নজরুল সংগীতে বিপ্লব আনল বাংলাদেশ

“আমার গান প্রায় প্রত্যহই কোনও না কোনো আর্টিস্ট রেডিও-তে গেয়ে থাকেন। এবং আমার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যবশত তা শুনেও ফেলি। এক উমাপদ ভট্টাচার্য্য মহাশয় এবং ক্কচিৎ দু’একজন গাইয়ে ছাড়া অধিকাংশ ভদ্রলোক বা মহিলাই আমার গান ও সুরকে অসহায় ভেবে (বা একা পেয়ে) তার পিণ্ডি এমনি করেই চটকান, যে মনে হয়, ওর গয়া লাভ ঐখানেই হয়ে গেল। সে একটা রীতিমতো সুরাসুরের যুদ্ধ।”
কাজী নজরুল ইসলাম এই কথাগুলি লিখেছিলেন ‘নবশক্তি’ পত্রিকায়, ১৯২৮ সালের ২০ আগস্টের সংখ্যায়। লেখার ছত্রে ছত্রে ঝরে পড়ছে ক্ষোভ এবং বিরক্তি – সেকালের গায়করা যেভাবে তাঁর গান ইচ্ছেমতো বিকৃত করতেন, তার বিরুদ্ধে। নিবন্ধের শেষে খেদের সঙ্গে বলছেন, “বেতারের গাইয়ে-গুণীজন যাঁরা আমার গান দয়া করে গেয়ে থাকেন, তাঁরা আর একটু দয়া করে গানগুলোর মোটামুটি সুর ও গানের কথা জানবার কষ্ট স্বীকার করেন না।”
খায়রুল আনাম শাকিল এবং মাসুদা আনাম কল্পনা
সীমান্তের দু’পারে আজও নজরুল-ভক্তেরা কেবল নিজেদের জাহির করতে বিকৃতি ঘটিয়ে থাকেন তাঁর গানে। নজরুল ব্যথিত হওয়া সত্ত্বেও একাজ বন্ধ হয়নি। এই নিয়ে বিতর্কও থামেনি। রবীন্দ্রসংগীতেও ‘পরীক্ষানিরীক্ষা’ এবং ‘উদ্ভাবন’-এর নামে এমন ঘটনা আকছার দেখে থাকি। পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক করার লোকের অভাব নেই, যা প্রায় হিস্টিরিয়ার পর্যায়ে চলে গিয়েছে।
“এখনকার প্রজন্মের জন্য কেন নজরুল সংগীতকে পাল্টাতে হবে? যেভাবে মূল গানটি তৈরি হয়েছিল, সেই মতো কেন তারা মানসিকতা বদলাতে পারবে না? তরুণদের আকৃষ্ট করতে আমরা কি বিঠোফেনের সংগীত কখনও বদলে ফেলি?” এমনই প্রশ্ন তুলে ধরেছেন খায়রুল আনাম শাকিল। বাংলাদেশে নজরুল সংগীত চর্চার তিনি এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব। প্রসঙ্গত, এপার বাংলায় যাকে নজরুলগীতি বলি, সেই গানই ওপার বাংলায় পরিচিত নজরুল সংগীত নামে।
২০১৮-র নভেম্বরের একটি কর্মশালার বিজ্ঞপ্তি
শাকিলের স্ত্রী মাসুদা আনাম কল্পনাও এক প্রসিদ্ধ নজরুল সংগীত শিল্পী। কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা নজরুল সংগীতের বিশুদ্ধতা নতুন করে তুলে ধরার ব্রত নিয়েছেন। মূল গানগুলো তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও অন্যতম উদ্দেশ্য। এই কাজে যথেষ্ঠ অগ্রসর হয়েছে তাঁদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ নজরুলসংগীত সংস্থা’ বা ‘বিএনএসএস’। মূল রীতি বজায় রেখেই গানগুলি জনপ্রিয় করে তুলেছেন। ১৯৪২ সালের আগের রীতিকেই গ্রহণ করেন তাঁরা। সেবছরই অসুস্থ হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন নজরুল। এরপর বিদ্রোহী কবির মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যায়।
কল্পনা জানান, নজরুল সংগীতের মূল স্বরলিপির একটি সংগ্রহ তৈরি করছে এই সংস্থা। গুগল ড্রাইভে আপলোড করেছে, যে কেউ সেগুলো পেতে পারেন। এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৫০০ গান রয়েছে। মূল গানগুলোর ইউটিউব লিংক রাখা আছে একটি স্প্রেডসিটে। শাকিল, কল্পনা এবং সংস্থার সদস্যরা তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের সেগুলি অনুসরণ করতে উৎসাহ দেন। সিরাজ শনাই একটি ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করেন, পুরোনো রেকর্ডিংয়ের প্রচুর গান রয়েছে সেখানে, বেশ কিছু নজরুলের সময়ে গাওয়া।
এছাড়াও অনলাইনে বাংলাদেশের জেলায় জেলায় ওয়ার্কশপ এবং ক্লাসের আয়োজন করে তাঁদের সংস্থা। নজরুল কীভাবে গান রচনা করতেন, তার সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের পরিচয় ঘটানো হয়। শিল্পীরা কীভাবে গেয়ে আসছেন, তা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখনকার ‘ফিউশন’ শিল্পীদেরও বাদ রাখা হয়। শাকিলের মতে, “‘এ কী অসীম পিয়াসা’ গানটিকেই ধরা যাক। তিলং রাগে তিনতালে বাঁধা। একটা টিভি শো-তে আমি দেখেছি পশ্চিমি ড্রামে ৪×৪ বিটে এই গান গাওয়া হচ্ছে। এটা কোনো ফিউশন বা নতুনত্ব নয়, গানের রীতিকেই পাল্টে দেওয়া। অশ্রদ্ধা ছাড়া কিছুই বলা যায় না একে।”
সার্টিফিকেট প্রদান
ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই উদ্যোগ কতটা গ্রহণযোগ্য? কল্পনার মতে, বিখ্যাত শিল্পীদের গাওয়া গান ভোলানোই সবথেকে বড়ো চ্যালেঞ্জ – “একবার যদি দক্ষ শিল্পীর গলায় বিকৃত গান শোনেন, তাকে মাথা থেকে বের করা কঠিন।” শাকিল জানান, “পড়ুয়ারা যথেষ্ঠই উৎসাহী। যদিও সব সময় তাদের কাছে আমরা শিক্ষকরা পৌঁছতে পারি না। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল আমাদের সংগীত এবং সংস্কৃতিকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন, তা ছাত্রছাত্রীকের কাছে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব।”
নজরুল ছিলেন হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী সংগীতে পারদর্শী। নিজে প্রায় ১৮টি রাগ সৃষ্টি করেছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সেগুলোকে জনপ্রিয় করা সুযোগ পাননি। গানের নানা ধারায় অবাধে বিচরণ করতেন – গজল হোক বা ঠুংরি, শ্যামাসংগীত হোক বা কীর্তন। কল্পনা জানান, “এইসব ধারা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা আমাদের অনেক আগেই নজরুল করেছেন। সেই ব্যাপারে পুরোপুরি জানতে হবে। নইলে কী ধরনের ফিউশন আপনি তৈরি করবেন?”
ছাত্রীদের সঙ্গে মাসুদা আনাম কল্পনা
পশ্চিমবঙ্গে নজরুলগীতি শিল্পীর সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। বাংলাদেশে কিন্তু তেমনটা নয়। সেখানে অনেক শিল্পী নজরুল সংগীত ছাড়া কিছু পরিবেশন করেন না। নজরুল ছিলেন সর্বাত্মকভাবে মৌলবাদ বিরোধী, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঘোর সমালোচক। রাজদ্রোহের অপরাধে একাধিকবার জেল খেটেছেন। ভারত এবং বাংলাদেশের বিপ্লবী তথা স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন তাঁর সৃজনে। আজও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক। শাকিল তাই বলেন, “নজরুলের থেকে দূরে সরলে চলবে না। বরং তরুণ প্রজন্মকে তাঁর আরও কাছে পৌঁছতে হবে”।