সুতপা মুখোপাধ্যায়ের নিবিড় কবিতা

My heart broke loose on the wind
— Poetry / Pablo Neruda
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর রাজনৈতিক চাপে কংগ্রেস ছাড়তে বাধ্য হয়ে ফরোয়ার্ড ব্লক দল গঠনকারী ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে পুরোদস্তুর যুদ্ধ ঘোষণা করা আজাদ হিন্দ ফৌজের অবিসম্বাদিত নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন ২৩ জানুয়ারি — এ কথা বাঙালি মাত্রই জানতে বাধ্য। সুতপা মুখোপাধ্যায় নিশ্চয়ই জানেন তার থেকেও অনেকটা বেশি, কারণ তিনি ইতিহাসের অধ্যাপক। নিশ্চয়ই জানেন কলকাতার মেয়র হিসেবে সুভাষচন্দ্রর কিছু ক্রিয়াকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে,বা বৃহত্তর অর্থে,ফাসিস্ত আদর্শ ও শক্তির প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিল কি না তা নিয়ে বিতর্ক অবান্তর নয়। পাছে সুতপার কবিতা নিয়ে এই আলোচনা ইতিহাসের বিতণ্ডায় অনর্থক পর্যবসিত হয়, এই আশঙ্কায় একই নিশ্বাসে জুড়ে দিচ্ছি— সে বিতর্কে আমি কোন পক্ষে তা এখানে অবান্তর, আমি শুধু বলছি বিতর্কটা অবান্তর নয়। এই সবই ২৩ জানুয়ারি তারিখটির অবধারিত অনুষঙ্গ বাঙালি পাঠকের কাছে।
সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন নিয়ে কবিতা লেখা বাঙালি কবির কাছে স্বাভাবিক ছিল কোনো এক কালে। আজ ততটাই স্বাভাবিক তেমন উদ্যোগে ভ্রুকুঞ্চন। আর সেই জন্যেই এ বই হাতে নিয়েই ১৩ নম্বর পৃষ্ঠায় বইয়ের নাম-কবিতায় হাজির হলাম সবার আগে। পড়লাম। তারপর আবার পড়লাম। তারপর আরও একবার। ২৩ জানুয়ারির যে অবশ্যম্ভাবী অনুষঙ্গে আজ কবিতা লিখলে আধুনিক, বা বলা উচিত উত্তর-আধুনিক, বাংলা কবিতাপাঠে আগ্রহী পাঠকের মৃদু বাঁকা হাসি উদ্রেকের আশঙ্কা, তার বিপজ্জনক কিনারে দাঁড়িয়ে সুতপা এই তিন পৃষ্ঠার কবিতাটিতে যে কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন তা রুদ্ধশ্বাস।
কী কাণ্ড? সমস্যা হল গোটা কবিতাটি সম্পূর্ণ উদ্ধৃত না করে তা কোনোভাবেই ভেঙে বলা যাবে না। গদ্যের ব্যখ্যায় কোনো কবিতারই নির্যাস তুলে ধরার কোনও চেষ্টাকে আমি পণ্ডশ্রম মনে করি — কবিতার কথা, কবিতা ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না। তাই আমরা কবিতার অংশ উদ্ধৃত করি। সুতপার ‘তেইশে জানুয়ারি’ কবিতার ক্ষেত্রে তা করতে গেলে বিজ্জনক ভ্রান্ত-প্রতিনিধিত্ব, misrepresentation, হবে। শুধু এটুকু — ২৩ জানুয়ারি বাঙালি পাঠকের কাছে যে অনুষঙ্গ পৌঁছে দেয়, তার সরল-প্রাণ-প্রভাতফেরি-শ্রদ্ধার দ্যোতনাকে চ্যালেঞ্জ না করেই বরং তার সীমানাকে বিপুল বিস্তীর্ণ করে সুতপা তৈরি করেছেন এক ঘটমান কবিতা-প্রান্তর, যার মধ্যে রয়েছে দেশভাগে ছিন্নমূল মানুষ থেকে পুলিশের নজর এড়িয়ে গভীর রাতে জানালায় মৃদু টোকা দিয়ে মায়ের কাছে গুড়-মাখা-রুটি চেয়ে নিয়ে যাওয়া রাজনীতি-স্পর্ধিত ক্ষুধার্ত তরুণের ধারাল গতায়াত। এমন নিখাদ কবিতা পড়ে মনে হয় কবিতা পড়লাম।
