পশ্চিমি দর্শনের সঙ্গে সুফি-বাউল ভাবধারা মিলিয়েছেন কবি অলোকরঞ্জন

পঞ্চাশের দশক – বাংলা কবিতার ক্রান্তিকাল। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো যুগান্তকারী কবিরা তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রতিষ্ঠিত কবিদের দুই শিবির বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল – কেউ নান্দনিকতার পক্ষে সোচ্চার, কেউ বা সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী। একদল তরুণ কবি এই দুই শিবিরের বাইরে নতুনের দিকে ঝুঁকতে চাইলেন। ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’-র মতো পত্রিকা হয়ে উঠল তাঁদের সৃজনশীলতার বাহন। এরকম সময়ে কাব্যের জগতে পা রাখলেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত।
শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করে অলোকরঞ্জন কলকাতায় এসে ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি। যোগ দিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যে অধ্যাপনার কাজে। ইতিমধ্যে বন্ধু আলোক সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে অনুবাদ করেছেন বিদেশি কবিতা। যে সংকলন ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘ভিনদেশী ফুল’ নামে। ১৯৫৯-তে বেরল অলোকরঞ্জনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যৌবনবাউল’। সেকালে তরুণ কবিদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল সেই বই।
পশ্চিমি মণিমুক্তো বাঙালির ঘরে পৌঁছে দিতে অক্লান্তভাবে ভাষান্তর করে গিয়েছেন অলোকরঞ্জন। অনুবাদ করেছেন সাঁওতালি সাহিত্য। হামবোন্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ নিয়ে পড়াতে যান জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ডয়েশ-ইন্ডিশ-গ্যাসেলশাফটেও যুক্ত ছিলেন। জার্মানিতে বসবাস শুরু করলেও বাংলার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নিয়মিত। দেশ-বিদেশের বহু-পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
অলোকরঞ্জন ছিলেন ঈশ্বরবিশ্বাসী। ‘যৌবনবাউল’ থেকে শুরু করে ‘ছৌ-কাবুকির মুখোশ’, ‘গিলোটিনে আলপনা’, ‘জবাবদিহির টিলা’, ‘তোমরা কী চাও, শিউলি না টিউলিপ’ – নানা কাব্যগ্রন্থে তার ব্যঞ্জনা মেলে। সুফি-বাউল ভাবধারাও তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। যার পরিচয় সবথেকে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় ‘শুনে এলাম সত্যপীরের হাটে’ কাব্যগ্রন্থে। গভীর নান্দনিক প্রাজ্ঞতা ছিল তাঁর, যা বাংলা সাহিত্য খুব কম কবির মধ্যেই দেখা যায়।
“হেমন্ত না শীত কিছুই বোঝা যায় না: আকাশের কালো / গহ্বরে হঠাৎ দেখি দু-ঋতুর দ্বৈরথ কেমন / সুন্দর অথচ খুব অবান্তর…” (এখন শান্তিও যুদ্ধ)
হেমন্ত আর শীতের সন্ধিক্ষণে এক নিস্তব্ধ রাতে বিদায় নিলেন কবি অলোকরঞ্জন। বাংলা সাহিত্যে অনন্য মহীরুহ তিনি। বহুদর্শী কবির প্রতি রইল বঙ্গদর্শনের শ্রদ্ধা।