নকশালবাড়ির কবিতা -দলিল

আমরা যারা সেই রক্তাক্ত সময়ের পরে জন্মেছি, আমরা যারা বরানগরের গঙ্গায় তরুণদের লাশ ভেসে যেতে দেখিনি, দেখিনি সৎ চাষী পাড়া – নৈনানপাড়ার গুলি, বোমা বিনিময়, গভীর রাতে বারুদের গন্ধ ভরা বাতাসে আন্ডারগ্রাউন্ড কমরেডদের জন্য গেরস্থ বাড়ির মেয়েদের রুটি নিয়ে যাওয়া, আসলে আমরা সেসব খুব ভালো করেই দেখেছি। দেখেছি কারণ জ্ঞান হওয়া পর্যন্ত সেইসব দগদগে আগুনখোর সত্যগুলো মিথ ও গল্পগাথা হয়ে মনের শরীরে গেঁথে গেছে। বরানগর জনপদের পথে-বিপথে হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পেয়েছি শ্রেণিশ্ত্রু খতমের গান, বড় সুখবর শুনিলাম বাঘা, জোতদার মরিল নাকি, কিষাণেরই একঘায়ে জোতদার মরিল নাকি। একটা জনপদ যখন কোনও ইতিহাসের সাক্ষী থাকে, তখন ইতিহাস ভূতগ্রস্ত হয়ে থেকে যায় সেখানকার বায়ুমণ্ডলে, এসব বড় হওয়ার সাথে সাথে আমরা টের পেয়েছি খুব। তাই ‘বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা’ সংকলনের সম্পাদক যখন বলেন, ‘আমার একটা ব্যক্তিগত নকশালবাড়ি ছিল, ছিল কেন, আছে। আছে কেন, থাকবে, আছি যতদিন’-তখন ঐতিহাসিকতায় সচেতন সত্তার মিশমার হয়ে যাওয়ার অনিবার্যতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকে না। আমাদের ব্যক্তিগত নকশালবাড়িও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়ে ওঠে।
এই বড় হয়ে ওঠার সঙ্গী সেই অগ্নিভ সময়ের রক্তাক্ত দলিল, কবিতা। সংকলনের সম্পাদক রাহুল পুরকায়স্থ লিখছেন, ‘কেউ কেউ হয়তো রাইফেলের সঙ্গে সঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কবিতার কলম, কারও কারও লেখায় জেল যাপনের গাঢ় অন্ধকার, কেউ কেউ বা সমর্থনের মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে লিখেছেন কবিতা, কেউ বা সন্ত্রাস আন্দোলনের গঠনমূলক সমালোচনায় লিখেছেন’। আন্দোলনের লক্ষ্য, প্রকৃতি নিয়ে সংশয়ের বলয় যতই ঘনীভূত হয়েছে, ততই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে আন্দোলনের অভিঘাতে গড়ে ওঠা সাহিত্য, কবিতা। এই সংকলন সেই বজ্রমানিকের আখর তুলে নিয়ে এসেছে। সংকলনবদ্ধ হয়েছে জানার সঙ্গে অচেনা অজানা কবি ও কবিতা। নকশালবাড়ির ৫০ বছরে এই সুবৃহৎ সংকলন থেকেই পাঠকদের জন্য কয়েকটি কবিতা।
- সুকল্প চট্টোপাধ্যায়
জেলের গারদ ধরে
ধূর্জটি চট্টোপাধ্যায়
জেলের গরাদ ধরে তবুও দাঁড়িয়ে
নষ্টপ্রাণ সন্তানজননী
লুপ্তরূপ মাংসপিণ্ড, রক্ত-ক্লেদ-হাড়-মাংস-মজ্জার গভীর হতে
চিনে নেবে সন্তানের
প্রিয়তম মুখ।
চেনো তুমি, কে তোমার পেটের সন্তান?
সনাক্ত করেছ
কোন্টা ছেলের লাশ?
কাকে তুমি গর্ভে ধরেছিলে?
কাকে ভিন্ন করে বেছে নেবে
সন্তানের মা?
একই রক্ত প্রবাহিত সকল শরীরে,
নিঃশ্বাসের বাতাস
একই, বারুদে বিশ্বাস
যাদের, তাদের সমান প্রাণ
রক্তের সমুদ্রে শুয়ে
তারা আজও মাটির সন্তান।
জেলের গরাদ ধরে সর্বশূন্য হে জননী
ভিন্ন করে
কার মুখ খুঁজে নিতে চাও?
তুমি ঘুমোও
মলয় গুপ্ত
সে রাতে গঙ্গায় ভেসে যাচ্ছিল মোটরলঞ্চ
আর একের পর এক লাশ জেগে উঠছিল
নদীবক্ষে
তাদের স্টিমার সরিয়ে যাওয়ার আগে
আমার রেডবুক, বুকপকেট থেকে
ছুঁড়ে দিই মৃত ঘুমন্ত কমরেডের
বুকে
রামকৃষ্ণ মহাশ্মশানে পাতাখোর
জেগে ওঠে
দেওয়াল লিখন চলে
ঋত্বিক তুমি ঘুমোও, আমরা জেগে আছি
ছাপাখানার ভূত
সামসুল হক
প্রুফ কে দেখেছে তাকে এখুনি ডাকুন
এমন ছাপার ভুল মাতালেরও সাধ্যের অতীত
বুঝি না কেমন করে ‘মনন’ ‘হনন’ হয়ে যায়
‘প্রেম’ হয় ‘প্রেত’
বুঝি না কেমন করে ‘জনগণ’ ‘জড়গণ’ হয়
এমন ছাপার ভুল মুমূর্ষুরও সাধ্যের অতীত
স্ক্রিপ্টে ভুল অসম্ভব
তাহলে প্রকৃতি ভুল ক্ষুধা ভুল
জীবন ও জীবনের ভালোবাসা ভুল
প্রুফে ভুল নেই আর ওরা বলছে কম্পোজ নির্ভুল
তাহলে কেমন করে
‘কলকাতা সুতানুটি গোবিন্দপুরের সেই পিতা...’
ছাপা হয়
‘কলকাতা সুতানুটি গোবিন্দপুরের সেই চিতা...’
এমন ছাপার ভুল প্রেমিকেরও সাধ্যের অতীত
স্মরণসভা
প্রবীর রায়
কালো বেঁটে শহিদ বেদীর পাশে দাঁড়িয়ে
বৃদ্ধা বললেন
আমার ছেলে ছিল ফর্সা লম্বা
হাসলে চোখের নিচ দিয়ে উড়ে যেত তিতির পাখি
আর গুলিটা
লেগেছিল ঠিক ওইখানেই-
চিহ্ন ১৯৭১
দীপক রায়
বাস থেকে নামিয়ে কাল যাদের গুলি করা হল
তাদের লাশ সারারাত পড়েছিল রাস্তায়
লাশগুলি মর্গে যাবে আজ
শুধু ওয়াসিম কাপুরের তেল রং ছবির মতন
দু-এক ফোঁটা রক্ত লেগেছিল দেওয়ালে দেওয়ালে...
আরও একটি গানের ক্লাস
বিজয় দে
আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে? জবাব চাই জবাব দাও
লাল ট্রাফিক। কার্ল মার্কস। বসন্তের বাতাস। একটু দূরেই মাও
সে-তুং। হুংকারে ঘুম পুড়েছে, আগুন মাখা আগুন পুঁথি-পত্তর
ছাই-ছাই। ভাইয়ের দেশে বোনের দেশে মুক্তি
ওরে মুক্তি কোথায় পাবি
ভাগলপুরের পাগলা হাওয়ায় পুড়ল দাবি সত্তর
দশক দশক গানের মশক, তবুও তো জানলা খোলা
রুশ অথবা চিন
পাথর স্পন্দিত বুকে মনে হয় কোনো রাতে
আমিই ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
তোমার মারের পালা শেষ হলে
বিপুল চক্রবর্তী
পা থেকে মাথা পর্যন্ত চাবুকের দাগ যেন থাকে
এমন ভাবে মারো
দাগ যেন বসে থাকে বেশ কিছুদিন
এমন ভাবে মারো
এমন ভাবে মারো
তোমার মারের পালা শেষো হলে
আমাকে দেখায় যেন ডোরাকাটা বাঘের মতন।