No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    জাদু-বাস্তবতার ‘রেনবো জেলি’ 

    জাদু-বাস্তবতার ‘রেনবো জেলি’ 

    Story image

    ঘোঁতনকে আমরা কেউ চিনি না। ঘোঁতন আমাদের পাশের বাড়ির ছেলেটির মতো নয়। ঘোঁতনের মনে যে যে চিন্তাগুলো আসে তা অনেক বাচ্চার মনেই আসে না। এই এতকিছুর মধ্যেও ঘোঁতন আমাদেরই একজন, ওর বড় হয়ে ওঠার স্বপ্ন- মনখারাপ- মুখঝামটা- ভালোবাসা সবটাই আদতে আমাদের ছেলেবেলার কথা। যেটা হয়ত পেরিয়ে এসেছি, কিন্তু ওই আস্ত একখান ছেলেবেলাটা এখন রূপকথার মতো লাগে, ভাবতে ভালোলাগে। ব্যক্তিগতভাবে 'রেনবো জেলি' ছবির ঘোঁতনকে স্পেশাল চাইল্ড আমি বলতে চাই না। স্পেশাল অর্থে বিশেষ। ঘোঁতন তো আমাদেরই একজন, আমাদের ছেলেবেলার দোসর। তাকে অন্য কেউ ভেবে দূরে ঠেলে দিলে অন্যায় করা হবে। আমার মতে এই ছবি কোন স্পেশাল চাইল্ডের গল্প নয়। তার আঠারো হয়ে ওঠার গল্প। পরিবার সমাজ সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে তার নিজেকে চিনতে পারার গল্প। মৃত বাবা-মা'র জন্য ঘোঁতনের মনখারাপ হয়। রাত্রে আলগোছে কথা চালাচালি হয় তিনজনের। ওঁরা দায়িত্ব দিয়ে গেছিলেন মামার হাতে। আর রোজদিন মামার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। মামা তাকে আশা দিয়ে রাখে আঠারো বছর বয়স হলেই ঘোঁতন পাবে যক্ষের ধন, আর যেটা ঘরের এককোণে রোবটটার মধ্যে রাখা আছে। তাই ঘোঁতন বাচ্চাবেলায় পড়ে না থেকে তার স্বপ্ন আঠারোতে ছুঁই ছুঁই করে। বয়ঃসন্ধি আসে অচেতনে।

    ঘোঁতনের জীবনে আর পাঁচজনের মতোই আসে স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা। পপিন্স। বাড়ির ছাদ থেকে পাশের বাড়ির ওই মেয়েটির সঙ্গে প্রায়শই দেখা হয়ে যায় তার। ছবিটি দেখলেই বোঝা যাবে পপিন্স আর ঘোঁতন বন্ধু হয়, কথা চালাচালি করে। এক্ষেত্রে ড্রোনের সাহায্যে বাড়ির ছাদ, ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোঁতন আর ঘোঁতনের পপিন্সকে দেখা এক ফ্রেমে আবর্তিত হয়। শান্ত হয়ে থাকাটাই হয়ে ওঠে আদুরে সংলাপ। ছাদ থেকে ওই মেয়েটিকে দেখার দৃশ্যগুলিতে বারবার মনে হয় ঘোঁতন যেন মামার বানানো পৃথিবীর ছাদ থেকে নিজের স্বপ্নে বানানো পৃথিবীর ছাদে পৌঁছে যেতে চায়। বাঁধন থেকে একেবারে মুক্ত। এখানেও সেই বয়ঃসন্ধির ঝোঁক। 

    হঠাৎ করেই মোড় ঘোরে গল্পের। রূপকথার গল্পের মতো পরিত্রাতা আসেন। পরী পিসি। সাত সাতটা স্বাদের ম্যাজিক জানেন তিনি। এখানেই উঠে আসে ‘রেনবো জেলি’ নামের সার্থকতা। মামা খেয়ে যান ঘোল। ঘোঁতনের মুখে দেখা যায় হালকা হাসির রেখা। পরী পিসি ঘোঁতনকে বলেন “তুমি একটা কিছু মন থেকে জোরসে চাইছ। আর তক্ষুণি আকাশের ওপর থেকে একটা এরোপ্লেন চলে গেল”। ঠিক এমন ভাবে উড়ানের গল্প বলে যান পরী পিসি। সিনেমায় পরী ম্যাডামের পদবি ‘ধর’। গোটা নামটা যেন এক প্রতীকি শব্দবন্ধ হয়ে খেলা করে এই সিনেমার জাদুবাস্তবতায়। তাঁর বলা আকাশ ছোঁয়ার গল্প ঘোঁতনকে আকৃষ্ট করে। সে এরোপ্লেন দেখে। সাঁই করে উড়ে যাওয়ার গল্প, যেখানে পপিন্স, পরী পিসি, বাবা-মা, বাড়ির এককোণে রাখা ওই রোবটটা, চায়ের দোকানের বন্ধু হয়ে যাওয়া লোকটা সব্বাইকে নিয়ে উড়ে চলে যাবে ঘোঁতন। আমাদের চিরাচরিত ধ্যানধারণাগুলোকে বদলে দেবে অনায়াসে। এখানে যদি ঘোঁতন বিশেষ হয়, তাহলে সে অবশ্যই বিশেষ। নিছক কোন শারীরিক কারণে নয়।

    শহরে আরও দুটো বাংলা ছবি চলছে যেগুলো একজন বাচ্চাকে নিয়েই আবর্তিত। একটি ছবিতে দেখানো হচ্ছে অসময়ে দুর্গাপুজো। বাবা নয়, বাবার টাকা স্বপ্নপূরণ করছে মেয়ের। যার কোনও বাস্তবভিত্তিই নেই। আরেকদিকে একটি স্কুলকে কেন্দ্র করে দেখানো হচ্ছে ছোটদের কীভাবে শাসন করতে হয়, ছোটদের মুখে পাকা পাকা কথা গুঁজে টি আর পি খাওয়াতে হয়। ওদের স্কুলে ঘোঁতনদের মতো বাচ্চারা ব্রাত্য। ঘোঁতন দেখছে সব। রমরমিয়ে চলার ব্যাপারে ঘোঁতনের পাশে বন্ধু হয়ে এই তিলোত্তমা দাঁড়াতে পারছে না, হার মানছে। সুপারহিট ওই দুটি বাংলা ছবির কাছে ‘রেনবো জেলি’ একটা থাপ্পড়। তারা জানেন এটা?

    আমাদের আকর্ষণ বিন্দু এভাবেই ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। ঘোঁতন আইডেন্টিফাই করে ওর বেঁচে থাকাকে। সমাধানের সূত্র খুঁজে দেয় পরী পিসি। এ গল্প খুব চেনা গল্প নয়। আর নয় বলেই ফ্যান্টাসির আশ্রয় নিতে হয়। বাস্তবিক জীবন থেকে কল্পনার জগতে যাওয়া পর্যন্ত যে স্তর ক্রমান্বয়ে সাজানো থাকে, এর মাঝে বিস্তীর্ণ পথ হাঁটা থাকে একপ্রকার। গতির পথ। সেখানে ঘোঁতনের পাশে কেউ নেই হয়ত, কিন্তু তার ফ্যান্টাসির জগতে পপিন্স কিংবা পরী পিসিরা আছেন। এটা সে জানে। আলোক মাইতির চিত্রগ্রহণ এবং অর্ঘ্যকমল মিত্রের সম্পাদনা এ ছবির গতির বুননে প্রতিমাত্রায় সাহায্য করেছে। নবারুন বোসের সুরে এ ছবির গান একটা বড় সম্পদ। কখনও মৌসুমী ভৌমিক, কখনও সাহানা বাজপেয়ী, কখনও বাচ্চাদের কোরাসে ছবির আবহ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বহুদিন পর একটি বাংলা সিনেমার প্রায় প্রত্যেকটি গানই মন ছুঁয়ে গেছে। যেমন তার লেখা, তেমন তাঁর সুর। সৌকর্য ঘোষালের এটি তৃতীয় ছবি। এর আগে 'পেণ্ডুলাম' বা 'লোডশেডিং' সমালোচকদের পছন্দ হলেও চর্চিত নয়। ‘রেনবো জেলি’র অদূর ভবিষ্যৎ আমরা জানি না। কিন্তু এই ছবির প্রতিটা সংলাপ যে দর্শকের মনের ছেলেবেলা ছুঁয়ে গেছে তা অস্বীকার করি কীভাবে! হেরে যাওয়া নয়, বরং স্বপ্ন দেখা শুরু হোক। পালিয়ে যাওয়া নয়, নতুন একটা জার্নি শুরু হোক। ঘোঁতনরা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। ঘোঁতনরা আপনাকে ভালোবাসে। মাক্কালি! 

    ছবি- রেনবো জেলি
    পরিচালক- সৌকর্য ঘোষাল
    অভিনয়ে- মহাব্রত বসু, শ্রীলেখা মিত্র, কৌশিক সেন, অনুমেঘা ব্যানার্জী

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @