানুষদের কাছে পৌঁছনো মুশকিল হবে।
রাজুর অভিযান সরকারেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ২০০৮-২০১০ সাল থেকে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন। রাষ্ট্রীয় মহিলা আয়োগের সেক্রেটারি ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেছেন রাজুর সঙ্গে। উত্তরবঙ্গ পুলিশও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। "পুলিশ বাহিনী আমাকে ১০০ শতাংশ সহায়তা করেছে। হারিয়ে যাওয়া লোকেদের সমস্ত তথ্য দিয়েছে। অচেনা শহরে মৃত্যুর হুমকিতে থাকা মেয়েদের উদ্ধার করতে ২৪ ঘণ্টা আমার পাশে থেকেছে। উত্তরবঙ্গে পুলিশ খুবই সক্রিয়", বলেন রাজু। বিশেষ করে শিলিগুড়ির এসিপি ফারুক এবং এসিপি রাজন ছেত্রীর কথা উল্লেখ করেন। ভারতের এ-ওয়ান শহরগুলিতে গৃহস্থালির কাজের জন্য বিক্রি হয়ে যাওয়া মেয়েদের উদ্ধার করতে ব্যাপক সাহায্য করেছিলেন তাঁরা। দাসত্বে আবদ্ধ চাকরানিদের মতো এই সব মেয়েরা নৃশংস অত্যাচারের শিকার হত।
কাঞ্চনজঙ্ঘা উদ্ধার কেন্দ্রের রাঙ্গু সৌরিয়া এবং দার্জিলিং মার্গের নির্ণয় জোনস – এই দুই স্বেছাসেবী সংস্থার সঙ্গে এখন ডুয়ার্স এক্সপ্রেস মেইল কাজ করে। প্রয়োজনে উদ্ধারকারী দল পাঠায় পুলিশ। মেয়েদের উদ্ধার করার পর কাউন্সেলিং করানো হয়। তারপর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় মেয়েদের, পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। নাবালিকা হলে পুলিশের হাতে দেওয়ার আগে পাঠানো হয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে।
মানব পাচার নিয়ে শিলিগুড়ির সিটি সেন্টারে ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং প্রোগ্রামে বক্তৃতা রাখছেন রাজু নেপালি
প্রতি বছর রাজু এবং তাঁর দল প্রায় ১৩০ জন মহিলা ও শিশুকে উদ্ধার করেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জিজ্ঞেস করলে উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, গার্ল’স ক্লাব তৈরির জন্য উত্তরবঙ্গের ৫টি চা বাগান নেওয়ার পরিকল্পনা করছি। স্থানীয় মেয়েরা সেখানে সচেতনতা অভিযান চালু রাখবে এবং পাচার বন্ধ করতে উদ্যোগ নেবে”। দুঃখের সঙ্গে জানান, “এখনও ভুলতে পারিনি, কত যন্ত্রণা মায়াকে সহ্য করতে হয়েছে। প্রাণবন্ত ও বন্ধুবৎসল মেয়ে ছিল সে। বিয়ের পর কীভাবে পরিবার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল! পাচারকারীদের অত্যাচারে এইচআইভির জন্য মৃত্যুবরণ করতে হল তাকে।”
“রাজুর আরও সফলতা আসুক” বলে আমি কথোপকথন শেষ করি। তিনি আমাকে দার্জিলিং-এ ধূমায়িত চা পানের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।