No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    প্যারট দীপঙ্কর : দেশ-বিদেশ থেকে পক্ষীপ্রেমীরা উড়ে আসেন যাঁর খোঁজে

    প্যারট দীপঙ্কর : দেশ-বিদেশ থেকে পক্ষীপ্রেমীরা উড়ে আসেন যাঁর খোঁজে

    Story image

    বীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “অতিথি” গল্পের তারাপদকে মনে আছে? ঘর ছেড়ে বাইরের দুনিয়াকে নিজের মতো করে চেনার চেষ্টায় যে কখনো ঘরের বাঁধনে নিজেকে বেঁধে ফেলেনি। সেই বন্ধনহীন তারাপদকেই যেন খুঁজে পাওয়া গেল কাকদ্বীপে।

    দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানা ব্লকের রাজনগর শ্রীনাথ গ্রামের বাসিন্দা দীপঙ্কর দিন্দা। দীপঙ্কর পাখিপ্রেমী। পাখির নেশায় তিনি মত্ত, অথচ উচ্ছৃঙ্খল নন। ছোটোবেলা থেকেই জঙ্গলে জঙ্গলে পাখি পর্যবেক্ষন ও সন্ধানের নিমিত্ত ঘুরে বেড়াতেন। তখন কে জানত এই দীপঙ্কর একদিন জগৎজোড়া খ্যাতি পাবে “প্যারট দীপঙ্কর” নামে?

    ইউটিউবে আজ তাঁর লক্ষ লক্ষ ফ্যান ও সাবস্ক্রাইবার। বেকার যুবকদের তিনি স্বনির্ভরতার দিশা দেখিয়েছেন। পাখি অবলম্বন করে শিখিয়েছেন ব্যবসা করতে। ভারতীয় উপমহাদেশের পাকিস্তান বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশ ছাড়াও ইউকে, আমেরিকা প্রভৃতি দেশে তাঁর ইউটিউব জনপ্রিয়। মূলত ইউটিউবে তিনি পোষ্য পাখিদের রক্ষণাবেক্ষণ, চিকিৎসা, খাবার ইত্যাদি নিয়ে পরামর্শ দেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রতিনিয়ত তাঁর কাছে মানুষ আসেন পাখিদের খোঁজে। বেকার যুবকরা ফোনে তাঁকে প্রায়ই জানান, “দাদা, আপনার জন্য আমরা জীবিকা নির্বাহ করে সংসার চালাচ্ছি।”

    মূলত ইউটিউবে তিনি পোষ্য পাখিদের রক্ষণাবেক্ষণ, চিকিৎসা, খাবার ইত্যাদি নিয়ে পরামর্শ দেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রতিনিয়ত তাঁর কাছে মানুষ আসেন পাখিদের খোঁজে।

    একদা আইনের ছাত্র দীপঙ্করের পাখি নিয়ে সাফল্যের লড়াই কিন্তু প্রতিকূলতায় ভরা। বাড়ির লোকেরা দীপঙ্করের অতিরিক্ত পাখিপ্রেম ভালো চোখে নিতে পারেননি। ছোটো থেকেই দীপঙ্কর পাখি অন্ত প্রাণ। বাড়িতে ছিল বদরি, লাভ বার্ড, ককটেল, গ্রে প্যারটস। এদের নিয়েই দীপঙ্করের দিন কাটতো। পাখিদের প্রতিপালন, অসুখ-বিসুখ, প্রজনন নিয়ে ব্যস্ত দীপঙ্কর বাকি পৃথিবী সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। একসময় পারিবারিক ব্যবসা, বাড়ি ছেড়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন ভিন্ন পথে। সেই পথে দারিদ্র্য, অপমান সবই তাঁকে গ্রহণ করতে হয়েছে। কিন্তু সে সব তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাই আজ জোর গলায় দীপঙ্করের দাবি, “পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গুজরাট, বিহার, মুম্বাই ইত্যাদি জায়গায় শ’য়ে শ’য়ে যে সমস্ত পক্ষীশালা বা অ্যাভিয়ারি তৈরি হচ্ছে, তার ৯০শতাংশ অনুপ্রেরণা প্যারট দীপঙ্কর থেকে মানুষ পেয়েছে। শিক্ষিত বেকার যুবকরা বাড়িতে পাখি রেখে সফল ব্যবসায়ী হতে পেরেছে। পাখি কেনাবেচায় আজ কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়।”

    কথাটা দীপঙ্কর বিতর্ক উস্কে দেওয়ার জন্য বলেননি। বলেছেন নিজের বিশ্বাস থেকে। তিনি বেকার শিক্ষিত যুবকদের যে সমস্ত ফোন পেয়েছেন, তাতেই তার এই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে। দীপঙ্কর বঙ্গদর্শন.কমকে বলেন, “এরা প্রত্যেকে পাখি ভালবাসে। কিন্তু কিভাবে তা থেকে আয় করা যেতে পারে, এটা জানা ছিল না। আমার ইউটিউব ভিডিওগুলো তাদের সেই পথ দেখিয়েছে।”

    স্ট্রেস এখন সভ্যতার অভিশাপ। কর্মব্যস্ত জীবনে মানুষ টাকা রোজগারের পাশে একটু শান্তির কাঙাল। বাড়িতে একটি পোষ্য থাকলে কর্মব্যস্ত জীবনের দৌড়ঝাঁপ ভুলে মানুষ শান্তি পান। তাই বাড়িতে বাড়িতে পোষ্য হিসেবে কুকুর, বিড়াল, খরগোশ, হ্যামস্টার, গিনিপিগ, রঙিন মাছ ঢুকে পড়ছে। পাখিরাও পোষ্য হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়। অনেক কম খরচে, কম পরিশ্রমে পাখিকে বাড়িতে পোষ্য হিসেবে রাখা যায়। আর নাগরিক সভ্যতায় এক কামরার ফ্ল্যাটে পোষ্য হিসেবে পাখি যথেষ্ট মানানসই। তাই মানুষের পাখিপ্রীতির সঙ্গে আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা গড়ে উঠেছে। পাখির খাঁচা, খাবার, খেলনা, ওষুধপত্র এসবেরই বিরাট বাজার রয়েছে। এখন পাখি ব্যবসার যথেষ্ট চাহিদা আছে। এই চাহিদার জন্যই গড়ে উঠছে পাখির বাজার। তাতে পাখির মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, পাখির প্রজনন ঘটিয়ে আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। 

    দীপঙ্করের নিজের পাখিগুলো যখন অসুস্থ হয়ে পড়তো, তাঁকে অনেক ভেটেরিনারি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে বা নানা ডাক্তারি বই পড়তে হয়েছে। সে সব বিদ্যে পাখিদের ওপর প্রয়োগ করতেই সুফল পান তিনি। তাতেই আত্মবিশ্বাস বাড়ে তাঁর। এরপরই ২০১৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ দীপঙ্কর তাঁর ইউটিউব চ্যানেল শুরু করে। তাঁর আগে কার্যত কোনো পাখিদের নিয়ে ইউটিউব চ্যানেল তো দূরের কথা, পাখির সেরকম বাজার বা কোনো চর্চাও ছিল না।

    তখনই কাকদ্বীপের এই তরুণ ভারতীয় বন্যপ্রাণ অ্যাক্ট সম্পর্কে জানেন। তিনি বলেন, “বন্যপ্রাণ আইন থেকে বুঝলাম কয়েকটা বিশেষ প্রজাতির পাখি ছাড়া অন্য পাখি রাখলে সেটা অপরাধ নয়। তাতেই সাহস পেয়ে আমি ইউটিউব চ্যানেল খুলেছিলাম। পাখি সংক্রান্ত কোনও ডাক্তারি থেকে বা খাবারের পরামর্শ কারো দরকার হলে এই ইউটিউব চ্যানেল সাহায্য করবে, এটা ভেবেছিলাম।”

    ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউ থেকে দীপঙ্কর যা অর্থ রোজগার করেন, তার বেশিরভাগটাই সুন্দরবন এলাকায় সমাজসেবার কাজে খরচ করেন। প্যারট দীপঙ্কর চ্যারিটেবল ট্রাস্ট-এর সাহায্যে দীপঙ্কর আজ অনেকের স্বপ্ন পূরণ করছেন।

    এরপরই দীপঙ্কর পাখি নিয়ে বৃহৎ ভাবনা চিন্তা শুরু। প্রকৃতিকে বঞ্চিত না করে তিনি গড়ে তুলেছেন পরিবেশবান্ধব পাখির জগত। দেশ বিদেশের পক্ষিপ্রেমীরা এখন নিয়মিত আসেন প্যারট দীপঙ্করের ফার্মে। তাঁর ফার্মে এখন প্রায় দু’শো পাখি। তাঁর মত তাঁর পাখিরাও রীতিমতো জনপ্রিয়। মলুক্কান কাকাতুয়া মানকার ভক্তকুল যে কোনো তারকার পক্ষে ঈর্ষণীয়। অতিথিদের সম্ভাষণ থেকে শুরু করে তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে মানকা রীতিমতো মাতিয়ে রাখে পরিবেশ।

    পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দীপঙ্কর পাখিদের কাজে নিজেকে সমর্পণ করেছেন।এখন সাড়ে আট বিঘা জমি নিয়ে তিনি একটি বিনোদন পার্ক গড়ে তুলতে চলেছেন। তার কাজ চলছে পুরোদমে। কাকদ্বীপের আটমাইল হরিপুরে দীপঙ্করের নতুন ফার্ম তৈরি হচ্ছে। সেখানে পাখিরা পাবে ওড়ার আকাশ, উদার পৃথিবী। আর মানুষ গাছপালা, পশুপাখিতে ভরা পৃথিবী পাবে।

    উদ্যোগপতি দীপঙ্কর এখন অনেক মানুষের আইকন। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তিনি নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউ থেকে দীপঙ্কর যা অর্থ রোজগার করেন, তার বেশিরভাগটাই সুন্দরবন এলাকায় সমাজসেবার কাজে খরচ করেন। প্যারট দীপঙ্কর চ্যারিটেবল ট্রাস্ট-এর সাহায্যে দীপঙ্কর আজ অনেকের স্বপ্ন পূরণ করছেন। আর মানুষের এই স্বপ্নের পৃথিবী যাতে আগামী দিনে কাকাতুয়া, ম্যাকাও, লাভ বার্ড, গ্রে প্যারট, বদরি, ফিঞ্চ, ককটেলেরও বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, এই আশায় দীপঙ্কর বুক বেঁধে এগিয়ে চলেছেন। মুখে কোনো মন্ত্র নয়, রয়েছে কেবল পাখিদের ভালোবাসার ভাষা। 

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @