No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বলির রক্তে ভেজা ‘বলিপুর’থেকে নাম হল বোলপুর

    বলির রক্তে ভেজা ‘বলিপুর’থেকে নাম হল বোলপুর

    Story image

    সে আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা। বর্তমান বঙ্গদেশের রাঢ় অঞ্চলে তখন নাকি রাজত্ব করতেন রাজা সুবাহু সিংহ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নগরের নাম ছিল সুবাহুপুর। জনশ্রুতি, সেই নামই লোকমুখে বদলাতে বদলাতে হয়ে গেল সুপুর। বোলপুর থেকে কিলোমিটার তিনেক দূরে অজয় নদীর তীরে একটি ঐতিহাসিক জনপদ এই সুপুর। আজো এখানে টেরাকোটার কাজ করা জোড়া শিবের মন্দিরে, আনন্দচাঁদ গোস্বামীর রাসমন্দিরে, বাঘলা পুকুরের সিঁড়ির ভগ্নাবশেষে ইতিহাস কথা বলে ওঠে। সেই ইতিহাস শোনার কান চাই অবশ্য।

    ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই বঙ্কিমচন্দ্র দুঃখ করে বলেছিলেন, বাঙালির ইতিহাস নেই। কথাটা মিথ্যে নয়। ইতিহাসকে আর কবেই বা গুরুত্ব দিয়েছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা! ইতিহাস, কিংবদন্তি, জনশ্রুতি এখানে মিলে-মিশে একাকার। কখনো মঙ্গলকাব্যে কবির আত্মপরিচয় অংশ পড়ে, কখনো নানা ইঙ্গিত থেকে ছেনে-বুঝে নিতে হয় ইতিহাস। সেই ইতিহাসেও যে কতখানি কল্পনা মিশে আছে কে জানে! তবে, এটাই বঙ্গদেশের মজা। ইতিহাস খুঁজতে গেলে এখানে উপরি পাওনা হিসেবে গল্পের হদিশ মেলেই।

    এই যেমন রাজা সুরথের গল্প। কেউ কেউ বলেন, তিনি নাকি রাজা সুবাহুরই বংশধর। রাজ্যহীন হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন বর্তমান সুপুরে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ বলছে, বাংলায় প্রথম বসন্তকালীন দুর্গাপুজার প্রচলন করেন তিনিই। তখন গ্রামদেবী ভগবতী শিবিক্ষা। তাঁকে তুষ্ট করতে লক্ষাধিক বলি দিয়েছিলেন সুরথ। সুপুরের শিবিক্ষা মন্দির থেকে ডাঙ্গালি কালিতলা অবধি নাকি হয়েছিল সেই বলি। এরপর থেকেই ডাঙ্গালি কালিতলা ও তার আশপাশের অঞ্চলের নাম হয়ে যায় ‘বলিপুর’। সেই বলিপুরই নাকি আজকের বোলপুর।

    এই তত্ত্বকে প্রশ্ন করতেই পারেন ভাষাতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিকেরা। তাতে কি আর সুপুরের কিংবদন্তিতে আঁচড় লাগে! তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রাধা’ উপন্যাসেও জড়িয়ে আছে এই জনপদের নাম। আর আছে আনন্দচাঁদ গোস্বামীকে ঘিরে কিংবদন্তি। আনন্দচাঁদ গোস্বামী সুপুরের অন্যতম বিখ্যাত মানুষ। শ্যামসুন্দর জিউ-এর পরম উপাসক এই মানুষটির আশ্রম ছিল সুপুরেই। তাঁকে নিয়ে কত যে গল্প ভেসে বেড়ায় সুপুরের পথে-ঘাটে। খুসুটিকুড়ির সিদ্ধপুরুষ ছিলেন হজরত হোসেন। তাঁর নাকি অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। আনন্দচাঁদের শক্তি পরীক্ষার জন্য হজরত হোসেন একদিন বাঘের পিঠে চেপে দেখা করতে এলেন আনন্দচাঁদের সঙ্গে। সঙ্গে সোনার থালায় সাজানো উপহারের ভিতরে লুকোনো নিষিদ্ধ মাংস। আনন্দচাঁদ তখন বসেছিলেন একটি দেওয়ালের ওপর। হজরত সুপুরের সীমানায় আসতেই আনন্দচাঁদ দেওয়ালকে চালনা করেই এগিয়ে এলেন তাঁকে অভ্যর্থনা করতে। হজরত তো এই দৃশ্য দেখে অবাক। আনন্দচাঁদ তখন হজরতের হাতের থালা দেখে বললেন, ‘বন্ধু, আমার জন্য কী এনেছ দেখাও।’ হজরত থালার ওপরের কাপড় সরাতেই চমকে উঠলেন। থালায় মাংস নেই, তার বদলে রয়েছে সদ্য ফোটা পদ্ম ফুল। 

    এই কিংবদন্তি আজো বিশ্বাস করেন সুপুরের মানুষ। যুক্তির শক্তি কতখানি যে সেই বিশ্বাস ভাঙবে! জনশ্রুতি, এই আনন্দচাঁদের নেতৃত্বেই নাকি ভয়ানক বর্গিদের রুখে দিয়েছিলেন সুপুরবাসী। ১৭৪৫ সালে বর্গিরা সুপুর আক্রমণ করতে পারে আঁচ করে সুপুরের চারপাশে খাল কাটার নির্দেশ দিয়েছিলেন আনন্দচাঁদ। তার ভিতরে অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে লুকিয়ে ছিলেন স্থানীয়রা। বর্গিরা আসতেই অতর্কিতে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েন তাদের ওপর। সেই আক্রমণে পিছু হটে বর্গির দল। এই গৌরবের গল্পও সুপুরের জল-বাতাসে মিশে আছে।

    আর আছে জোড়া শিবের মন্দির। দুটি চুড়ো মন্দিরের, দুটি পৃথক দেউলও। কী অদ্ভুত টেরাকোটার কারুকাজ মন্দিরের গা জুড়ে। ১৭১৭ সালে তৈরি হওয়া মন্দিরটির বয়স তিনশো বছর পেরিয়েছে। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ চলছে এই মন্দিরের। খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলেই মন্দিরের গায়ে খুঁজে পাওয়া যাবে নৃত্যরত পঞ্চানন শিবকে। ভক্তদের সঙ্গে মিলে নাচছেন তিনি। ভক্তদের সঙ্গে শিবের এই নৃত্যরত ভঙ্গিটি নেহাত খুব প্রচলিত দৃশ্য নয়। সুপুরের এই মন্দির এমন দৃশ্যকে বুকে ধরে রেখেছে।

    কাছেপিঠেই আছে বাঘালা পুকুর, রাজা সুরথের নামধারী সুরথেশ্বর মন্দিরও। রয়েছে আরো অনেক গল্প, কিংবদন্তি, ইতিহাস। সেইসব নিয়েই আজো হেঁটে চলেছে এই জনপদ। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে অজয়। একসময় এই অজয়কে ঘিরেই অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল সুপুর। নদীপথে ব্যবসা চলত সুরাট, চন্দ্রকেতুগড়, অসমের সঙ্গে। এরপরে পর্তুগিজরা এল দেশে। গুজরাট থেকে বাংলায় নুনের ব্যবসা করতে এল একদল বণিক। পরে এরাই পরিচিত হল গন্ধবণিক চন্দ্র হিসেবে। এমন কত ইতিহাস যে লেপ্টে সুপুরের গায়ে।

    যদি সড়কপথে বোলপুর যান, তাহলে একবার ঢুঁ  মারতেই পারেন সুপুরে। জোড়া শিব মন্দিরের কারুকাজ আপনাকে মুগ্ধ করবেই। ইতিউতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইতিহাস হাতছানি দেবে। গল্প শোনাতে চাইবে। অবশ্য তার জন্য কান পাততে হবে আপনাকে। শুনবেন নাকি সেইসব গল্প?

    তথ্যসূত্র :  বীরভূম দর্পণ – বিজয় কুমার দাস, ‘সুপুরের ইতিকথা’ (বীরভূম লাল মাটির দেশ)


     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @