শীতের মালদায় প্রতিরোধের স্বপ্নে পিংক ডে

রাষ্ট্রসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী ২৫ নভেম্বর শুরু হয়েছিল আন্তর্জাতিক নারী ও শিশুকন্যা নির্যাতন বিরোধী সপ্তাহ। সেই তারিখ থেকে ২১ দিন ধরে নারীদের প্রতি হিংসার বিরুদ্ধে সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে নানা ধরনের পেশার সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষ একটি কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। সমাজকে পালটে দেওয়ার কর্মসূচি। আইরিন শবনম, সায়নী মুন্সি, সৌরভ সিনহা, অঙ্কিতা শর্মা, সঙ্গীত রায়, জয়দীপ দাস, সুতপা পান্ডে, সৌরভ দত্ত, বিপুল দত্ত, শম্পা মল্লিক, ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মানুষেরা যুক্ত হয়েছিলেন তাতে। লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে দানা বেঁধেছিল RAISEURVOiCE নামের আন্দোলন। গত রবিবার ১৬ ডিসেম্বর ছিল সেই ২১ দিনের কর্মসূচির শেষ দিন। তাই এই দিনটাকে পিংক ডে হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আন্দোলনকর্মীরা। তাঁদের কাছে এই তারিখটি হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের দিন, প্রতিরোধের দিন, সমাজ বদলের প্রতিশ্রুতি নেওয়ার দিন। সেদিন মালদা শহরের নজরুল সরণিতে ‘মালদার উঠোন’-এ আয়োজন করা হয়েছিল একটি অনুষ্ঠানের, যার স্লোগান ছিল, “Let’s Tie a Pink-Knot”।
স্বপ্ন দেখার কোনো আলাদা সময় হয় না। তাই আন্দোলন থেকে আওয়াজ উঠেছিল, “আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি, কার তাতে কী!” পিংক ডে ছিল সেই স্বপ্নেরই উদযাপন। RAISEURVOiCE আন্দোলনের অন্যতম মুখ আইরিন শবনম থেকে শুরু করে ‘বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ’-এর নুরুল আলম – সবার গলাতেই রবিবার ছিল মেয়েদের ক্ষমতায়নের ডাক। লিঙ্গ বিভাজনের ওপরে উঠে সবাইকে আগে মানুষ হিসেবে সম্মান করাটাই প্রধান, জানালেন তারা। পালটে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে আন্দোলনের আরেক মুখ সুতপা পান্ডে সেদিন নারী সুরক্ষার ব্যাপারে ছেলেদের আরও শিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে জোর দিলেন। এই দিনে প্রতিবাদ প্রতিরোধের ডাকে সামিল হয়েছিল ‘মালদা নাট্যসেনা’। তারা মূকাভিনয়ের মাধ্যমে নারী নির্যাতনের বিভিন্ন দিক ফুটিয়ে তোলেন। এর সঙ্গে ছিল, গিটার, ছিল গান, ছিল কবিতা, ছিল বক্তৃতা। নানাভাবে, নানা মাধ্যমে নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা উঠে এল সেদিনের অনুষ্ঠানে।
‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রতিনিধিকে RAISEURVOiCE আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী চাকরিজীবী সৌরভ দত্ত জানালেন, “সামাজিক জীব হিসেবে সমাজের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা প্রত্যেকেরই কম বেশি আছে। তাছাড়া সামাজিক অবক্ষয়টাও আমাদের মাঝখানে কিছু সংখ্যক মানুষেরই ঘৃণ্য অবদান। আমাদের এই সমাজ শুধু স্লোগান তোলে ‘নারী পুরুষ সমান সমান’, কিন্তু এর বাস্তব চিত্রটা কোথাও না কোথাও অনেকটাই আলাদা। এই ছবি শিশুদের জন্যও যথেষ্ট ঘৃণ্য। আমার মনে হয়, আমরা অনেকটাই সময় নষ্ট করে ফেলেছি। গর্জে ওঠার সময় অনেক আগেই এসে পড়েছে। তাই আন্তর্জাতিক শিশু ও নারী নির্যাতন বিরোধী সপ্তাহের শেষ দিনে এই প্রতিবাদের ঝড় সমাজের প্রতিটা স্তরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমাদের এই উদ্যোগ। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা আগামী প্রজন্মকে কী দিয়ে যাচ্ছি, অন্যায় না প্রতিবাদ?” অনুষ্ঠানের আরেকজন উদ্যোক্তা বিএসসি পড়ুয়া সঙ্গীত রায় ‘বঙ্গদর্শন’-কে জানালেন, “দেশের মতো আমার শহরেও মেয়েদের স্বাধীনতা নিয়ে এরকম একটা মুভমেন্ট খুব জরুরি। পিংক ডে প্রোগ্রামের পুরো অনুষ্ঠানটাই ছিল আজকের সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন নারী-বিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ। আমার মনে হয় এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা অন্তত মেয়েদের মনে স্বাধীনচেতা হওয়ার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আগুন জ্বালাতে সক্ষম হয়েছি”।