রবীন্দ্রনাথের ‘স্বভাববন্ধু’ রোটেনস্টাইন

রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন প্রিয়জন বিয়োগের ব্যথায় যেমন ভরাট ছিল, তেমনি আবার তাঁর বন্ধুভাগ্য ছিল বেশ ভালো। দেশ বিদেশের অনেক বন্ধুর সাহচর্য তাঁর শিল্পী জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। চলার পথে অনেকসময় বন্ধুরাই আলো হয়ে পথ দেখিয়েছেন। রবি ঠাকুরের এমনই এক বিদেশি বন্ধুর কথা আজ বলব।
সেই বন্ধুর নাম ছিল উইলিয়ম রোটেনস্টইন, চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর নামও বিশ্বজোড়া। ভারতীয় শিল্পকলার প্রতি আশ্চর্য টান অনুভব করতেন রোটেনস্টাইন। ১৯১০ সালে ভারতীয় শিল্পের টানেই তিনি ভারতবর্ষে আসেন ও পরিচিত হন ঠাকুর বাড়ির দুই প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। কলকাতায় থাকার সময় রোটেনস্টাইন জোড়াসাঁকোতে যেতেন অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাংলার নব্য শিল্পচর্চা নিয়ে আলোচনা করতে। আলোচনা সভায় থাকতেন রবীন্দ্রনাথ, শ্রোতা হিসেবে। রোটেনস্টাইন তখনো জানেন না রবীন্দ্রনাথের গুণের কথা। একজন চিত্রকর হিসেবে তাঁর রবীন্দ্রনাথের ওই শান্ত, শোভন মূর্তি বড়ো ভালো লাগত। এই আশ্চর্য টান একদিন গভীর বন্ধুত্বের শিকড় তৈরি করবে, সেকথা রবীন্দ্রনাথ বা রোটেনস্টাইন কেউই জানতেন না। রোটেনস্টাইন সেই সময় রবীন্দ্রনাথের একটি প্রতিকৃতি আঁকেন আর সেই প্রতিকৃতি ‘গীতাঞ্জলি’ বইতে রয়েছে। ‘গীতাঞ্জলি’-র ইংরেজি অনুবাদ ‘Song Offerings’-এর জন্য রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার অন্তরালে রোটেনস্টাইনের অবদান কিছু কম নয়। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরেই রবীন্দ্রনাথের প্রথম এই বন্ধুর কথাই মনে হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ জানতেন এই বিদেশি বন্ধুটি সবচেয়ে খুশি হবেন রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির সংবাদে। সত্যিই তাই প্রথমে টেলিগ্রামে আর তারপর দীর্ঘ চিঠিতে দূর বিদেশ থেকে ভেসে এসেছিল রোটেনস্টাইনের শুভেচ্ছা বার্তা।
অনুবাদ পড়ে রবীন্দ্রনাথকে চিনেছিলেন রোটেনস্টাইন। সিস্টার নিবেদিতার করা ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্প অনুবাদ, অজিতকুমার চক্রবর্তীর করা রবীন্দ্রকবিতার অনুবাদ পড়ে রোটেনস্টাইন মুগ্ধই ছিলেন। তারপর ১৯১২ সালে রোটেনস্টাইনের সঙ্গে আবার দেখা হল রবীন্দ্রনাথের। রথীন্দ্রনাথ আর প্রতিমাদেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তখন ইউরোপ সফরে। লন্ডনে পৌঁছনোর পর রোটেনস্টাইনের সাহায্যেই বাসা পেয়ে হ্যাম্পস্টেড হীদে থাকেন কিছুদিন রবীন্দ্রনাথ। এখন অনেকেই মনে করেন, রোটেনস্টাইন আর তাঁর বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জন্যই রবীন্দ্রনাথের এই লন্ডন সফর। রবীন্দ্রনাথের নিজের করা ইংরেজি কবিতার অনুবাদগুলি রোটেনস্টাইনের উদ্যোগেই পৌঁছে যায় এন্ড্রু ব্রাডলি, স্টপফোর্ড ব্রুক এবং ইয়েটসের কাছে। রোটেনস্টাইন রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলির তিনটি কপি করে কবি সাহিত্যিক বন্ধুদের কাছে পাঠান। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রোটেনস্টাইনের মুগ্ধতা তখন চরমে। নিজেই আয়োজন করেছেন সাহিত্যসভা। ইয়েটস সেখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেছেন। রোটেনস্টাইনের মাধ্যমে পাশ্চাত্যের অনেক খ্যাতনামা কবি সাহিত্যিকের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বলাই বাহুল্য, রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে এই বন্ধুত্বের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ রোটেনস্টাইনকে বলেছিলেন, ‘স্বভাববন্ধু!’ তাঁর যে বন্ধুত্বের প্রতিভা অসাধারণ একথাও বলেছিলেন তিনি।
রোটেনস্টাইনের আঁকা রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি প্রতিকৃতি ম্যাকমিলান কোম্পানির থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ এই সংকলনটিকে বন্ধুত্বের স্মারক বলে মনে করেছিলেন। রোটেনস্টাইনের পরিবার বিশেষ করে তাঁর দুটি ছোটো ছেলে-মেয়ের কথা রবীন্দ্রনাথ অনেকবার উল্লেখ করেছিলেন। ’শিশু’ কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ ‘The crescent moon’ লেখার সময় রোটেনস্টাইনের শিশু সন্তানদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত প্রভাব ফেলেছিল বলে সমালোচকদের অনুমান।
১৯২০ সালে আবার রথীন্দ্রনাথ আর প্রতিমাদেবীকে নিয়ে লন্ডনে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ আর সেখানেও পেয়েছিলেন রোটেনস্টাইনের সহৃদয় সাহচর্য। এরপরেও ১৯২৬, ১৯৩১ সালেও রবীন্দ্রনাথ ও রোটেনস্টাইনের দেখা হয়। রোটেনস্টাইন রবীন্দ্রনাথকে অসম্ভব শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। বলেছিলেন, “No man’s company gives me more pleasure than Tagore’s.”
আবার রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা মাঝখানে তাঁদের বন্ধুত্বে সাময়িক মৌনতা আনলেও আবার তাঁদের বন্ধুত্ব নতুন জন্ম পায়। রবীন্দ্রনাথের নাইট উপাধি ত্যাগ রোটেনস্টাইনকে রাজনৈতিকভাবে বিব্রত করে নীরব করলেও পরে সেই নীরবতা ভঙ্গ করেন নিজেই। বিশ্বভারতীর আর্থিক সমস্যা সমাধানের জন্য রবীন্দ্রনাথের ইংলন্ডের বন্ধুরা যে ‘অর্থ সহায়তা ভান্ডার’ খুলেছিলেন, সেই আবেদনপত্রের অন্যতম সাক্ষরকারী ছিলেন রোটেনস্টাইন। দুজনের চিঠিপত্র এই একত্রিশ বছরের দীর্ঘ শৈল্পিক বন্ধুত্বের দলিল।
জীবনে চলার পথে অনেক দুঃখ থাকলেও, হঠাৎ হঠাৎ ম্যাজিক হয়। বন্ধুর সাহচর্যে অনেক দৈব লক্ষ্য পূরণ হয়। রবীন্দ্রনাথের জীবনে রোটেনস্টাইন সেই ম্যাজিকের নাম।
সহায়ক প্রবন্ধঃ
প্রসঙ্গ-রবীন্দ্রনাথ ও রোটেনস্টাইন, প্রবীরকুমার দেবনাথ