No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    প্রেমের জোয়ারে ভাসলেন সাতরঙা মানুষ

    প্রেমের জোয়ারে ভাসলেন সাতরঙা মানুষ

    Story image

    রবিবার সকালটা শ্যামবাজার শ্যামপার্ক সংলগ্ন রমাকান্ত বোস স্ট্রিটের শতাব্দী প্রাচীন বাড়িটার তেতলার চ্যাটার্জী গিন্নির আর পাঁচটা সকালের চেয়ে একটু অন্যরকম ভাবে শুরু হল। জানলার খড়খড়ি সরিয়ে দৃষ্টি গেল পাশের শ্যামপার্কের বিশাল মাঠটার দিকে। ন্যাড়া মাঠটা সেদিন সেজেছে সাতরঙা হরেকরমবায়। বেলা ১১টায় একদল রঙিন মানুষ রামধনু পতাকা উড়িয়ে গান ধরেছে “সমকামী হোক বা বিষমকামী, নিজের মতো বাঁচতে পারি।” কৌতূহল আর বিরক্তির টানাপোড়েনে তিনি দিন শুরু করলেন রান্নাঘরের হাতাখুন্তিতে। এদিকে শ্যামপার্কে তখন একে একে জড়ো হয়েছে প্রান্তিক যৌনতা ও লিঙ্গের অনেক মানুষ। মাঠ ঘিরে সেজে উঠেছে প্রায় ৫০টি স্টল। কেউ এনেছেন নিজের হাতের তৈরি ব্যাগ, জামা, মোমবাতি; আবার কেউ নিজের হাতে তৈরি খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। নাচ, গান ছোটাছুটি শুরু হয়েছে মাঠ জুড়ে। পথচলতি কৌতূহলী চোখ এসে থমকে দাঁড়িয়েছে মাঠের গেটের সামনে। মাঠের লোকেরা তাঁদের ডেকে নিচ্ছেন অপার আগ্রহে। রূপান্তরকামী নারী, রূপান্তরকামী পুরুষ, গে, লেসবিয়ান, বাইসেক্সুয়াল, বিষমকামী মানুষের উৎসাহে গত ১৩ জানুয়ারি এভাবেই শ্যাম স্কোয়ার পার্কে কলকাতার পঞ্চম রেনবো কার্নিভালে ফুটে উঠল যৌনতার রামধনু বর্ণালী। সকাল থেকে ছিল খেলাধুলোর আয়োজন। চিরপরিচিত মিউজিকাল চেয়ার থেকে ভাঁজ করা কাগজে যুগল নৃত্য এবং আরো সব মজাদার খেলায় অংশ নিল সবাই। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্যাম পার্ক প্রেমের জোয়ারে ভাসছে। ওরা শোনাচ্ছে ভালবাসার কথা, ওরা দৌড়চ্ছে ভালোবাসার ট্র্যাকে, ওরা খাওয়াচ্ছে ভালোবাসার রান্না। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে চ্যাটার্জী বাড়ির ব্যালকনি থেকে উৎসুক চোখগুলোয় এসে পড়ল সেই ভালোবাসার আঁচ। অস্বস্তির বাঁধ ভাঙল সন্ধ্যা নামার পর। ততক্ষণে চ্যাটার্জী কত্তা-গিন্নি গেট পার করে ঢুকে পড়েছেন মাঠের ভিতর। মাঠে মাচা বেঁধে শুরু হয়েছে নাচ-গান-আবৃত্তির জলসা। কলেজ পড়ুয়া অর্চা গিটার বাজিয়ে গাইছেন লেসবিয়ান প্রেমের গান। রূপান্তরকামী রিঙ্কু তাঁর দল নিয়ে মাথায় জ্বলন্ত অঙ্গার নিয়ে নাচলেন প্রথাগত রাজস্থানী নাচ। সমকামী সাত্যকি আর রাহুল নাচতে নাচতে চুমু খেয়ে ছড়িয়ে দিল প্রেমের বার্তা। শীতের রাতে হিম পড়া উত্তর কলকাতার পাড়াটায় ওরা ছড়িয়ে দিল প্রেমের উষ্ণতা। বাড়ি ফেরার সময় কত্তা-গিন্নি ভাবছিলেন এঁরা আমাদের থেকে খুব একটা খাপছাড়া নয় অথবা আমরাও কোথাও কখনো কিছুটা খাপছাড়া।

     

    রেনবো কার্নিভালের উদ্যোক্তা ওয়েস্ট বেঙ্গল ফোরাম ফর জেন্ডার এন্ড সেক্সুয়াল মাইনরটি রাইটসের এক সদস্য জানালেন, “গতবার আমাদের কার্নিভাল হয়েছিল দক্ষিণ কলকাতার ট্র্যাঙ্গুলার পার্কে। এবার আমরা চেয়েছিলাম দক্ষিণ কলকাতার তথাকথিত আভিজাত্যের ঘেরাটোপ পেরিয়ে, উত্তর কলকাতার তথাকথিত রক্ষণশীল অঞ্চলে এই সব প্রায় নিষিদ্ধ বিষয়গুলো তুলে আনতে। ৩৭৭ ধারার আংশিক অবলুপ্তির মধ্যদিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আমাদের অপরাধীর তকমা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ তৈরি না করলে আমাদের প্রতি দৈনন্দিন অত্যাচার আর ভেদাভেদ দূর করা সম্ভব নয়। কার্নিভালের এই প্রয়াস সেই পথকেই তৈরি করবে বলে আমাদের আশা।” সামাজিক সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি এলজিবিটিকিউ মানুষদের স্বনির্ভরতাকে উৎসাহ দান এবং তাঁদের তৈরি জিনিসপত্তর প্রতিভাকে তুলে ধরার একটা পরিসর তৈরি করাও এই কার্নিভালের একটি মূল উদ্দেশ্য। ব্রাহ্মণ্যবাদী শোষণের পিতৃতান্ত্রিক শোষণের বিরোধীতার ডাকও শোনা গেল এই মঞ্চ থেকে। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের যাতায়াত চলে সারাদিন ধরে।  দিনের শেষে হাত বাড়ালেই বন্ধু হলেন চারপাশের মানুষজন। ছক্কা হোমো বলে টিটকিরি করছিলেন কিছু পথচলতি পুরুষ। প্রতিবাদটা উঠে এল স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকেই। স্থানীয় ক্লাবের এক সদস্য বললেন “ওরা এত সুন্দর একটা প্রোগ্রাম করছে। ওদের অপমান করলে আমাদের বদনাম। আমরা চাইব বার বার কার্নিভাল হোক আমাদের এই মাঠেই।”

     

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @