No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    পুজোশিল্প

    পুজোশিল্প

    Story image

    বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত শ্রী সুদীপ্ত সেনগুপ্ত’র কলকাতার দুর্গাপুজো শিল্প নিয়ে অত্যন্ত মনোজ্ঞ প্রবন্ধটিতে যারপরনাই আলোকিত হওয়া গেল। কলকাতার দুর্গাপুজো প্রাঙ্গন বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে যেভাবে সজ্জিত হচ্ছে তাঁর শিল্পগুণ বা নান্দনিক সৌকর্য নিয়ে শ্রী সেনগুপ্ত বেশ মাথা ঘামিয়েছেন তা বোঝা গেল। যে পরিপ্রেক্ষিতে তিনি লেখাটি লিখেছেন বহুলাংশে তার যথার্থতা আছে বলেই মনে করি। যদিও লেখার শেষে উনি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত বলে ঘোষণা করেছেন তাই আমার এই লেখাটি ওনার পাল্টা লেখা হিসাবে গণ্য না হলেই ভালো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেহেতু আমার খটকা লেগেছে এবং আমি কলকাতার দুর্গাপুজোর সঙ্গে বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে যুক্ত আছি তাই আমার এই খটকা দূর করার অভিপ্রায়ে শ্রী সেনগুপ্ত'র কাছে ক'টি প্রশ্ন রাখি- ১) একবারেই ব্যাক্তিগত অভিমত যখন জনমত নির্দিষ্ট প্রচার আঙিনায় এনে ফেলাই হল, তখন সাহসিকতা বা দুঃসাহসিকতার বিনয়ের প্রয়োজন কেন?

    ২) লেখা শেষে যখন ব্যাক্তিগত মতামতের ঘোষণা আছে সেখানে 'আমাদের বক্তব্য হল-' লেখার অবতারণা কি শুধু ব্যাকরণের নির্দেশে, না কি কোনও বিশেষ মতাবলম্বীদের প্রতিনিধিত্বের অভিপ্রায়ে বোঝা গেল না।

    ৩) কলকাতার সব দুর্গাপুজোকে 'শিল্প' বা 'উচ্চমানের শিল্প' বা 'আর্ট' এই শব্দবন্ধে অভিহিত ব্যক্তিগত ভাবে কেউ কেউ করে থাকেন, কিন্তু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, নিয়মিত শিল্পচর্চায় যুক্ত কেউ এখনও দাবি করেছেন বা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এমনটা আমার শোনা হয়নি। পুজো মাঠে আমার বিগতদিনের কাজগুলো আমার শিল্পচর্চার সমান্তরাল প্রচেষ্টা বলে মনে করি এবং প্রতিমুহূর্তে তাঁর প্রসারতার লক্ষণ এবং বৈচিত্রকে অনুধাবন করার চেষ্টা করি। আমার এই চর্চা অবশ্যই স্টুডিও এবং গ্যালারির গণ্ডিকে প্রসারণের উদ্দেশ্যেই আমি করে থাকি। শিল্পবেত্তারা তার প্রাসঙ্গিকতা বা অপ্রাসঙ্গিকতা খুঁজবেন ভবিষ্যতে সেটাই স্বাভাবিক। যেহেতু দুর্গাপুজোর প্রাঙ্গণ সজ্জা প্রাথমিকভাবে আমজনতার রুচিবোধের উপর নির্দেশিত, তাই তার গ্রহণ বা বর্জনের দায় তাদের সঞ্চয়ের উপরই নির্ভরশীল। (এখানে 'সঞ্চয়' বলে bank balance ধরবেন না আশা করি) ফলে দুর্গাপুজোর কাজকে কে বা কারা 'আর্ট' বলল সেটি চিহ্নিত করা দুষ্কর, তবে এই 'আর্ট' প্রণেতাদের কয়েকজনকে জানতে পারলে তাদের সঙ্গে কলকাতার দুর্গাপুজোর ভূতভবিষ্যৎ নিয়ে একটু আলোচনা করা যেত।

    ৪) সুন্দরের সংজ্ঞা দেওয়া বা তাত্ত্বিক আলোচনা না করার অছিলাতেও দক্ষিণ কলকাতার একটি পুজোর অঙ্গসজ্জার বিবরণ দিয়েছিলেন শ্রী সেনগুপ্ত। রাসবিহারী মোড়ের কাছে বাদামতলা আষাঢ় সঙ্ঘের এই পুজোর কাজ এ বছর করেছিলেন সরকারী চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের এবং বিশ্বভারতী কলাভবনের প্রাক্তনী শ্রীপূর্ণেন্দু দে। শ্লেষ বা অসুন্দর বাক্য প্রয়োগকালীন আড়ালে থাকা খুব একটা শোভনীয় নয়। উল্লেখ করি এই পূর্ণেন্দু দে-রই ভাবনায়, তথাকথিত 'প্লাইউডের কাটআউট-এ রংঢঙ মাখিয়ে' গত ২০১৬-তে বাদামতলার পাশের পুজো ৬৬ পল্লিতে কলকাতা শহরের স্কাইলাইন নির্ভর একটি কাজ হয়েছিল - আমজনতা, শিল্পীমহল, শিল্পসমালোচক, সাংবাদিক, ক্লাবকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, ডেকরেটর, অটোচালক, পৌরপ্রতিনিধি, নাবালক, সাবালক- কাউকেই সেই কাজটিকে অসুন্দর বলতে শুনিনি।

    পুজোমাঠের কাজ যথেষ্ট পরিমাণে মেধা ও কায়িক শ্রমের ফসল। তা প্রতিবারই যে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এমন বলা যায় না। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি এই জাতীয় সাংগঠনিক দৃশ্যধর্মী কাজ সঞ্চিত দৃশ্যস্মৃতি, প্রশিক্ষণ, ভৌগলিক অবস্থান, ক্লাবকর্তাদের সহযোগিতা, অর্থের এবং লোকবলের যোগান এবং সুষ্ঠুপ্রচার ব্যবস্থার যৌথ ফসল।

    কলকাতার বিভিন্ন আর্ট গ্যালারিতে বছরে ৩৬৫ দিন শিল্প প্রদর্শনী হয়ে থাকে। তার পাঁচ শতাংশও যদি উৎরে যেত তাহলে বাংলার সংস্কৃতির ভাণ্ডার স্ফীত হত সন্দেহ নেই। তবে বিচারকেরা গম্ভীর হয়ে থাকবেনই তো, কারণ তাদের বিচারব্যবস্থার উপর যে ভারতশিল্পের অভিভাবকত্ব বর্তায় না। গুটিকয় ছাড়া তাদের অধিকাংশই মনে হয় আর্ট কলেজের চত্বর ঘেঁষেন না। টেলিভিশন সুন্দর, সুন্দরী, বাংলা সিনেমার পরিচিত মুখ, গুটিকয় বাচিক শিল্পী, প্রাক্তন ফুটবলার, সেনাপ্রধান, নাট্যকর্মী, সঙ্গীতজ্ঞ, সমাজ সংগঠক, কোচিং সেন্টারের মালিক ইত্যাদিদের জড়ো করে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এর ষণ্ডাগণ্ডা কিছু মানুষ মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে থাকেন। বিচার শেষ তারাই বিনা লাইনের ভি.আই.পি পাশ সংগ্রহ করে নিয়ে যান আত্মীয় বন্ধুদের বিলোনোর জন্য। এতো মোচ্ছবের খিচুড়ি লাইন দিয়ে খাওয়ার মতো ব্যাপার। এতে শ্লেষের কি আছে? শ্রী সেনগুপ্তের রাগটা কিসের উপর, প্লাইউডের কাট আউটে আমেরিকা, না গম্ভীর বিচারক না কি ‘আর্ট’ শব্দের অপপ্রয়োগের উপর বোঝা গেল না। বিজ্ঞাপন দাতাদের হাতে সংস্কৃতি তো উৎসর্গীকৃত। তবুও মন্দের ভালো যে টেলিভিশনের ক্যামেরা বাহিনীর প্রচার, বিচার ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞাপন সংস্থার পুরস্কারের মাপকাঠি আর্ট কলেজের সিলেবাসের অন্তর্গত হয়নি এখনও।

    উল্লেখ করি গত ২০১৬ সালে এই কলকাতার এক অন্যতম টেলিভিশন চ্যানেল (এবিপি আনন্দ), ঐ বাদামতলা আষাঢ় সঙ্ঘের ঝুলন্ত ইটের টুকরোর মণ্ডপসজ্জাটিকে শ্রেষ্ঠ 'স্থাপনা শিল্প' বলে পুরস্কৃত করেন। তারপর থেকে মনে হয় আমজনতার একটা ধারণা হয়েছিল যে 'যাহা ঝুলিয়া আছে তাহাই স্থাপত্য'।

    ৫) পুজো মণ্ডপসজ্জার বেশ ক'টি শীর্ষনাম বাতলেছেন সুদীপ্তবাবু। বিগত কয়েক যুগের একটা ধারাবাহিক নির্মাণশৈলীর ইতিহাস রয়েছে কিন্তু কলকাতার দুর্গাপুজোর মণ্ডপসজ্জার। সেটাকে গুলিয়ে ফেললে সমাজ ইতিহাসে তথ্য বিকৃত হয়। শিল্প ইতিহাস না হয় মুখ ঘুরিয়েই রইল। যে কোন সাংস্কৃতিক প্রবাহের সুদীর্ঘ যাপন লাগে। এতো প্রমানিত সত্য। তাই শিল্প আঙিনায় প্রবেশ প্রস্থান এ সবই নির্দিষ্ট হয় নিরন্তর চর্চায়। আমাদের অজ্ঞতা সে চর্চার গর্ভপাতের পক্ষেই সায় দেয়।

    ৬) মায়ের মুখখানি দেখে মন ভরে যাওয়া তো বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের সাক্ষ্য বহন করে। দুর্গা এখানে ঘরের মেয়ে। ভারতের ভিন্ন ভূগোল এ দুর্গার চরিত্র চিত্র কিন্তু ভিন্ন।

    ভারতের মূর্ত বিমূর্ত প্রতিমাকল্পনা শিবলিঙ্গের পাশাপাশি নটরাজেরও জন্ম দিয়েছে। সব প্রতিমাই কিন্তু দেবতার আসনে পূজিত হয় না। শ্রী সেনগুপ্ত প্রতিমাকল্পে বৈসাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করে বড়ই একপেশে মন্তব্য করেছেন। খাস কলকাতাতে বহু প্রতিমা নন্দলাল বসুর ড্রইং থেকে শুরু করে সুনীল পাল, অশোক গুপ্ত, নীরদ মজুমদারের শিল্প স্বাক্ষর বহন করে ধন্য হয়েছে। অসুন্দর-কে অস্বীকারের পাশাপাশি সুন্দর স্মরণ করাও জরুরি।

    ৭) প্রাপ্তবয়স্ক সমাজ তো কদর্য থেকে অতি কদর্য শহর মূর্তিকলাকে মেনে নিয়েছেন। বিদেশি ব্রাণ্ডের পোশাক পরিচ্ছদে স্বাছন্দবোধ করতেও শিখে গেছেন এবং শ্মশ্রুগুম্ফ শোভিত গুরুদেবের নির্দেশে 'আর্ট অফ লিভিং'কেও জীবন যাপনের মাপকাঠি হিসাবে দেখতেও শিখে নিয়েছেন। এতে আলোকিত হওয়ার বা চটে যাওয়ার কারণটা বোঝা গেল না।

    বাংলায় সর্ব শিক্ষা অভিযানের প্রধান যান টেলিভিশন। তাতে যে পরিমাণে অসামাজিক কাজকর্মের খবর প্রচারিত হয় তার তুলনায় শিল্পচর্চার তো কিছুই প্রচারিত হয় না। সেই পুঁজি নিয়ে বাঙালিরর কৌপীনের রশিতে টান দেওয়াতে বেশ আত্মপ্রসাদ আছে বোঝা গেল। এ করে পাবলিককে শিল্প সচেতন করার বৈপ্লবিক শব্দব্রক্ষ্ম অন্তর্জালে মাথা কুটেই মরবে। এতো চটছেন কেন স্যার? বাংলায় ফ্লোরেন্স, প্যারিসের পাশাপাশি অজন্তা ভ্রমণেরও প্যাকেজ আছে। ওখানে কিন্তু মাথার উপর ছবি আঁকা আছে। জনগণ ঘাড় উঁচিয়েই দেখেন। পুজোর ছুটিতে একটু ঘুরে আসুন না এখানকার ‘সাংস্কৃতিক ধ্যাষ্টামো’ এড়িয়ে।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @