রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যিশু খ্রিস্টকে খুঁজে পেলেন ধর্মপ্রাণ জন

স্যার উইলিয়াম রোদেনস্টাইন ছিলেন ইংল্যান্ডের এক স্বনামধন্য চিত্রকর। এছাড়াও শিল্পকলার বেশ কয়েকটি শাখায় তাঁর পারদর্শিতা ছিল। শিল্প-সমালোচক এবং সুবক্তা হিসেবেও তিনি পাশ্চাত্যের মনন জগতে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। রোদেনস্টাইন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার অর্জনে রোদেনস্টাইন এবং আইরিশ কবি ডাব্লুবি ইয়েটসের অবদান ছিল যথেষ্ট।
সেটা ১৯২০ সালের জুন মাস। রবীন্দ্রনাথ লন্ডনে গিয়ে উঠেছেন কেনসিংটন প্যালেস ম্যানসনে। থাকার জায়গাটা ঠিক করেছিলেন রোদেনস্টাইন। কাছেই শেফিল্ড টেরাসে তাঁর বাড়ি। সেখান থেকে অনায়াসে তিনি কেনসিংটনে যেতেন, রবীন্দ্রনাথও ইচ্ছে করলে সহজেই রোদেনস্টাইনের বাড়ি যেতে পারতেন। রবি ঠাকুরের সঙ্গে লন্ডনে গিয়েছিলেন ছেলে রথীন্দ্রনাথ এবং পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী। তখন প্রতিমাদেবী ছিলেন অসুস্থ।
এক রাতে রবীন্দ্রনাথ ট্যাক্সিতে শেফিল্ড টেরাস থেকে কেনসিংটনে ফিরছেন। ডিনার সেরে এসেছেন রোদেনস্টাইনের বাড়িতেই। গল্পগুজবে দেরি হয়ে গেছে অনেকটা। রাত বারোটা বেজে গিয়েছে। ট্যাক্সি গিয়ে থামল কেনসিংটন প্যালেসের সামনে। রবীন্দ্রনাথ জোব্বার একের পর এক পকেট হাতড়াচ্ছেন, কিন্তু টাকা খুঁজে পাচ্ছেন না। তাঁর ভোলা মন, হয়তো টাকা নিয়ে বেরোতেই ভুলে গিয়েছেন। এদিকে এত রাতে রথীন্দ্রকে ঘুম থেকে তোলাও বিড়ম্বনা। খুবই মুশকিলে পড়েছেন রবি ঠাকুর।
এরকম সময়ে তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন তপনমোহন চট্টোপাধ্যায়। তপনমোহন পরবর্তীকালে প্রখ্যাত আইনজীবী হয়েছিলেন। লিখেছিলেন বেশ কিছু গবেষণাধর্মী বইও। ইতিহাসের গল্প নিয়ে তাঁর লেখা ‘পলাশীর যুদ্ধ’, ‘পলাশীর পর বক্সার’, অন্যন্য বইয়ের মধ্যে ‘স্মৃতিরঙ্গ’, ‘বাংলা লিরিকের গোড়ার কথা’ ইত্যাদির নাম করাই যায়। তাছাড়া, শান্তিনিকেতনে তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ছাত্র। রবীন্দ্রনাথ যখন কেনসিংটন প্যালেসে উঠেছেন, তখন তপনমোহন ইংল্যান্ডে আইন পড়তেন। ডি-ভিয়র গার্ডেন্সেই থাকতেন, যেই রাস্তার ওপরই দাঁড়িয়ে কেনসিংটন প্যালেস। অনেক রাত অবধি পড়াশোনা করে সেদিন হাঁটতে বেরিয়েছিলেন তপনমোহন। রাতের খাওয়াটা সেরে নেওয়াও ছিল উদ্দেশ্য। হঠাৎই রাস্তায় রবি ঠাকুরের গাড়ির মুখোমুখি হয়ে পড়েন। তাঁর সামনেই থামে ট্যাক্সিটা।
তপনমোহনকে দেখে রবীন্দ্রনাথ বেশ আশ্বস্ত হলেন। বললেন, “এই, তোর পকেটে কিছু আছে নাকি? না, আমারই মতন একেবারে শূন্য?” পরিস্থিতি বুঝে তপনমোহন ট্যাক্সির মিটারের দিকে তাকালেন। দেখলেন, ভাড়া হয়েছে দেড় শিলিং। এর সঙ্গে আরও ছয় পেনি যোগ করে ড্রাইভারকে দিলেন। নিশ্চিন্ত হয়ে তপনমোহনের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগলেন রবীন্দ্রনাথ। তপনমোহন তাঁকে অনুরোধ করলেন একসঙ্গে কফি খাওয়ার জন্য। কাছেই জনের ক্যাবস্টল। রাজি হলেন রবীন্দ্রনাথ।
ক্যাবস্টল হল চারটে চাকার ওপর বসানো কাঠের গাড়ি। রান্না করা খাবার-দাবার বিক্রি হয় সেখান থেকে। জন তাঁর স্টল থেকে বিক্রি করতেন কফি, ডিম সেদ্ধ, হ্যাম স্যান্ডউইচ, ফিশ অ্যান্ড চিপ, ওয়ালনাটের রোস্ট। এই জন খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ। প্রতি রবিবার সকালে-সন্ধেয় গির্জায় যেতেন। আর রবিবারের দুপুরটা কাটিয়ে দিতেন বাইবেল পড়ে। তাঁর পদবি যে কী, তা তা নিয়ে কেউ কোনোদিন মাথা ঘামায়নি। তপনমোহনের সঙ্গে জনের বেশ ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল।
সেই জনের ক্যাবস্টলে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চলেছেন তপনমোহন। দু’জন পাশপাশিই যাচ্ছিলেন, জনের স্টল কাছে এসে পড়ায় তপনমোহন এগিয়ে গেলেন। জনকে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বুঝিয়ে বলতে হবে, যাতে বিশ্বকবিকে জন সঠিকভাবে অভ্যর্থনা করেন।
ক্যাবস্টলে গিয়ে তপনমোহন দেখলেন আশ্চর্য এক দৃশ্য। সেখানে জন ছাড়া আর কেউ নেই। জন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে তপনমোহন দেখলেন, জন তাকিয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথের দিকে। রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে আসছেন, মখমলের লম্বা টুপিটা খুলে ফেলেছেন। চাঁদের মৃদু আলো তাঁর মুখে পড়েছে। তাঁকে দেখতে দেখতে জন পা মুড়ে বসলেন, নিলডাউনের ভঙ্গিতে। হাত দু’টো জোড় করলেন সামনের দিকে। গতিক দেখে রবীন্দ্রনাথ জায়গাটা ছেড়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। লন্ডনের রাস্তাঘাট তিনি বিশেষ চেনেন না। তাই তপনমোহন গিয়ে তাঁর সঙ্গ নিলেন। তাঁকে পৌঁছে দিলেন কেনসিংটন প্যালেসে। যেতে যেতে অবশ্য কোনো কথাই হয়নি তাঁদের।
রবীন্দ্রনাথকে কেনসিংটন প্যালেসের নাইট পোর্টারের কাছে পৌঁছে দিয়ে তপনমোহন আবার গেলেন জনের ক্যাবস্টারে। তাঁকে দেখে জন বললেন, “চ্যাটার্জি, আমার জীবন ধন্য। করুণাময় লর্ড জিসাস ক্রাইস্ট দূর থেকে আজ আমাকে দর্শন দিয়ে গিয়েছেন। আমার জীবন সার্থক”। জনের চোখেমুখে তখন এক স্বর্গীয় ঔজ্জ্বল্য। অপার শান্তি প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর মুখমণ্ডল থেকে। তপনমোহন আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। সেই রাতে না খেয়েই তিনি বাসায় ফিরে গেলেন।
ঋণস্বীকার –
১) স্মৃতিরঙ্গ, তপনমোহন চট্টোপাধ্যায়
২) রবীন্দ্র স্মৃতি, সম্পাদক - বিশ্বনাথ দে।