বঙ্গীয় গণপরিসর, প্রতিবাদী কবিতার অবস্থান ও সম্ভাবনা

সমাজে— সমাজনির্মাণ কিংবা সমাজবিপ্লবে বাংলা কবিতার প্রত্যক্ষ ভূমিকা কী? বিশেষত স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গ নামক ভূখণ্ডটিতে? এ-প্রশ্ন, তর্ক, প্রতিতর্ক ধিকিধিকি জ্বলে ওঠে প্রায়শই। উত্তরও বোধকরি খুব কঠিন নয়— না, প্রত্যক্ষ কোনও ভূমিকাই নেই। পরোক্ষ থাকলেও থাকতে পারে, যা উসকে দেয়, উদ্বুদ্ধ করে, দাহক যোগায়; কিন্তু চালিকাশক্তি হিসেবে কবিতার অধিষ্ঠান অসম্ভবই ঠেকে। অর্থাৎ, কোনও কারণের হাত ধরে আসে কবিতা, স্বয়ং কারণ হয়ে উঠতে পারে না।
প্রশ্নটিকে আরও সূক্ষ্ম ও গুরুতর দিকে নিয়ে গেলে এমন অবয়ব ফুটে ওঠে, যে, একটি কবিতা কি বৃহৎ সংখ্যক মানুষের বয়ান হয়ে উঠতে পারে? ‘বৃহৎ’— এই উচ্চারণটিরই-বা মাপকাঠি কী? কয়েকশো, কয়েক হাজার কিংবা কয়েক লক্ষ? আট কোটি বাঙালি জনসংখ্যার এই পশ্চিমবঙ্গে পূর্বোক্ত ‘বৃহৎ’ অংশটি শতাংশের কতটুকু, বলাই বাহুল্য। তারপরও, কিছু কবিতা তথাকথিত বৃহৎ সংখ্যক মানুষের কাছেও পৌঁছে যায়, যখন একই সময় একই সূত্রে স্পন্দিত হন সেইসব মানুষজন। স্পন্দনের তীব্র সেই ধাক্কাই তাঁদের পৌঁছে দেয় একটি কবিতার কাছে, কিংবা খোদ কবিতাই পৌঁছে যায় তাঁদের কাছে। সেই গোত্রের কবিতাগুলি সাধারণভাবে ‘প্রতিবাদের কবিতা’ (Poems of Protest, Resistance, and Empowerment) হিসেবে পরিচিত; অবস্থান ক্ষমতা তথা অপশক্তির বিরুদ্ধে।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, কোনও আন্দোলন বা প্রতিবাদ যে-সমস্ত ছন্দোবদ্ধ পঙক্তিসমষ্টিকে জনপ্রিয় করে তোলে, সেগুলির বেশিরভাগই মুখে-মুখে বাঁধা ছড়া, তথাকথিত কবিতা নয়। অন্ত্যমিলযুক্ত সেইসব ছড়া, দু-চার লাইনের, স্লোগান হয়ে ওঠে।
বৃহৎ-এর কাছে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রতিবাদের কবিতার ক্ষেত্রেই বেশি, কারণ তা অত্যল্প সময়ে, কোনও অস্থির ও অশান্ত পরিস্থিতিতে মানুষকে ভাষা জোগাতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে ‘কবিতা’-পরিচয় ছাপিয়ে হয়ে ওঠে স্লোগানও। এইসব পথ ও অন্যান্য শুঁড়িপথ ধরে তা পৌঁছে যায় মানুষের দোরগোড়ায়। হয়ে ওঠে ‘জনপ্রিয়’। অনেক প্রতিবাদের কবিতা আবার উৎকর্ষ হওয়া সত্ত্বেও জনপ্রিয়তার দোরগোড়ায় পৌঁছতে পারে না। তা অবশ্য ভিন্ন বিষয়। তথাকথিত জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রেমের কবিতারও, কিন্তু তার ক্রিয়া ধীর; প্রতিবাদের কবিতার মতো হঠাৎ-আক্রমণ ও অধিষ্ঠান নয় তার।
প্রতিবাদের কবিতারও আবার পর্বভাগ করা যায়। যা নিতান্তই সমকালীন ও যা সমকালীন হয়েও চিরকালীন। প্রথম ভাগটির আয়ু সীমিত; নির্দিষ্ট সময় পর তাৎপর্য ও গুরুত্ব হারিয়ে ঠাঁই পায় কেবল সেই সময়-সংক্রান্ত আলোচনায়। এরই বিপরীতে অবস্থান দ্বিতীয় ভাগের, যেখানে সুদূর ভবিষ্যতেও বারংবার প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পায় একটি কবিতা। বলা বাহুল্য, এই জাতীয় কবিতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের ভাষ্য হয়ে উঠতে সক্ষম হওয়ায়, এর ‘আয়ু’ ও ‘সার্থকতা’ সর্বাধিক।
কিন্তু তারপরও ফিরে যেতে হয় মূল প্রশ্নেই। কবিতাপাঠ কি নির্দিষ্ট পাঠকশ্রেণির মধ্যেই আবদ্ধ? স্থিতিস্থাপক গণ্ডিটি টেনে বাড়ালেও, তার সীমা কতখানি? নির্দিষ্ট ঘটনা থেকে জন্ম নেওয়া কবিতা, সেই ঘটনার দ্বারা আচ্ছন্ন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই কি প্রভাবিত করে? যাঁরা ততখানি আচ্ছন্ন নন, তাঁদের কাছে সেই কবিতার ভূমিকা কী? সমমনস্কতাই-বা একটি কবিতার স্মৃতিধার্য হওয়ার ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা পালন করে? কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কিংবা পথে-ঘাটে লেখা কবিতা-পঙক্তিই কি একটি কবিতার গণপরিসরে গিয়ে পৌঁছনোর মাপকাঠি?
খেয়াল করলে দেখা যাবে, কোনও আন্দোলন বা প্রতিবাদ যে-সমস্ত ছন্দোবদ্ধ পঙক্তিসমষ্টিকে জনপ্রিয় করে তোলে, সেগুলির বেশিরভাগই মুখে-মুখে বাঁধা ছড়া, তথাকথিত কবিতা নয়। অন্ত্যমিলযুক্ত সেইসব ছড়া, দু-চার লাইনের, স্লোগান হয়ে ওঠে। কখনও আবার গানের পঙক্তি সেই ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসে। এগুলি পেরোলে, তবে জায়গা পায় কবিতা। বস্তুত, কবিতা প্রকাশ্যে আসার জন্য একটি প্রকাশমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, ঘটনা তথা রচনার সময় থেকে প্রকাশিত হওয়া ও অভিঘাত তৈরি করার মধ্যে দূরত্ব জন্মায় প্রায়শই। অতএব, কবিতা যত-না সমকালীন ঘটনার প্রতিবাদের অনুঘটক, তার চেয়ে বেশি ভবিষ্যতের। পরবর্তীতে সংঘটিত অনুরূপ কোনও ঘটনায় তা প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পায় আবার। নবারুণ ভট্টাচার্যের বহুল-প্রচারিত পঙক্তি ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’-এর কথাই ধরা যাক। নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত সে-কবিতা, অথচ পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে অমোঘ হয়ে ফিরে-ফিরে এসেছে। একই কথা বলা যায় বিগত দশকে শ্রীজাত-রচিত ‘তুমিও মানুষ আমিও মানুষ তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়’-এর ক্ষেত্রেও। রচনার মূল কারণে আবদ্ধ না-থেকে, মাত্র এক দশকের ভেতরেই তা একাধিক প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। অন্য-কোনও জঁরের কবিতা/পঙক্তি কি এত কম সময়ে এই পরিমাণ প্রচারিত হতে পারত? সন্দেহ হয়।
প্রতিবাদের কবিতা কবিকে যেমন একটি সময়ের সঙ্গে বেঁধে দেয়, তেমন সেই সময়কে প্রলম্বিতও করে। জনস্মৃতিতে স্থায়িত্ব পায় পঙক্তি। এখানে ছন্দের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ছন্দে লেখা বক্তব্য যেহেতু সহজে মনে থেকে যায়, প্রতিবাদের কবিতা ও তার ছন্দকাঠামোর যুগ্ম উপস্থাপনা বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে যেতে সাহায্য করে।
এমন আরও একাধিক উদাহরণ তুলে ধরা যায়, যা সমসময়ে বা পরবর্তীকালে মানুষের প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। যে-মানুষ বাংলা কবিতার ধারাবাহিক পাঠক নন, হয়তো তাঁর কাছেও পৌঁছে গেছে সেসব কবিতা। এ একদিক দিয়ে পাঠকগণ্ডির সম্প্রসারণই বটে, কিন্তু তার স্থায়িত্ব কতটুকু? সেই ক্ষণিকের পাঠক বা উচ্চারণকারী কি ওই একটি কবিতা বা পঙক্তির সূত্র ধরে ওই কবির অন্যান্য রচনার কাছে যাবেন? সে-সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। ফলে বিষয়টি সাময়িক হয়েই থেকে যায়, আর কবিতার চেয়েও জরুরি হয়ে ওঠে ঘটনা।
তবে কি গণপরিসরে কবিতার কোনও প্রভাবই নেই? আছে বইকি! তবে তা প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ। উসকে দেওয়া কাজ তার। ভেতরে-ভেতরে ক্রিয়াশীল সে। সেইসব রাসায়নিক সমীকরণ বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল। একমাত্র বিস্ফোরণের সময়ই টের পাওয়া যায় উপাদান হিসেবে তার উপস্থিতি। প্রতিবাদের কবিতা কবিকে যেমন একটি সময়ের সঙ্গে বেঁধে দেয়, তেমন সেই সময়কে প্রলম্বিতও করে। জনস্মৃতিতে স্থায়িত্ব পায় পঙক্তি। এখানে ছন্দের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ছন্দে লেখা বক্তব্য যেহেতু সহজে মনে থেকে যায়, প্রতিবাদের কবিতা ও তার ছন্দকাঠামোর যুগ্ম উপস্থাপনা বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে যেতে সাহায্য করে। মানুষ খুঁজে পায় ভাষা।
এই ভাষা যোগানোর কাজই একজন কবির। তা যত বেশি সংখ্যক মানুষের আপন হয়ে উঠবে, ততই বাড়বে গণ্ডি। প্রত্যক্ষ হোক বা পরোক্ষ, কবিতার এই শক্তি ও সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। তদুপরি, প্রতিবাদী কবিতা সচরাচর একমুখী হওয়ায়, ভেতরে রহস্য বা দ্বিবিধ অর্থ বহন না-করায়, সহজবোধ্য ও সটান। হয়তো কোনও ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম বলেই এমন রূপ তার। এই কারণটিই তাকে বৃহৎ সংখ্যক মানুষের কাছে নিয়ে যায়। পাঠক ও পাঠ্যের মধ্যে আবরণ থাকে না তেমন। এই ধরনের লেখাকে যাঁরা কবিতা হিসেবে নাকচ করতে চান, তাঁদের অস্বীকার না-করেও বলা যায়, গণপরিসরে এই গোত্রের আবেদন অবিকল্প। সহজপাঠ্য, অতিরিক্ত মনোনিবেশের দাবিহীন, সেইসঙ্গে প্রাণবন্তও। জনপ্রিয় হওয়ার জন্য আর কী চাই! কাব্যগুণ? সে-প্রসঙ্গ এখানে আপেক্ষিক।
ইত্যবসরে এই প্রশ্নও নথিভুক্ত থাক— প্রেম বা প্রতিবাদের নামে তরল (এও আপেক্ষিক) কবিতা জনপ্রিয় হলে, তা সার্বিক কবিতাচর্চার পরিমণ্ডলকে তথা কবিতাপাঠের রুচিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না কি?