ছোটোবেলার খেলা পিট্টু, নাম পাল্টে আজ বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গেছে এই খেলা

“কেউ বলে জল, কেউ-বা স্মৃতি, কেউ-বা সময়,
কেউ আচমকা ছুঁড়লে ঢেলা
হঠাৎ যেন একটু-একটু প্রকাশ্য হয়
খুব নগণ্য ছেলেবেলা।”
‘ছেলেবেলা’ শব্দটা কানে এলেই কেমন যেন একটা রূপকথার জগৎ সামনে চলে আসে। ক্লেশহীন, চিন্তাহীন, হইহই করা একটা জগৎ, আমাদের শৈশব। ফেলে আসা জীবনের ছিল চওড়া উঠোন, নিরুপদ্রব রাস্তা, বিস্তৃত মাঠ আর উদার সম্পর্কের আওতায় থাকা একটা উজ্জ্বল শৈশব। যে ‘শৈশব’ মানে ছিল বেহিসেবি দুষ্টুমি, মায়ের বকুনি আর ছিল ‘পড়া ফেলে একছুট ছুট্টে’ যাওয়া খেলার মাঠ। খেলার মাঠ বলতে আজও কত হাজারো রকমের স্মৃতি ভেসে ওঠে, ভেসে ওঠে ছেলেবেলার হারিয়ে যাওয়া খেলা আর খেলার সঙ্গীদের কথা। আমাদের ফেলে আসা এই সব খেলাধুলোর জন্য না ছিল কোনো আয়োজনের আড়ম্বর, না ছিল বড়োদের কাছে কিছু কিনে দেবার জন্য বায়না। নিতান্ত পড়ে থাকা সামান্য কিছু উপকরণ আর ইচ্ছাটুকু সম্বল করেই দিব্যি জমে উঠত খেলার আসর।
সময় যত আধুনিক থেকে আধুনিকতর হয়েছে, শিশুর হাতে ক্রমশ উঠে এসেছে দামি সব খেলনাপাতি, ভিডিও গেম, মোবাইল গেম ইত্যাদি। বিনা পয়সায় পাওয়া কোনো খেলার আর সে আভিজাত্য নেই আর। আর থাকবেই বা কী করে? হাইরাইজের যুগে খেলার মাঠও যে আজকাল মুখ লুকিয়েছে। বহুতলের যুগে মাঠ খুঁজে পাওয়া আজ সত্যিই খুব কঠিন। কিন্তু ওই যে ‘ক্ষ্যাপা তবু খুঁজে ফেরে পরশপাথর’, আর আমরাও ফিকে হয়ে যাওয়া স্মৃতি ঘেঁটে ফিরে যাই ফেলে আসা স্বপ্নের সময়ে।
ব্যস্ত জীবনের হিসেব নিকেশ খানিকটা চুকিয়ে নিয়ে দুম করে একদিন যদি গ্রামের পথে হেঁটে যাওয়া যায়, তবে এখনও আমাদের স্মৃতিকে উস্কে দেয় কিছু ছোটোবেলার খেলারা। এরকমই একটি খেলা হল পিট্টু।
পিট্টু বা সাতচাড়া, ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন একটি খেলা, যার উল্লেখ ভাগবত পুরাণেও পাওয়া যায়। ভাগবতে উল্লেখ আছে যে, ভগবান কৃষ্ণ তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে এই খেলাটি খেলেছিলেন। ঐতিহ্যবাহী এই খেলাটি সর্বশেষ পাঁচ হাজার বছর ধরে খেলা হচ্ছে। ধারণা করা হয় এটি ভারতীয় উপমহাদেশের দক্ষিণ অংশে উদ্ভূত হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকে এটি ভারত ও পাকিস্তানের অন্যতম ক্রীড়া ছিল এটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর বেশিরভাগ বিলুপ্ত হতে শুরু করেছে এবং খুব কম মানুষই এইসব খেলা সম্পর্কে জানে।
আরও পড়ুন: ‘গ্র্যান্ড মাস্টার’ হলেন বাংলার মিত্রাভ গুহ
হাওড়ার ভগবানপুরের বাসিন্দা বিমল ঘোড়ুই স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমাদের ছোটোবেলায় একটা পরিচিত শব্দ ছিল পিট্টু, আজ আর সেভাবে শুনতে পাই না এই ডাক।” অন্যদিকে কলকাতার প্রবীণ বাসিন্দা সনাতন মজুমদার বলেন, “আমাদের ষাট-সত্তরের দশকে কলকাতায় এসব খেলার রীতি ছিল পাড়ায় পাড়ায়। আমিও খেলেছি সেসময়। কত বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে, আবার খেলার পরে জড়িয়েও ধরেছি।” এহেন হারিয়ে যাওয়া ‘পিট্টু’ ডাক দিয়ে শুরু হত খেলা। দুই দলের ভাগ হয়ে খেলার রীতি ছিল। এক একটি দলে ৮ থেকে ১০ জন থাকতে পারে। আর খেলার সরঞ্জাম বলতে প্রয়োজন দলের যত জন আছে তত সংখ্যক কিছু ভাঙা চ্যাপ্টা পাথর বা টালি আর একটি রবারের বল। ব্যাস! তারপর টস করে খেলার শুরু। এরপর মাঠের মাঝখানে সাজানো হয় গুটিগুলিকে। খেলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একদলের কোনো একজন বল ছুঁড়ে যত কম সংখ্যক পাথর ভাঙবে আর ওই দলের বাকিরা সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যাওয়া গুটির মন্দির তৈরিতে হাত লাগাবে। আর বিপক্ষ দলের কাজ হল এই তৈরিতে বাধা দেওয়া, তাই সে দল তখন বল লুফে নিয়ে প্রতি আক্রমণে নামবে। মজার এই পদ্ধতি, অপরদলের ছোঁড়া বল আগের দলের কারোর গায়ে লাগলেই সে আউট। এইভাবে আক্রমণ, প্রতি আক্রমণ বাঁচিয়ে আবার পাথরের চূড়া তৈরি করে ‘পিট্টু’ বলে ডাক দিতে পারলেই খেলা শেষ।
পিট্টু বা সাতচড়ার উৎস খুঁজতে গিয়ে পল্লব সেনগুপ্ত তাঁর ‘লোকসংস্কৃতির সীমানা ও স্বরূপ’ গ্রন্থে ড. অসীম দাসকে অনুসরণ করে বলেছেন, “ঋকবেদে বর্ণনা আছে ইন্দ্র ওরফে পুরন্দরের নেতৃত্বে দেববাহিনী এসে দাস তথা দস্যুদের ‘অশ্বময়ী সপ্তপুরী’-কে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। পুরন্দরের অর্থ হল নগর বা দুর্গ ধ্বংসকারী, অশ্বময়ী পুরী অর্থ সঠিকভাবেই মার্শাল করেছেন কাঁচা ইটের বাড়ি বা তৈরি শহর। দাস এবং দস্যু মূলে জাতির নাম। …যারা সাত খোলামকুচিতে সাজানো ‘গড়’ আক্রমণ করে তাদের বলা হয় ‘পুরন্দর’ এবং যারা রক্ষা করে তাদের নাম এই খেলাতে ‘দস্যু’। অসীমের মতে সাতটি খোলামকুচি হচ্ছে অশ্বময় স্বপ্নপুরীর প্রতীক।”
পিট্টু আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য, ভারতের নিজস্ব সম্পদ। বিশ্বের দরবারে তার পরিচিতি ভারতের হাত ধরেই। আজ বিশ্বের কাছে, পিট্টুর পরিচিত নাম ‘লাগোরি’ নামে। বর্তমানে পিট্টু বা সাতচড়া বিশ্বজুড়ে কমপক্ষে ৩০টিরও বেশি জাতি খেলছে লাগরি ফেডারেশনের দৌলতে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ভারতের অপেশাদার লাগরি ফেডারেশন আয়োজিত ‘ইন্ডিয়ান লাগোরি প্রিমিয়ার লিগ’ সারা দেশ জুড়ে সুনাম অর্জন করে। তারা এই খেলাকে ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যের পাশাপাশি অন্যান্য দেশগুলিতেও জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করেছে। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় লাগরি বিশ্বকাপ, যাতে ভারত, ভুটান হংকং, ব্রাজিল, টার্কি, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, এবং নেপাল-সহ বেশ কয়েকটি দেশ মুখোমুখি হয়েছিল।
কিন্তু এতটা পথ পেরিয়েও পিট্টু আজও আমাদের ঘরের ছেলে, নতুন নাম, নতুন আয়োজনে সে মোটেই অপরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। শহুরে চালচলনে ফিকে হয়ে গেলেও স্মৃতির হিসেবে এখনও অমলিন এই পিট্টু। বাঙালির নিজেদের খেলা। গ্রামের আল বেয়ে আজও যে সজীবতা আমরা খুঁজে পাই, তার পরতে পরতে এখনও ফেলে আসা শৈশব জ্বলজ্বল করে। না, এ শৈশব লাগোরির নয়, এ শৈশব আমাদের পিট্টুরই। চন্দ্রবিন্দুর গানের কথায় যেমন আছে, “আমরা বাঙালি জাতি পাড়ায় খেলি পিট্টু/ আর রণে বনে ইউনিয়নে পাজামাতে গিট্টু” – বাঙালি আর সে বাঙালি না থাকলেও পাড়ায় পাড়ায় তরজা আর খেলার মেজাজ নিশ্চিত আজও আছে।