কম খরচে মেডিক্যাল টেস্টিং - অগ্রণী গবেষণার জন্য পুরস্কৃত বাংলার বিজ্ঞানী

সমাজ সংস্কারক ও মুক্তিযোদ্ধা গোপাল কৃষ্ণ গোখলে বলেছিলেন, “বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত কাল তা ভাববে।” কথাটা বাংলার গর্বের পক্ষে যথেষ্ট নয় কি! একসময় বিজ্ঞান ও সাহিত্য সহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অগ্রণী ছিল বাংলা। বাংলার সেই ঐতিহ্যের ধারা কিন্তু এখনও অব্যাহত রয়েছে--‘সায়েন্স অফ ইঞ্জিনিয়ারিং’ এবং কম খরচে স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি বিকাশে অনবদ্য অবদান রাখার জন্য চলতি বছরেই ৩০তম জিডি বিড়লা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন অধ্যাপক সুমন চক্রবর্তী।
প্রতি বছরই বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির যে কোনও শাখায় সেরা ও ব্যতিক্রমী অবদানের জন্য ৫০ বছরের কম বয়সী বিশিষ্ট বিজ্ঞানীকে দেওয়া হয় এই পুরস্কার (১৯৯১ সালে প্রবর্তিত)। পুরস্কার কে পাবেন, তা নির্বাচনের দায়িত্বে রয়েছেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স একাডেমির (আইএনএসএ) বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক চন্দ্রিমা সাহা।
অধ্যাপক সুমন চক্রবর্তীর স্কুলজীবন কেটেছে কলকাতার সেন্ট লরেন্স হাই স্কুলে। ১৯৯৬ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতকোত্তর করেন এবং শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানাধিকারী হন। ডেভলপমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড-এর ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইনের উপর অল্পসময়ের কাজের অভিজ্ঞতার পরে, ১৯৯৭ সালে জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা গেট-এ অংশ নেন এবং জাতীয়ভাবে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীকালে, উচ্চশিক্ষার জন্য ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (আইআইএসসি)-এ যান, সেখানে তিনি ‘ফ্যাকাল্টি টপার’ হন (8 জনের মধ্যে সিজিপিএ) এবং ‘মাস্টার্স অফ ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ অসামান্য দক্ষতার জন্য স্বর্ণপদক এবং ভূয়সী প্রশংসা পান।
এরপর, তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০০০ সালে, পড়াশোনার জন্য ছুটি নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডক্টরাল রিসার্চের জন্য আইআইএসসি-তে যোগদান করেন। পিএইচডি শেষ করেন। ২০০২ সালে আইআইএসসি-তে এক বছরের থিসিস-এর কাজের জন্য “বেস্ট ইন্টারন্যাশনাল সিএফডি থিসিস অ্যাওয়ার্ড” পান। অধ্যাপক সুমন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (আইআইটি) খড়গপুরের মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মুখ্য অধ্যাপক এবং বর্তমানে তিনি ওই ইনস্টিটিউটেরই ‘স্পনসরড রিসার্চ অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল কনসালট্যান্সি’র ডিন।
ছোট চ্যানেলগুলির মধ্যে কীভাবে তরল প্রবাহিত হয়, তা নিয়ে পড়াশোনা করার সুবিধার্থে ভারতের একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের অংশ হিসাবে প্রথম ‘মাইক্রো ফ্লুয়েডিক্স ল্যাবরেটরি’ প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব অধ্যাপক সুমনেরই। সবধরনের রক্ত পরীক্ষার জন্য স্বল্পমূল্যের স্পিনিং ডিস্ক, রুটিন রক্ত পরীক্ষার জন্য নির্ভুল কাগজের স্ট্রিপ প্রযুক্তি, এবং রক্ত গণনার জন্য একটি টিউমার-অন-চিপ ডিভাইস সহ বেশ কয়েকটি সাশ্রয়ী মেডিকেল ডিভাইসের পথিকৃৎ তিনি। মাইক্রোবায়াল সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য, ক্যান্সার সেল মাইগ্রেশন এবং কোভিড-১৯ সংক্রমণের (সিভিআইআরএপি) দ্রুত সনাক্তকরণের জন্য নিউক্লিক অ্যাসিড-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিটি ডায়াগনস্টিক সুবিধা বৃদ্ধির জন্য ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তা পূরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া তাত্ত্বিক, গণনামূলক এবং পরীক্ষামূলক মডেলিং সহ মাইক্রো ফ্লুয়েডিক্স এবং মাইক্রো/ন্যানো স্কেল পরিবহন প্রক্রিয়াগুলির পাশপাশি জৈব-চিকিত্সা, জৈব-প্রযুক্তি, চিপ কুলিং এবং শক্তি অন্তর্ভুক্তিকরণ সম্পর্কিত অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে গবেষণার আগ্রহ রয়েছে তাঁর। এই ক্ষেত্রগুলিতে কর্তৃপক্ষ হিসাবে ব্যাপকভাবে কাজ করে চলেছেন তিনি।
অধ্যাপক সুমন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি ‘জে সি সি বোস ন্যাশনাল ফেলোশিপ’ পান, যা ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ ফেলোশিপ। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলি যেমন ব্রিটিশ কাউন্সিল, রয়্যাল একাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউকে, ইন্দো-মার্কিন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংগঠন, জেএসপিএস, জাপান--বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী সংস্থার রিসার্চ-ফান্ডিং পেয়েছেন তিনি। জেনারেল মোটরস, ডেল্ফি, ইনটেল, শেল, টাটা স্টিল, আইটিসি-র মতো নামী শিল্প সংস্থাগুলির পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। আপাতত তিনি এখন নিজস্ব ‘স্টার্ট-আপ’ সংস্থাকে নেতৃত্ব দিয়ে তাঁর গবেষণাকে কার্যকরভাবে প্রয়োজনীয় মেডিকেল পণ্যে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টায় রয়েছেন। তাঁর সংস্থার উদ্দেশ্য- কম খরচে মেডিকেল টেস্টিং-এর অভিনব যন্ত্রগুলি যত শীঘ্র সম্ভব বাজারে আনা।