No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    হুগলির পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা : ৮৫ বছর ধরে প্রান্তিক-শিক্ষার অনাথের নাথ

    হুগলির পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা : ৮৫ বছর ধরে প্রান্তিক-শিক্ষার অনাথের নাথ

    Story image

    ৯৩৮ সালে হাজি আতর আলি নামের এক ব্যক্তি নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে হুগলির পান্ডুয়া মহাদেবপুরে সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা তৈরির জন্য বিপুল পরিমাণ জমি দান করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, মুসলিম সমাজের ছেলেমেয়েরা যাতে প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে। হাজি আতর আলির সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। ১৯৩৮ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হকের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা, এইচএস এখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে পঠনপাঠন চলে। আরবি ভাষা তৃতীয় ভাষা হিসাবে বাধ্যতামূলক ভাবে দশম শ্রণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ওয়েস্টবেঙ্গল কাউন্সিল অফ হায়ার সেকেন্ডারি এডুকেশনের পাঠক্রম অনুযায়ী কলা ও বাণিজ্য শাখায় পড়ানো হয়। অর্থাৎ স্কুলটি পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে পড়ানো হয়। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি ওয়েস্ট বেঙ্গল কাউন্সিল অফ হায়ার সেকেন্ডারি কাউন্সিল অনুমোদিত।

    এটা তো গেল অন্য সব স্কুলের মতোই পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা, এইচএস-এর স্বাভাবিক চরিত্র। তবে একটা নয় একাধিক বিশেষ চরিত্র রয়েছে পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা, এইচএস-এর। পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা এইচএস-এর প্রধান শিক্ষিকা দীপান্বিতা পাল জানালেন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেই বিশেষ চরিত্রের কথা, যা শুনলে সত্যিই অবাক হতে হয়।

    প্রধান শিক্ষিকার বক্তব্য থেকেই জানা গেল, তাঁরা চাইছেন এই মাদ্রাসায় ভোকেশনাল কোর্স চালু করতে। তা হলে অষ্টম, নবম শ্রেণিতে স্কুলছুট কমবে। কেন না পেটের টানে এই ছাত্ররা একটু বড়ো হলেই পড়া ছেড়ে সংসারে অভাব মেটানোর তাগিদে আয়ের পথে চলে যায়। তাই তাঁরা চাইছেন, ভোকেশনাল কোর্স চালু করতে, যেটা হয়তো হয়ে যাবে শীঘ্রই। তবে, কন্যাশ্রী পাওয়ার জন্য ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই স্কুলছুটের সমস্যা নেই বলেই জানালেন তিনি। অষ্টম শ্রেণি থেকে কন্যাশ্রী পায় ছাত্রীরা। এর ফলে মেয়েদের বাল্য বিবাহ রুখতে পারছেন তাঁরা।

    “সমাজের যেসব শিশুদের কেউ নেই, তাদের জন্য আছে পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা এইচএস”, বলছিলেন দীপান্বিতা পাল। তাঁর কথায়, “অনাথের নাথ হচ্ছে আমাদের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আমরা এক প্রকার খুঁজে আনি এই অনাথ বাচ্চাদের। এদের কারও হয় বাবা, মা নেই অথবা কারও বাবা-মা দিনমজুর, মাইগ্রেটেড লেবার বা পরিযায়ী শ্রমিক। আমাদের স্কুলের হস্টেলে রেখে আমরা এই ছেলেমেয়েদের পড়াই। রাজ্য সরকার এই ছাত্রছাত্রী পিছু মাসে এক হাজার টাকা করে দেয়। আমাদের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা পড়ে তারা সংখ্যালঘু, এসসি, এসটি সম্প্রদায়ভূক্ত। এদের বাড়িতে হয় কেউ আগে লেখাপড়া করেননি বা করলেও ইচ্ছে অনুযায়ী সন্তান-সন্ততিদের লেখাপড়া করানোর জন্য কোনও ব্যবস্থা নিতে পারেন না। ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পড়ানোর সামর্থ নেই। আমাদের কাজ এদের খুঁজে বার করে শিক্ষার আঙিনায় নিয়ে এসে, মূল স্রোতে পৌঁছে দেওয়া। সেই কাজে আমরা অনেকটাই সাফল্য পেয়েছি, পাচ্ছি। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন ১ হাজার ছাত্র-ছাত্রী। হস্টেলে আছে ৫০ জন।” 

    প্রধান শিক্ষিকার বক্তব্য থেকেই জানা গেল, তাঁরা চাইছেন এই মাদ্রাসায় ভোকেশনাল কোর্স চালু করতে। তা হলে অষ্টম, নবম শ্রেণিতে স্কুলছুট কমবে। কেন না পেটের টানে এই ছাত্ররা একটু বড়ো হলেই পড়া ছেড়ে সংসারে অভাব মেটানোর তাগিদে আয়ের পথে চলে যায়। তাই তাঁরা চাইছেন, ভোকেশনাল কোর্স চালু করতে, যেটা হয়তো হয়ে যাবে শীঘ্রই। তবে, কন্যাশ্রী পাওয়ার জন্য ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই স্কুলছুটের সমস্যা নেই বলেই জানালেন তিনি। অষ্টম শ্রেণি থেকে কন্যাশ্রী পায় ছাত্রীরা। এর ফলে মেয়েদের বাল্য বিবাহ রুখতে পারছেন তাঁরা। এমনকী ছাত্রীদের নিয়ে তাঁদের কন্যাশ্রী ক্লাবও আছে। তার জন্য নোডাল টিচার আছে, আছে স্বয়ংসিদ্ধা গ্রুপ। মেয়েরা যাতে পড়াশোনা চালিয়ে যায়, বাল্য বিবাহে সম্মত না হয় সেজন্য স্থানীয় এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধির পক্ষে প্রচার করে ছাত্রীরা, শিক্ষকরাও পাশে থাকেন।

    পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা এইচএস-এ পড়ে এক কৃতী ছাত্র বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা ডিআরডিও-তে কর্মরত। এর আগে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে উচ্চশিক্ষা নিয়ে মহম্মদ মনিরুজ্জামান ইউপিএসসি অ্যাসিসট্যান্ট গ্রেড একজামিনেশন ক্র্যাক করে কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদে কাজ করেছেন।

     

    পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা এইচএস- এর বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা ৩০। চারটে বড়ো ভবন রয়েছে পঠনপাঠনের জন্য। ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১০১০। সংখ্যলঘু ছেলেদের জন্য হস্টেলে ৫০ জন থাকে। সংখ্যালঘু ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা এখানে পড়ে। সংখ্যালঘু ৯০ শতাংশ ও ১০ শতাংশ সাধারণ ছাত্রছাত্রী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ছে।

    স্কুলের বর্তমান লক্ষ্য, করোনার পর যে সব পরিযায়ী শ্রমিক আবার ভিন রাজ্যে ফিরে গেছেন কাজের জন্য তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা দেওয়া। এমন ৪ জন পড়ুয়া ২৬ জুন পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা এইচএস -এ ভর্তি হয়েছে, বলছিলেন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা। তিনি বললেন, “মাদ্রাসায় যারা পড়তে আসে তারা প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া, তাই তারা এখনও উল্লেখযোগ্য ফল করে রাজ্যে নিজেদের যোগ্যতার ছাপ রাখতে না পারলেও, ওরা ভালোই চেষ্টা করে। উচ্চমাধ্যমিকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক ছাত্রীর, এই বছর সর্বোচ্চ নম্বর উঠেছে ৫০০-র মধ্যে ৪৫০। " প্রধান শিক্ষিকা দীপান্বিতা পাল এই কথা বলতে বলতে জানালেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য ছাত্রদের অষ্টম শ্রেণি থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পড়াশোনার মধ্যে আটকে রাখা, যে জন্য ভোকেশনাল কোর্স চালুর চেষ্টা করছি। ছাত্রীদের আমরা কন্যাশ্রীর মাধ্যমে আটকাতে পারলেও ছাত্রদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা থাকছেই। স্কুলে ভালো লাইব্রেরি আছে, কম্পিউটার ল্যাবরেটরি আছে, স্মার্ট ক্লাস আছে। আমরা লড়াই চালাচ্ছি যাতে প্রান্তিক অংশের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসতে পারি তার জন্য। আমাদের লড়াইটা অন্যরকম।” প্রধান শিক্ষিকা দীপান্বিতা পাল, ২০২২ সালে “উইমেন অ্যাচিভার অ্যাওয়ার্ড” (Women Achievers Award) পেয়েছেন সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা নিয়ে কাজ করার জন্য। প্রধান শিক্ষিকা জানালেন, “স্থানীয় যে সব প্রাইভেট মাদ্রাসা আছে, সেখান থেকেই ছেলেমেয়েদের আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসি, আমরা চাই ওরা শিক্ষার মূল স্রোতে আসুক। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক, তাহলেই আমাদের শান্তি। তবে এখানকার বা যারা বাইরে থেকে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে আসে, সেই সব সংখ্যালঘু পরিবারগুলো আমার, আমাদের ওপর ভরসা করে, জানে আমরা যা করছি ওদের সন্তানদের ভালোর জন্যই করছি, এটাই আমাকে কাজ করতে বাড়তি উৎসাহ দেয়।”

    “উইমেন অ্যাচিভার অ্যাওয়ার্ড”-এর শংসাপত্র হাতে প্রধান শিক্ষিকা দীপান্বিতা পাল

    ______________
    তথ্য সূত্র : দীপান্বিতা পাল, প্রধান শিক্ষিকা, পান্ডুয়া সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসা এইচএস
    ছবি: সংগৃহীত

    *কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @