রবিঠাকুর ও রল্যাঁর যে সাক্ষাৎ আজও প্রাসঙ্গিক

মনিষীদের বন্ধুত্ব নিয়ে শিক্ষিত সমাজের উৎসাহ বরাবরই। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষিতে বোঝার, অনুভব করার এটাও একপ্রকার পন্থা। অন্যান্য অঞ্চলের, দেশের মহামতিদের সঙ্গে তাঁর আলাপ-আলোচনার মর্ম, গতিময়তা, কথাবার্তায় নিহিত অর্থ নিয়ে অনেকেই উৎসুক। নিজ-নিজ ক্ষেত্রের দু’জন যুগান্তকারী পণ্ডিত যখন এক-অপরের বন্ধু হন, চিঠিপত্রের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ হন, তখন মানব সভ্যতা, সাহিত্য, শিল্পকলা, প্রকৃতি এবং আরও নানান বিষয়ে প্রসার ঘটে, উন্মোচন হয় নতুন ভাবনার, খুলে যায় ভাবনার অনেকগুলো দরজা। এই সূত্রে রবীন্দ্রনাথ আর রোমাঁ রোল্যাঁর গাঢ় বন্ধুত্ব বহু চর্চিত। ১৯১৯ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। ইউরোপ জুড়ে সেই যুদ্ধের দগদগে ঘায়ে তখনও শুশ্রুষা চলছে। ভারতবর্ষেও ইংরেজদের অকথ্য অত্যাচারে মানুষজন ফুঁসছেন। জেনেরাল ডায়ারের নির্দেশে এপ্রিলের ১৩ তারিখে ঘটে গেছে জালিওয়ানবালা বাগে নির্মম হত্যাকাণ্ড। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ইংল্যান্ডের রানীর দেওয়া নাইট উপাধি ত্যাগ করলেন রবীন্দ্রনাথ। মে মাসের ৩০ তারিখ ভারতের ভাইসরয়কে চিঠি লিখে সেই সিদ্ধান্তর কথা তিনি জানালেন। এইসব ঘটনার মধ্যেই ওঁর যোগাযোগ হয় প্রখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবি রোমাঁ রোল্যাঁর সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ নিজের একটি লেখায় উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে নিজের বক্তব্য লেখেন, মানুষের কাছে স্পষ্ট করেন সমাজের বিভিন্ন স্তরে এর বীভৎসতা। রোল্যাঁ রবিঠাকুরের এই স্পষ্টবাদিতায় অভিভূত হয়ে ওঁকে চিঠি লিখে নিজের মুগ্ধতার কথা জানান, ভবিষ্যতে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেই সময়ে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরোধি অভিমত সংগ্রহের নেতৃত্বে ছিলেন রোল্যাঁ। La Déclaration pour l` indépendence de l`esprit নামে একটি ঘোষনাপত্রে রল্যাঁর অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ সানন্দে নিজের সাক্ষরও দেন।
আরও পড়ুন
রবীন্দ্রনাথ ও এইচ জি ওয়েলস-এর সাক্ষাৎকার
প্রায় দু’বছর পর, অর্থাৎ ১৯২১ সাল নাগাদ, ছবির শহর, কবিতার শহর প্যারিসে দু’জনের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেই সাক্ষাতেই ওঁরা নিবিড় কথাবার্তার মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করেন সমাজকে, সমর্থন করেন এক বৌদ্ধিক অনুভূতির যা মানুষকে শান্ত হতে শেখায়, ভাবতে শেখায়। আলাপ-আলোচনায় রঁল্যা স্বভাবতই বিশ্বশান্তির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। উনি রবীন্দ্রনাথকে জানান যে ইউরোপ এই প্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের দিকে তাকিয়ে আছে, কারণ আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশের বার্তা, যা পৃথিবীতকে শান্ত করতে পারে, তা শুধু ভারতবর্ষই দিতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ওঁর সাথে একমত হন, উল্লেখ করে যুগপুরুষ রাজা রামমোহন রায়কে, হিন্দু ধর্মের হাজার বছরের গোঁড়ামি চুরমার করে দেওয়া তাঁর কাজগুলোকে। আলোচনায় গতি আসে, আরও গভীরে কথা হয় ধর্ম নিয়ে। রল্যাঁ বলেন যে ভারতের মতন একটি বিশাল দেশে সর্বধর্মের সমন্বয় ওনাকে আলোড়িত করে, নানাবিধ ভাবনার এমন সংমিশ্রণ ওঁর চিন্তাধারাকেও গড়তে সাহায্য করেছে। রবিঠাকুর বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে যোগ করেন যে এই প্রাচীন দেশে বিভিন্ন ধর্মের জলধারা এক মহাসমুদ্রে এসে মিশেছে এটা ঠিক, কিন্তু অতিরিক্ত সহনশীলতা আর যথাযথ সংস্কারের অভাব এই মিশ্রণকে জটিল করে তুলেছে। সময়ের প্রবাহে, রবিঠাকুর যা আরও বললেন, এই জটিলতা ক্রমশ হ্রাস পাবে। আলোচনার শেষ লগ্নে দুজনেই একটা কথাতেই উপসংহার টানেন, যে, সমাজকে সামগ্রিকভাবে আরও মানবিক করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। ভবিষ্যতে আধ্যাত্মবাদ আর বিজ্ঞানের ভারসাম্যই মানুষকে সহনশীলতার পথ দেখাবে। আজ বর্তমান সময়ে এই সাক্ষাৎকারের কথাগুলো নানান জনের চেতনায় সঞ্চারিত হোক, এটাই কাম্য। বিশাল আকাশের তলায় আরও বসবাসযোগ্য হয়ে উঠুক আমাদের প্রত্যেকের এই সুন্দর পৃথিবী।