এমন নিখাদ কবিতার কিছু অংশ উদ্ধৃত করে তার সারাৎসার হাজির করা কঠিন। আমার মনে হয়, বিশেষ কিছু পঙ্ক্তি ঘিরে কবিতা গড়ে তোলা থেকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কবিতায় করে তুলতে হবে এমন প্রাণপ্রতিষ্ঠা যা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পঙ্ক্তিতে কিছুতেই ধরা যেতে পারবে না। অথচ ঠিক যেমনটা করতেই আমরা দীর্ঘ অভ্যাসী— কবিতাকে চিহ্নিত করতে তার কয়েকটি প্রতিনিধিত্বমূলক লাইন দিয়ে। সে প্রথা ভাঙা দরকার। বিদেশের আজকের অনেক কবি সে চেষ্টায় নিবিষ্ট। বিশেষত পাকিস্তানের সাম্প্রতিক উর্দু কবিতা অনুবাদে বিগত ২০ বছর তন্নিষ্ঠ ভাবে নিয়োজিত থেকে দেখেছি সয়ীদউদ্দিন বা আজরা আব্বাসের মতো কবি তা করছেন। ‘তেইশে জানুয়ারী’ থেকে বইয়ের গোড়ায় ফিরে গিয়ে যতই এগিয়েছি দেখেছি সুতপাও একের পর এক কবিতায় তাই করে গিয়েছেন। সচেতনে কি? জানিনা। সচেতনে কি আদৌ কবিতাসৃষ্টির মুহূর্ত থাকে?
১৯৭০-৮০-র দশকে বাঁকুড়ার সুপ্রাচীন ছোট্ট মফস্বল শহর বিষ্ণুপুর সুতপার শৈশবের শহর, কৈশোরের শহর। তারপর জীবিকার বাধ্যতায় শহর কলকাতা। কবিতা থেকে কবিতায় সুতপা সেই মফুস্সুলে নির্জন দুপুরের, রাত্রি-দিনের, ভোর-গোধূলির ধুলো উড়িয়েছেন বাসন্তী হোলির উৎসবে আঘত ভুলে থাকতে বান্ধবদের সঙ্গে মিলে বিরহীর করুণ অঞ্জলি ভরে বাতাসে ফাগ উড়ানোর মতো। বাঁকুড়ার ধুলো-ফাগ ওড়া অস্বচ্ছ বাতাসে বাতাসে সুতপার হৃদয় গিয়েছে ভেসে। ভুল করার কোনও আশঙ্কা নেই, সুতপার কবিতা আদ্যোপান্ত রোমান্টিক। হৃদয়ে সেলাই করা চিকন-কাজের ছবির পর ছবির পর ছবি। হৃদয়ে ফোঁড়া সূচের প্রতিটা ক্ষত থেকে ঝরা রক্তের ফোঁটা ফোঁটায় আঁকা নক্শিকাঁথা। কিন্তু ফুটে ওঠা ছবিটা আমাকে অনেক্ষণ দেখতে দেয় না সে কবিতা, চোখ ঝাপসা করে—
আরও পড়ুন
বন্দুক ছেড়ে কলম ধরার আখ্যান
ওখানে রূপনারায়ণের সেতুতে দাঁড়াল সে
কাল রাত্রে সে জেনেছে আকৈশোর বন্ধু তার
কী উল্লাসে ভেসে গেছে মোহনার কাছে।
বীরভূমের গ্রামে এখন তীক্ষ্ণ হলাহল
বাবা জানিয়েছে তার কাছে চলে আসতে চায়
ছোটোভাই গুরগাঁও চলে যাবে।
কাল রাত্রে সে জেনেছে তার শরীর
জ্বলে গিয়ে নিভিয়ে ফেলেছে বারুদ
কাল রাত্রে সে নিতে চেয়েছে
নীপাবৌদির বুকে আকন্দ পাতার ঘ্রাণ
এখন এই মুহূর্তে খুলে ফেলে দেবে
বিবর্ণ জিজ্ঞাসা সব — নদীজলে দেখে নেবে মুখ।
(অবগত। পৃ ৩৫)
জাত রোমান্টিক কবিতা নিজেকে অনেক্ষণ দেখতে দেয় না, চোখ ঝাপসা করে, আর জাত কবি মাত্রই জানেন পাঠকের চোখের পাতায় জমে ওঠা এক বিন্দুর কাছে তুচ্ছ কোহিনুর। সুতপার কবিতা পাঠকের ঝাপসা হয়ে ওঠা চোখে পাখনা মেলে স্নান করে।
তবে সুতপার রোমান্টিক কবিতা প্লেটনিক নয়, ত্বকে ফুটে ওঠে বিন্দু বিন্দু যৌনতার শিহরণ। ছোঁয়া যায়। যদিও তা মেলে ধরা হয় দারুণ পরিশীলিত শব্দবন্ধে, যেখানে কোনও বেলেল্লাপনা নেই। ভালোবাসার যৌনতার নিটোল সৌন্দর্যের শিহরণ। যদিও কখনও তা সহসা আমাদের মুখোমুখি করে শরীরী-যৌনতার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিরও। সেটা শক্ —
উর্ধ্ববাহু ছুঁয়েছিল তোমার অঙ্গুলীয়ক বিলাসী আঙুলেরা
অধর ওষ্ঠ মিশেছিল তোমার গোলাপ রংএ
স্বেদবিন্দু ঘিরে তীব্র মোহ জাগে
তোমার উন্মুক্ত ক্ষীণ কটিদেশ ছুঁয়ে যাই বিহ্বল আবেশে।
কতদিন নাকি কতবছর প্রদক্ষিণ সারা হল
পৃথিবীর, রক্তিম অগ্নিপিন্ডকে ঘিরে
জ্যামজট, ক্লেদাক্ত শহরের রাজপথ
সন্তানের হাত ধরে পার হচ্ছ তুমি
মিনিবাসের জানালা থেকে মায়াবী আলোয়
এ শহর ভরে যায় দেখি।
সাজিয়ে রেখেছ বুঝি গৃহস্থালী
আলো নিভে গেলে পাখিদের ঘরে ফেরা কালে
উদ্গ্রীব থাকো তুমি কলিং বেলের শব্দে
নিরাপত্তা, ভরসা, বিশ্বাস।
গভীর রাতে সন্তান ঘুমিয়ে পড়ার পর
জীবনযাপনের অভ্যাসে স্বেদবিন্দু তৈরি কি হয়?
কটিদেশে জমে আছে মেদ
তবু তোমার গোলাপ রংএ কোথাও কি
মিশে আছে পূর্বকথার ইতিবৃত্ত।
(পূর্বকথা। পৃ ৩৭)
পূর্ণচ্ছেদ-চিহ্ন উপচে প্রশ্নই ভেসে থাকে সুতপার কবিতায়। সেটাও কবিতার লক্ষণ, অনুরণন। যার ফলে কবিতা থেকে কবিতায় ঢুকে পড়া যায় আনায়াসে। তবে, এ বইয়ের সব কবিতায় নয়। কবিতা বাছার ক্ষেত্রে আরও কঠোর হতে পারতেন কবি। কদাচ মনে হয়েছে কবিতার থেকে মেদুর শব্দের ইনফ্যাচুয়েশনে পড়েছেন সুতপা — ‘প্রত্যয়’। প্রত্যেক কবিতারই একটা করে নাম আছে, যা নিয়ে আমার একটা একান্ত ব্যক্তিগত আপত্তি আছে — তা পাঠককে বিশেষ পথের দিকে তির-ইঙ্গিত করে, কবিতায় যা কাম্য বলে আমি মনে করি না। কবিতা কুকুর ছানা নয় যে নাম একটা রাখতেই হবে। কিছু লেখা ফিকে ঠেকেছে, বিশেষত অন্যান্য কবিতার চোখে-চোখ-রাখা তীব্রতার পাশে — ‘শিরিষফুল’ কি রাখা জরুরি ছিল? ‘কবিপ্রণাম’-এ ‘ওগো’-তে হোঁচট খেয়েছি, লেগেছে। সুব্রত চৌধুরীর প্রচ্ছদটি আমার খুবই মানানসই মনে হয়েছে। কবিতার প্রকাশকদের বানান সম্পর্কে আপোশহীন সচেতন হতেই হবে — বিলু কেন কোনও পঙ্ক্তিতে বিন্দু হয়ে যাবে, মিতুন মিতুল? তবু সব মিলিয়ে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তটিতে দারুণ জড়িয়ে-ধরা-দু’ হাত টেনে সরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হওয়ার মতো মন নিয়ে ‘তেইশে জানুয়ারী’-র শেষ পাতা উল্টাতে হয়।
তেইশে জানুয়ারী
সুতপা মুখোপাধ্যায়
কৃতি। ৭২ পৃষ্ঠা। মূল্য — ১০০ টাকা