No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ‘যা চাইব সব পাব জানলে বাঘের দুধের ক্ষীরটা করতে বলতাম’ : লালবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ

    ‘যা চাইব সব পাব জানলে বাঘের দুধের ক্ষীরটা করতে বলতাম’ : লালবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ

    Story image

    কটা লাল রঙের বাড়ি। ইটের গাঁথনিতে সেকালের স্মৃতির সৌরভ। হুগলির (Hooghly) ভদ্রেশ্বর থানার তেলেনিপাড়ার (Telenipara) জমিদার অন্নদাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বসতবাটি এই ‘লালকুঠি’ (Lalkuthi)। অন্নদাপ্রসাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে লালকুঠিতে পা পড়েছে রামমোহন রায়, কালীনাথ রায়চৌধুরী, দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিদের। পরবর্তীকালে আচার্য প্রফুল্ল রায় (Prafulla Chandra Roy), মেঘনাদ সাহা (Meghnadh Saha) প্রমুখ অনেকেই এই বাড়িতে এসেছেন। এসেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও (Rabindranath Tagore)। লালকুঠিতে রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ উঠলে কয়েকবছর আগেও আবেগমথিত হয়ে যেতেন লালকুঠির বাসিন্দা সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। 

    মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, পরবর্তীকালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত চন্দননগরের (Chandannagar) গঙ্গাতীরে ‘রিভারভিউ’ বাড়ির মালিক ছিলেন এই তেলেনিপাড়ার জমিদাররা। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির (Jorasanko Thakurbari) সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক অনেকদিনের। পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র ধরেই তেলেনিপাড়ার তৎকালীন জমিদার সত্যবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লালকুঠিতে বার তিনেকের আগমন ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ তেলেনিপাড়ার কথা মনে রেখেই ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের নায়ক মধুসূদনের মায়ের বাড়ি এই তেলেনিপাড়াতেই রেখেছেন।

    তখন সারা পৃথিবী জোড়া খ্যাতি তাঁর। তিনি বিশ্বকবি। এর মাঝে ‘নবসঙ্ঘ’ পত্রিকার ১৩৪২ বঙ্গাব্দের ১০ ফাল্গুন সংখ্যায় প্রকাশিত হল,

    “গত সপ্তাহে বোলপুর যাইবার পথে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ চন্দননগরে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম করিয়া যান। জমিদার শ্রী সত্যবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লালকুঠি’তে তিনি সমাদরে অভ্যর্থিত হইয়াছিলেন।”

    আবার ‘Daily News’ পত্রিকায় সংবাদটি এভাবে প্রকাশিত হয়েছিল,

    “The poet Tagore on his way to Santiniketan took his midday rest at Lalkuthi.”

    এর আগে ২১ বৈশাখ, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে অক্ষয়তৃতীয়ার দিনেও রবীন্দ্রনাথ ‘প্রবর্তক’ সঙ্ঘে যাওয়ার পথে এখানে এসেছিলেন প্রথমবার।

    কবিগুরুর তেলেনিপাড়ায় আগমন নিছক বসবাসের জন্য নয়। বরং একটা পুরোনো সম্পর্ককে জিইয়ে রাখার তাগিদ বলা যেতে পারে। প্রথমবার ৪ মে, ১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তক সঙ্ঘে অক্ষয়তৃতীয়ার মেলার দ্বারোদ্ঘাটন উপলক্ষে চন্দননগরে এসেছিলেন। চন্দননগরে প্রবেশের আগে জি.টি.রোডে তেলেনিপাড়ার অধিবাসীরা তাঁকে মোটর গাড়ি থেকে নামিয়ে সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন।

    “জুন মাসের দারুণ গরমে আমরা ভীড়ের মধ্যে অস্থির হয়ে উঠলেও কবি তালপাখার হাওয়ার আশ্রয়ে একাসনে স্থিরভাবে বসে তাঁর ধৈর্যের, সঙ্গীতপ্রিয়তার ও আমাদের প্রতি যে গভীর স্নেহের পরিচয় দিয়েছিলেন সে পরিচয় দান তাঁর মতো মহামানবের পক্ষেই সম্ভব।”

    দ্বিতীয়বার ১৯৩৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বোলপুর (Bolpur) যাওয়ার পথে লালকুঠিতে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিয়েছিলেন। ‘প্রবর্তক’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল:

    “আমাদের মনে পড়ে সেবার শান্তিনিকেতনে যাইবার পথে রবীন্দ্রনাথ ফরাসী চন্দননগরের উপকণ্ঠে ‘লালকুঠি’তে তেলেনিপাড়ার জমিদার শ্রী সত্যবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের গৃহে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। গৃহস্বামী দ্বিতলে সুসজ্জিত হলঘরে কবির বিশ্রামের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি উপরে উঠিতে নাচার। ...গাড়ির মধ্যে বসেই লালকুঠির দক্ষিণ পশ্চিমের সুন্দর শান বাঁধানো ঘাটযুক্ত পুষ্করিণীর দিকে চাহিয়া বলিলেন- “বাঃ তোমার ঐ লিচুবনের ওপাশে ফুলবাগানের ধারে বেশ সুন্দর সরোবর বানিয়েছ ত’। চলো ঐ দিকে গাছতলায় তোমার ঐ  ঘনসবুজ কুঞ্জবনের শীতল ছায়ায় এখন বিশ্রাম নেওয়া যাক।”

    সত্যসত্যই রবীন্দ্রনাথ লতাকুঞ্জের স্নিগ্ধ পরিবেশে সারা দ্বিপ্রহর কাটিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সত্যবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় রবীন্দ্রনাথের পদস্পর্শপূত স্থানটিতে একটি বেদি নির্মাণ করান।

    এরপর ১৯৩৫ সালেরই মে-জুন মাসে কবিগুরু যখন চন্দননগরে পাতালবাড়িতে (Chandannagar Patalbari) ছিলেন, তখন সত্যবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের সম্বর্ধনার আয়োজন করেন এই লালকুঠিতেই। একটি চমৎকার মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এতে টপ্পাগানের পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীতেরও ব্যবস্থা ছিল, ‘বিদ্যাসু্ন্দর’ যাত্রাপালার অভিনয় হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন বহু রবীন্দ্র অনুরাগী। সেদিনের অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে গৃহকর্তা সত্যবিকাশবাবু লিখেছেন,

    “জুন মাসের দারুণ গরমে আমরা ভীড়ের মধ্যে অস্থির হয়ে উঠলেও কবি তালপাখার হাওয়ার আশ্রয়ে একাসনে স্থিরভাবে বসে তাঁর ধৈর্যের, সঙ্গীতপ্রিয়তার ও আমাদের প্রতি যে গভীর স্নেহের পরিচয় দিয়েছিলেন সে পরিচয় দান তাঁর মতো মহামানবের পক্ষেই সম্ভব।”

    কেমন ছিলেন ঘরোয়া রবীন্দ্রনাথ? সে প্রসঙ্গে সত্যবিকাশবাবু লিখেছেন,

    “কবি যদিও এ বাড়ির গৃহিনীকে নানারকম মুখোরোচক খাদ্যের ও পানীয়ের ফরমাশ করেছিলেন এবং কৌতূকের জন্য গৃহিণী যখন ফরমাশ মতো সবকিছু প্রস্তুত করে তাঁর সামনে হাজির করেছিলেন তখন তো তিনি অবাক! কবি সব দেখে হেসে বললেন ‘যা চাইব সব পাব জানলে বাঘের দুধের ক্ষীরটা করতে বলতাম’। এরকম হাস্য পরিহাসের মধ্যে ঠাকুরের দৃষ্টি ভোগের মতো কবির পান ও ভোজন শেষ হল। অনেক রাত্রে তিনি চন্দননগরে ফিরে গেলেন। শারীরিক কষ্ট ও আমাদের সমস্ত স্নেহের উপদ্রব হাসিমুখে সহ্য করে সেদিন তিনি আমাদের চিরস্নেহ পাশে বেঁধে গেলেন।”

