No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    রবীন্দ্রনাথ ও বর্ণকুমারী : ৮০ বছরের ভাইকে ফোঁটা দিলেন ৮৪ বছরের দিদি

    রবীন্দ্রনাথ ও বর্ণকুমারী : ৮০ বছরের ভাইকে ফোঁটা দিলেন ৮৪ বছরের দিদি

    Story image

    সে অনেককাল আগের কথা। ১৮৭৬ সাল। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ভাইফোঁটার উৎসব হচ্ছে। ব্রাহ্ম পরিবার। স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি। পুতুলপুজো বন্ধ হয়েছে অনেকদিন। তবু হিন্দু লৌকিক কিছু উৎসব রয়ে গিয়েছে নস্টালজিয়া নিয়ে। ভাইফোঁটাও ঠাকুরবাড়িতে সেই গোত্রেরই মঙ্গল অনুষ্ঠান। সেবার পনেরো বছরের রবীন্দ্রনাথ আর সতেরো বছরের সোমেন্দ্রনাথ বসেছেন দিদি সৌদামিনীর থেকে ফোঁটা নিতে। দিদিকে প্রণাম করে প্রণামী হিসেবে টাকাও দিয়েছেন সৌদামিনীদেবীকে। কিশোর রবি টাকা কোথায় পাবেন? মাতৃহীন কিশোরকে অর্থ দিয়েছেন আরেক কিশোরী বধূ, কাদম্বরী দেবী। দুই কিশোর দেওরের হাতে নিজের মাসোহরার কিছু অর্থ তুলে দিয়েছেন। রবীন্দ্রভবনে রাখা ঠাকুরবাড়ির ক্যাশবইতে এই হিসেব লেখা রয়েছে এখনও। এই ঘটনাটি ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের মধুর স্মৃতিকে ছুঁয়ে আছে। দিদি, বৌদিদিদের সাহচর্যে রবীন্দ্রনাথের নির্মল কিশোরবেলার একটি ফ্রেম মনের মধ্যে জেগে ওঠে। 

    সৌদামিনী, সুকুমারী, শরৎকুমারী, স্বর্ণকুমারী ও বর্ণকুমারী — রবীন্দ্রনাথ-এর এই পাঁচ দিদি। ব্যস্তসমস্ত বিখ্যাত ভাইটি কোনো না কোনো দিদির হাত থেকে ফোঁটা নিতে পেরেছিলেন বিভিন্ন সময়। তবে সব উৎসবের ঘটনার তো হদিশ পাওয়া যায় না। কিছু কিছু প্রকাশিত ঘটনা প্রাচীন, ম্লান হয়ে যাওয়া স্মৃতির প্রদীপ উস্কে মনটা আলোমাখা করে দেয়। ঠাকুরবাড়িতে ভাইবোনের মধ্যে দৃঢ় বাঁধন ছিল বরাবর। ১৮৮৬ সালে রীতিমতো ‘ভাই বোন সমিতি’ ছিল ঠাকুরবাড়িতে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছন্দে গেঁথে রেখেছিলেন উদ্যোক্তাদের নাম—

    ‘হিতু নীতু ক্ষিতু কৃতু, সুরেন বিবি, বলু সুধী/ জ্যোৎস্না সরলা— কি আর বলব— সর্বগুণে গুণে গুণাম্বুধি।’ অনেক পরে পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়িতে ‘ভাই বোন সংঘ’ গড়ে উঠেছিল। এমনি অনেক ভাইবোনের বন্ধন অদৃশ্য সম্পর্কের সুতোয় জড়িয়ে ছিল অগোচরে। যা বলছিলাম, রবীন্দ্রনাথের ভাইফোঁটার গল্প। ১৯৩৯ সালে আরেকটি ভাইফোঁটার গল্প লোকমুখে প্রচলিত। ভাইবোনেদের মধ্যে তখন বেঁচে রয়েছেন দুজন—রবীন্দ্রনাথ আর বর্ণকুমারীদেবী। বৃদ্ধ, অশক্ত শরীরে ভাইয়ের কাছে যেতে পারেননি রবি ঠাকুরের ছোটোদিদি। তবে স্নেহাশীষ নিয়ে চিঠির শব্দরা আসে—

    ‘ভাইটি আমার, শুনলুম তুমি জোড়াসাঁকোয় এসেছ, সেইখানে গিয়ে ভাইফোঁটা দেবো ভেবেছিলুম কিন্তু হলো না, -----------

    ধিরেন নামে একজন চেনা লোক পেলুম তাকে দিয়ে সব আনিয়ে পাঠালুম কবির যা প্রিয় জিনিস তাই দিলুম আমি বড় তোমায় কিছু পাঠাতে হবে না। আশা করি তুমি ভাল আছ। ধানদূর্বা ফুল দিয়া আশীর্বাদ করিলাম কিন্তু দেখা হল না এই দুঃখ। ইতি বর্ণ।’

    চিঠির উত্তরের শব্দগুলি যেন নতজানু এক ভাইয়ের প্রণাম। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন উত্তরে—

    ‘ভাই ছোড়দি তোমার ভাইফোঁটা পেয়ে খুশি হয়েছি। আমাদের ঘরে ফোঁটা নেবার জন্য ভাই কেবল একটি মাত্র বাকি আর দেবার জন্য আছেন এক দিদি। নন্দিনী তোমার প্রতিনিধিত্ব করেছে। আমার প্রণাম গ্রহণ করো। ইতি ১৪/১১/৩৯ তোমার রবি।

    রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর দাদাদের যত ঘনিষ্ঠতা ভাববিনিময়ের গল্প শোনা যায়, দিদিদের সঙ্গে নৈকট্যের কথকতা সেইভাবে জনশ্রুতি হয়নি। সৌদামিনীদেবী একসময়  ঠাকুরবাড়িতে গৃহিণীর মতো সংসার সামলেছেন। সৌদামিনী দেবেন্দ্রনাথের খুব যত্ন করতেন। কিন্তু অপৌত্তলিক দেবেন্দ্রনাথকে লুকিয়ে অন্দরমহলে নিজের ঘরে কৃষ্ণপূজাও করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিয়ের দিন সৌদামিনীর স্বামী হঠাৎ মারা যান। সে কাহিনি সকলের জানা। সৌদামিনীর লেখা ‘পিতৃস্মৃতি’ একটি ঐতিহাসিক দলিল। সুকুমারীদেবী অকালে মারা যান। সুকুমারীদেবীর বিয়ে হয়েছিল শালগ্রাম শিলা বর্জন করে। এই বিয়ে হিন্দুসমাজে আলোড়ন তৈরি করেছিল। স্বর্ণকুমারীর বিদূষী কলমের প্রশংসা রবীন্দ্রনাথ করেছেন, তবে ভাই বোনের খুব ঘনিষ্ঠতার হদিশ মেলে না। স্বর্ণকুমারীর গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। শরৎকুমারীর ঝোঁক ছিল রান্না আর রূপচর্চায়। তিনি অনেকসময় রূপটান মেখে স্নানঘরে রূপচর্চায় মগ্ন থাকতেন। তাঁর গায়ের রং ছিল দেখার মতো। লোকে বলত, ‘দুধে আর মদে।’ বর্ণকুমারীও ছিলেন ঘরোয়া। অভিনয়ে অল্পবিস্তর উৎসাহ ছিল। দীর্ঘায়ু ছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথকে শেষ ভাইফোঁটা তিনিই দিয়েছিলেন। 

    রাণী চন্দ ‘গুরুদেব’ বইতে এই ভাইফোঁটার বর্ণনা লিখে গিয়েছেন। ১৯৪০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কালিম্পং থেকে কলকাতায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে। এমনি সময় এসে গেল ভাইফোঁটার পূন্য তিথি। আশি বছরের ভাইকে ফোঁটা দিয়ে আশীর্বাদ করলেন চুরাশি বছরের দিদি। গৌরবরণ একটি শীর্ণ হাতের শীর্ণ আঙুল স্পর্শ করল অসুস্থ পৃথিবীবিখ্যাত ভাইয়ের কপাল। দুজন দুপাশ থেকে ধরে রেখেছিলেন বর্ণকুমারীকে। তারপর ভাইয়ের বুকে মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহাসক্ত দিদি খুব বকলেন। বৃদ্ধ ভাইয়ের অসুস্থতার মূল কারণ নাকি কালিম্পং যাত্রা। নাহলে অসুস্থ হওয়ার কোনো কারণ আছে নাকি? বললেন, ‘দেখো রবি তোমার এখন বয়স হয়েছে, এক জায়গায় বসে থাকবে, অমন ছুটে ছুটে আর পাহাড়ে যাবে না কখনও। বুঝলে?’ রবি ঠাকুর এই বকুনি শুনে কৌতূকে পরিপূর্ণ এক গাম্ভীর্য নিয়ে বলেছিলেন, ‘না আর কখনও ছুটে ছুটে যাব না, বসে বসে যাব এবার থেকে।’ তারপর শুরু হল ভাইবোনের কথালাপ। রোগশয্যায় এল উৎসবের আমেজ। তারপর প্রণাম পর্ব। দিদিকেই পা তুলে দিতে হবে। নাহলে অশক্ত ভাই প্রণাম করবেন কেমন করে? দিদি বললেন, ‘থাক, এমনিতেই হবে, তোমাকে আর পেন্নাম করতে হবে না কষ্ট করে।’ এরপর আদরে, আশীর্বাদে ভাইকে ভরিয়ে দিয়ে দুজনের হাতে ভর দিয়ে বেরিয়ে গেলেন বর্ণকুমারী। আর কোনোদিন তাঁর ভাইফোঁটা দেওয়া হবে না। 

    জীবনের স্মৃতির টুকরোই রয়ে যায় যশ, প্রতিপত্তি সব কিছুকে পিছনে ফেলে। রবীন্দ্রনাথের জীবনের সব প্রতিষ্ঠার পাশে এই যে বৃদ্ধবয়সে স্নেহ পাওয়ার স্মৃতি তার মূল্যও কিছু কম নয়। যমের দুয়ারের কাঁটা একসময় সরে যায়। মৃত্যু তো অমোঘ। কিন্তু স্মৃতি অমলিন। আজ সেই স্মৃতির কথকতা রইল।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @