কবি সলিল চৌধুরী

বাবা সলিল চৌধুরীর কবিতা সংগ্রহ হাতে কন্যা অন্তরা চৌধুরী
জলের আরেক নাম জীবন, অপর নাম সলিল। জলের মতোই অবাধ গতিতে বিংশ শতাব্দীতে বাংলা তথা ভারতীয় সংস্কৃতির মঞ্চে যিনি কথায়, সুরে জীবনের জয়গান গেয়ে তুলে ধরেছেন সাধারণ মানুষের কথা, তাদের অধিকারের কথা তিনি সলিল চৌধুরী (Salil Chowdhury)। তাই, সমকালীন যুগের চাহিদা মিটিয়ে তাঁর সৃষ্টি অতিক্রম করেছে দেশ কাল সীমানার গণ্ডি। সুরের জগতে তিনি বিশ্ব নাগরিক। বিপ্লবের আহ্বান হোক বা ছোটোদের গান — সলিল চৌধুরীর কথায় এবং সুরের ঝরনাধারায় সব গানই হয়ে উঠেছে কালজয়ী। তবে, সলিল চৌধুরীর প্রাক জন্ম শতবর্ষে সলিল সাগরের সৃষ্টির নতুন আরেক ঢেউয়ে আবার সিক্ত হলেন অসংখ্য সলিল অনুরাগী। এবার তাঁর পরিচয় তিনি কবি। যে কবি লিখে চলেন জীবনের কথা, জীবন সংগ্রামের কথা।
বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে টেলিফোনিক কথোপকথনে সংগীতশিল্পী অন্তরা চৌধুরী বলেন, “আমার বাবা তো শুধু সুরকার বা গীতিকার নন, তিনি মূলত কবি, যেটা হয়তো অনেকের কাছে প্রকাশ্যে আসেনি। তবে বাবা বরাবরই কবিতা লিখতেন।”
দে'জ থেকে প্রকাশিত সলিল চৌধুরী বইসমূহ
সলিল-কন্যা অন্তরা চৌধুরীর উপস্থিতিতে সম্প্রতি দে’জ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হলো প্রিয়দর্শী চক্রবর্তী সম্পাদিত সলিল চৌধুরী কবিতা সংগ্রহ (Salil Chowdhury Portry Collection)। সাত সুরে বাঁধা সপ্তকের সীমানা ছাড়িয়ে মননশীল কবি সলিল চৌধুরী-র সঙ্গে পাঠকদের আলাপ করিয়ে দেওয়াই এই গ্রন্থ প্রকাশের উদ্দেশ্য বলে জানান সম্পাদক প্রিয়দর্শী চক্রবর্তী। বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে টেলিফোনিক কথোপকথনে সংগীতশিল্পী অন্তরা চৌধুরী (Antara Chowdhury) বলেন, “আমার বাবা তো শুধু সুরকার বা গীতিকার নন, তিনি মূলত কবি, যেটা হয়তো অনেকের কাছে প্রকাশ্যে আসেনি। তবে বাবা বরাবরই কবিতা লিখতেন। এর আগে ১৯৯৬ সালে বাবার একটি কবিতা সংকলন ‘একগুচ্ছ চাবি’ প্রকাশিত হয়। বাবা নিজেই এই কবিতা সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন, আর কবিতাগুলি সংগ্রহ করেছিলেন আমার মা শ্রদ্ধেয়া সবিতা চৌধুরী। বাবা চলে যাওয়ার পরে আমরা এই বইটি প্রকাশ করি। এরপরেও বাবার ডায়েরি ঘেঁটে আমি আরও কিছু কবিতা, ছড়া খুঁজে পেয়েছি। এবারের কবিতা সংকলনে একগুচ্ছ চাবির কবিতা এবং বেশ কিছু নতুন কবিতা থাকছে যেগুলো এর আগে প্রকাশিত হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন সুরকার নয়, শুধু কবি হিসাবেও সলিল চৌধুরী মানুষের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেন।”
সলিল চৌধুরীর কলমে বারবার উঠে এসেছে খেটে খাওয়া মানুষের অধিকারের প্রশ্ন, তাদের দাবি দাওয়ার কথা। বিংশ শতকে মানবিক মূল্যবোধের অবমূল্যায়ন বিচলিত করে তাঁকে।
আসামের (বর্তমান অসম) এক সংগীতপ্রেমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সলিল চৌধুরী। সে সময় আসামের চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ছোট্ট সলিলের। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাজ করতে আসা শ্রমিকদের সান্নিধ্য শিশু সলিলের মনে বুনে দিয়েছিল শ্রমজীবী মানুষের প্রতি ভালোবাসার বীজ; শিখিয়েছিল বিভিন্ন আঞ্চলিক সুর। তাই তাঁর কলমে বারবার উঠে এসেছে খেটে খাওয়া মানুষের অধিকারের প্রশ্ন, তাদের দাবি দাওয়ার কথা। বিংশ শতকে মানবিক মূল্যবোধের অবমূল্যায়ন বিচলিত করে তাঁকে। তাই তাঁর কলমে ঘুরে ফিরে এসেছে মানুষের কষ্ট-বঞ্চনার কথা। এমনকি ছোটোদের গানের কথাতেও তাদের মনের মতো ভাষাতে প্রকাশ করেছেন সামাজিক অসাম্য, সম্পদের অসম বণ্টনের সামাজিক চিত্র। “ছোটো ছোটো কুঁড়িদের ফোটবার অধিকার” দিয়ে এক মরমি আগামীকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সলিল চৌধুরী। তাঁর কন্যা অন্তরা চৌধুরীর ভাষায়, “বাবা আজীবন মানুষের কথা বলতে চেয়েছেন, লেখা হোক বা সুরে তিনি সবসময় প্রাধান্য দিয়েছেন জীবনকে।”
সলিল চৌধুরীর কবিতা
আরও পড়ুন: সলিল চৌধুরীর কবিতা
শুধু গীতিকার, সুরকার বা কবি নন। সলিল চৌধুরী একাধারে কথাসাহিত্যিক এবং নাট্যকারও বটে। সোমবারের অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধেয় শমীক বন্দোপাধ্যায় তুলে ধরলেন সলিল চৌধুরীর নাট্যকার সত্ত্বাকে। কল্যাণ সেন বরাট, পবিত্র সরকার তাঁদের স্মৃতিচারণায় তুলে ধরলেন তাঁর বহুমুখী প্রতিভা। পবিত্রবাবুর ভাষায় তিনি বিশ্ব সংস্কৃতির সুর আত্তীকরণ করে পরিবেশন করেছেন ভারতীয় পরিবেশে। অদূর ভবিষ্যতে কথা সাহিত্যিক সলিল চৌধুরীর রচনা সংগ্রহ-ও প্রকাশিত হবে বলে জানান অন্তরা চৌধুরী।
বই প্রকাশের অনুষ্ঠান
কবিতায় সলিল কখনও বলেছেন একগুচ্ছ চাবির কথা যেগুলো সততার, সত্যের, যুক্তির, নিষ্ঠার যা এ যুগে অচল জেনেও যত্ন করে রেখেছেন তার কাছে, কখনও সেই চাবি দিয়ে তালা খুলবে এই আশায় সেগুলি তুলে দিতে চেয়েছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে। কখনও শুনেছেন অজানা কারোর ডাক যিনি মাঝ রাতে চিৎকার করে ঘুমন্ত পাড়াকে জাগিয়ে কিছু বলতে চান। আসলে এই রাত মানুষের অজ্ঞানতা, শঠতার রাত, সেখানে ওই অজানা মানুষটার মতো চিৎকার করে সলিল জাগাতে চান মানুষের ঘুমন্ত সত্ত্বাকে। মানবতা যেখানে পরিণত হয়েছে ধূসর মরুভূমিতে সলিল সেখানেই তাঁর সৃষ্টির ধারা দিয়ে জাগ্রত করতে চেয়েছেন বিবেক। কখনও সেই ধারা প্রাণ পেয়েছে কথায়, কবিতায় আবার কখনও বা সুরে।