    সত্যবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্রই হলেন সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কাছেই শুনেছিলাম ঠাকুরবাড়ি আর শান্তিনিকেতনের (Shantiniketan) কথা। সেও প্রায় বছরখানেক আগে। সত্যজিৎবাবু এখন ইহলোক ত্যাগ করেছেন। তাঁর মুখেই শুনেছিলাম, লালকুঠিতে জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বভারতীর অধ্যাপক ও রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ আচার্য প্রবোধচন্দ্র সেনের স্মৃতিও। তিনি সত্যবিকাশ বাবুর গৃহশিক্ষক হিসেবে লালকুঠিতে দুবছর কাটিয়েছেন। এখানেই রচনা করেছেন ‘বাংলা ছন্দে রবীন্দ্রনাথের দান’ ও ‘ছন্দগুরু’ রবীন্দ্রনাথ নামের বইদুটি।

    লালকুঠির বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সঙ্গে নিবিড় যোগ ছিল রবীন্দ্রনাথের‍। সত্যজিৎবাবু বলেছিলেন, শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন তিনি। তখন বেশ ছোটো।  উত্তরায়ণে থেকেছেন। রবীন্দ্রনাথ যে গাড়িতে চড়তেন, সেই গাড়িতে চড়ে ঘুরিয়েছিলেন শিশু সত্যজিৎকে। সম্পর্কের সূত্র ধরে সুনয়নীদেবীর কথা উঠে আসে। তিনি ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Abanindranath Tagore) বোন। সত্যজিৎবাবুর স্ত্রীর ঠাকুমা। অবন-গগন ঠাকুরের ঘরানায় নয়, নিজের আলাদা স্টাইলে ছবি আঁকতেন সুনয়নীদেবী (Sunayana Devi)। মূলত ঠাকুর-দেবতার ছবি আঁকতেন। লন্ডনের রয়্যাল আর্ট গ্যালারিতে ওঁর ছবি আছে। ছোটোবেলাতে উত্তরায়ণেই দেখেছেন ইন্দিরাদেবী চৌধুরানিকে। ঝাপসা নয়, বরং স্পষ্ট মনে পড়ে তিনি রোজ গান গাইতেন। রবি ঠাকুরের সব থেকে প্রিয় ভাইঝি। আজও মনে পড়ে তাঁর চলাফেরা, কথা বলার আভিজাত্য। ‘শেষের কবিতা’-য় উল্লিখিত কালচারের মূর্ত প্রতীক যেন। সত্যজিৎবাবুর স্মৃতিতে ছিলেন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তখন তিনি বিশ্বভারতীর উপাচার্য। বাবা এত বড়ো মাপের মানু্ষ হলেও ছেলে খুব সাদামাটা ভাবেই থাকতেন।

    তবে লালকুঠিতে স্মৃতি একাকী দীর্ঘশ্বাস ফেলে না, বা গুমরে গুমরে কাঁদে না। বরং সযত্নে লালিত ইটের গাঁথনিতে স্মৃতি যেন বহাল তবিয়তে ঘোরাফেরা করে। এখনও সেখানে কবিগুরুর সঙ্গে পারিবারিক ফটোগ্রাফে গুরুদেব উপস্থিত। সত্যবিকাশবাবুর বাঁধানো বেদিতে বা সেদিনকার ‘বিদ্যাসুন্দর’ অভিনয়ের উঠোনে চোখ বুজে অনুভব করা যায় কবিগুরুর উপস্থিতি। তাতে স্মৃতি অনায়াসে মশগুল হয়ে ওঠে একালের মানবাত্মার মূর্ত প্রতীককে একটিবার ছুঁয়ে দেখতে।    

     

    পাঠঋণঃ ভদ্রেশ্বর অঞ্চলের ইতিবৃত্ত, শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    ছবি ঋণঃ সত্যরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়

     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @