বঙ্গ পুতুলের দর্শন কথা

গ্রাম বাংলা জুড়ে তৈরি হয় মাটির পুতুল। লৌকিক প্রথার সাথে নানা ভাবে জড়িয়ে রইল পুতুলগুলো। থানে মানত করার হিসেবের সাথেও সম্পর্ক রইল পুতুলের। মানতের পথ ধরে ভক্তদের দৌলতে কুম্ভকারের পুতুল স্থান করে নিলো গ্রাম সুবাদে বটতলায় কিংবা আলের পাশের থানে। কুম্ভকারেরা মানতের বাহন হিসেবে বানান হাতি আর ঘোড়া। পল্লী গ্রামের মানুষের মনে বিশ্বাস এ সব হাতি আর ঘোড়া দিতে হয় বসন্ত রায়ের জন্যে। লোকো কথা চালু আছে ‘ সাজিল বসন্ত রায় তুরকি ঘোড়ায়/ কলেরব সভা পা এ লোচন জুরায়/ হাতে শক্তি শরাসন তূন পূর্ণ বান/ চান্দ করে ঝকমক পিঠে ঢাল খান/ জব্রবান আদি বলে পাত্র পঞ্চানন/ মুরতিমান ব্যাধি চলে না যায় গণন/ মন্দ আগন ব্যাধি একে একে চাপে/ রুষিলে বসন্ত রায় রাখে কার বাপে/...সেদিন বসন্ত রায় হয়ে গিয়েছিলেন ব্যাধি নিরাময়ের দেবতা। তিনি যখন গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের রোগ নিরাময় করবেন তখন তো তাঁর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হাতি ঘোড়া লাগবে। হাজার হোক সে হল গিয়ে রাজা। তাই গ্রামের মানুষের কথা হল ‘তোমার জন্যে ঘোড়া রাখলুম রায় রায়ান, তুমি গ্রাম দাপিয়ে বেড়াও। আর রোগ তাড়াও। আর তাই তৈরি হয় কোলে পোঁ কাঁখে পোঁ মা পুতুল। কোথাও তাঁর নাম জো- পুতুল আবার কোথাও বা ষষ্ঠী পুতুল। এমন পুতুলও থানে পড়ে গৃহস্থের খোকা হোক মানত করে। আর মা মনসার চালি তো আছেই। বাংলার এই সব মাটির পুতুল বানানোর মহল্লায় নির্মাণগত অনেক শব্দ চালু আছে। তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হল ‘পুতুল বানাতে বসে আমাদের পাঁচ ভুতের কারবার করতে হয়, আমাদের পুতুল খেলা ওই পাঁচ ভুতের সাথেই’। এমন গ্রামবাংলার শিল্পী কথনে লুকিয়ে আছে এক চমৎকার অর্থ। পাঁচ ভুত বলে বোঝায় পঞ্চভূতের পাঁচ কাহন। শাস্ত্র মতের পঞ্চভুত হল ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম। আর ক্ষিতি মানে হল- পৃথিবী, অপ কথার মানে হল- জল। ঠিক সেরকমই তেজ কথার অর্থ হল- আগুন, আর মরুৎ মানে হল- বাতাস। এবং ব্যোম বলতে বোঝায় শূন্যতা অর্থাৎ আকাশকে। এবার দেখা যাক পুতুল কারিগর এসব দিয়ে কি করে?
পুতুল কারিগর ক্ষিতি মানে পৃথিবী থেকেই মাটি নিয়ে আসে। তার পর অপ অর্থাৎ জল দিয়ে শিল্পী সেই মাটিকেই মাখে। সেই নরম মাটিকে সে পরিণত করে মনের মতন আঁকারে। এর পর শিল্পী ভাবেন কাঁচা মাটিকে পুড়িয়ে শক্ত করার কথা। আর তখনই তাঁর দরকার হয় আগুনের, অর্থাৎ তাঁর লাগে তেজ। এবার তো পুতুলকে ঠাণ্ডা করতে হবে। তাই সেই পোড়া উত্তপ্ত পুতুল সে দেয় বাতাসের কাছে। সুতরাং তাঁর লাগলো মরুৎ কে। এবার ব্যোম কে কাজে লাগাতে হবে শিল্পীর। কিন্তু শূন্যতাকে কি ভাবে পুতুলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে? এর উত্তর লোকো শিল্পী বের করে নেয় অবলীলায়। সে সমস্ত পুতুলগুলি বানাতে থাকে ফাঁপা করে। আর ফাঁপা মানেই হল শূন্যতা অথবা অসংখ্য ছিদ্র করা হয় পুতুলের গায়ে। আর সেই শূন্যতাই তখন আকাশ হয়ে নেমে আসে পুতুলের গায়ে। তৈরি হয় মাটির পুতুল। বসন্ত রায়, মা মনসা, হাতি, ঘোড়া সবাই তখন পঞ্চভূতের প্রতিনিধি হয়ে হাজির হয় আমাদের সনে। এমনই হল বঙ্গ পুতুলের দর্শন কথা।