চোখজুড়ানো শান্ত কল্পেশ্বরে আমাদের দুর্গম যাত্রা

কল্পেশ্বর যাওয়ার পথ
দীর্ঘ যাত্রাপথের আজ অন্যতম একটি দিন। হেঁটোলেটো ভেঙে, কখনও খুড়িয়ে, কখনও গড়িয়ে কখনও তড়বড়িয়ে, কখনওবা টুকটুক করে ঘুরতে ঘুরতে আমরা ছুঁয়ে ফেলেছি চার-চারটি কেদার৷ রয়েছে বাকি এক। সেই বাকি থাকা ‘পঞ্চম’ কেদার কল্পেশ্বরের উদ্দেশ্যেই আজ আমাদের যাত্রা।
প্রকৃতির আদিম রূপকে অক্ষুণ্ন রেখে, বিশাল এক হেলানো পাথরের আড়ালে তৈরি এই কল্পেশ্বর গুহা মন্দির সেই একমাত্র কেদার, যা সারাবছর দর্শনার্থী এবং উৎসুক ট্রেকারসদের জন্য খোলা থাকে। সাধু সন্তদের নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে জপ ধ্যানের আদর্শ জায়গা কল্পেশ্বর। কারণ তুলনায় কম পরিচিতি ও পথের দুর্গমতার জন্য এখানে জনমানসের কোলাহল একেবারেই নেই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,১৩৪ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই পঞ্চম কেদারে প্রস্তরীভূত জটারূপী শিবের আরাধনা করা হয়। এখানকার শিবকে তাই জটাধর বা জটেশ্বর মহাদেব বলে ডাকার রেওয়াজ আছে। পঞ্চপাণ্ডবের চোখে ধুলো দিয়ে বৃষরূপ ধারণ করলেও আদিদেবকে যখন দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম ধরে ফেলেন আর তারপর শিব-শরীরের বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে পড়ে গাড়োয়াল হিমালয়ের বিভিন্ন অংশে। সেই তখনই শিবের জটা স্পর্শ করেছিল কল্পেশ্বরকে। পৌরাণিক এই মিথের পাশাপাশি কল্পেশ্বরকে ঘিরে রয়েছে আরও একটি ঐতিহাসিক কিংবদন্তি। এখানেই নাকি মহাঋষি দুর্বাসা কল্পবৃক্ষের আশ্রয়ে বসে ধ্যান করেছিলেন দীর্ঘ দিন।
উর্গম ভ্যালি
গাড়োয়াল হিমালয়ের চামোলি জেলার উর্গম উপত্যকায় তৈরি হওয়া এই কল্পেশ্বরও বয়সে অন্যান্য কেদারগুলির মতোই প্রাচীন। ঋষিকেশ-বদ্রীনাথ হাইরোডে, পিপলকোঠির পর আসে হেলং জনপদ। এখান থেকেই একটি তীর্যক পথ ‘উরগম’ গ্রাম পেরিয়ে চলে যায় ১২ কিমি দূরে ‘লিয়ারি’। এই পর্যন্ত গাড়ি গেলেও কল্পেশ্বরের আগের পথ অনুযায়ী এরপর এই লিয়ারি থেকে শুরু হত হাঁটাপথ। কিন্তু এখন, লিয়ারি থেকে কল্পেশ্বর মন্দিরের কয়েকশো মিটার আগে দেবগ্রাম পর্যন্ত গাড়ি যাওয়ার পথ হয়ে গেছে। তাই চার কেদার পেরিয়ে এসে এই পঞ্চম কেদারে পায়ের একেবারে বিশ্রাম৷ তবে একটু না হাঁটলে তো মহাদেবের দর্শন মেলে না তাই কল্পেশ্বর ট্রেক করতে হলে এখন হাঁটতে হয় মাত্র ৩০০ মিটার।
প্রকৃতির আদিম রূপকে অক্ষুণ্ন রেখে, বিশাল এক হেলানো পাথরের আড়ালে তৈরি এই কল্পেশ্বর গুহা মন্দির সেই একমাত্র কেদার, যা সারাবছর দর্শনার্থী এবং উৎসুক ট্রেকারসদের জন্য খোলা থাকে।
বৃদ্ধ বদ্রী
যোশীমঠের আগেই হেলং মোড়ে, ছোটো এক রাস্তা হাইরোড থেকে নীচের দিকে হঠাৎ অলোকানন্দা ব্রিজের দিকে চলে গেছে। ওই পথ ধরেই শুরু হয় কল্পেশ্বর যাত্রা। উর্গম খুবই ধসপ্রবণ এলাকা, তাই নতুন রাস্তা তৈরি হলেও পদে পদে সে পথে রয়েছে মরণকূপ। মাটির সংকীর্ণ এবড়োখেবড়ো সেই রাস্তায় এক সঙ্গে মুখোমুখি দুটি গাড়ি এসে পড়লে একজনকে অপরের জন্য ব্যাক গিয়ার করে দাঁড়াতে হয়। তবে গাড়োয়ালি দক্ষ যুবক ড্রাইভার সাহেবের উপস্থিত বুদ্ধিতে একবার যদি ভরসা জন্মে যায়, তাহলে প্রাণ হাতে করেও খানিক নিশ্চিন্ত হয়ে দেখা নেওয়া যায় আশপাশের অপূর্ব মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি। রামদানার গোলাপী আভা, রডোডেনড্রন, পাইনের সুবিশাল ছায়া আর গাছের পাতায় ঝিকিমিকি করা রোদের নাচন দেখতে দেখতে ছবির মতো উর্গম ভ্যালি আমাদের আক্ষরিক অর্থে নিয়ে যায় প্রকৃতির মাঝে। পথেই পড়ে সপ্তবদ্রীর দুই বদ্রী – ধ্যান বদ্রী আর বৃদ্ধ বদ্রী। স্থানীয় বিশ্বাস দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা তৈরি করেন এই মন্দির। বদ্রীনাথের বদ্রীবিশালের অবিকল ধ্যানরত মূর্তি, গড়ুরদেব, ঘণ্টাকর্ণ সবারই দেখা মিলবে অতি প্রাচীন এই দুটি মন্দিরে। এরপর আসে ছবির মতো সুন্দর দেবগ্রাম। এ গ্রাম যেন সত্যিই দেবতাদের গ্রাম। একটু এগোতেই, জঙ্গল ঘেরা পথে চোখে পড়বে আদিম গন্ধ মেখে দাঁড়িয়ে থাকা আরও একটি দ্রষ্টব্য, যার নাম আদি(বৃদ্ধ)কেদার। ইতিহাস কত প্রাচীন হতে পারে, এইসব মন্দিরগুলি তার প্রমাণ। গোটা পথটাতেই আমাদের সঙ্গী দুধ সাদা রঙের কল্পগঙ্গা, তীব্র গর্জন করে যে সারাক্ষণ পথের পাশটিতে বয়ে চলেছে।
যোশীমঠের আগেই হেলং মোড়ে, ছোটো এক রাস্তা হাইরোড থেকে নীচের দিকে হঠাৎ অলোকানন্দা ব্রিজের দিকে চলে গেছে। ওই পথ ধরেই শুরু হয় কল্পেশ্বর যাত্রা। উর্গম খুবই ধসপ্রবণ এলাকা, তাই নতুন রাস্তা তৈরি হলেও পদে পদে সে পথে রয়েছে মরণকূপ।
কল্পগঙ্গা
কল্পগঙ্গায় লাফিয়ে পড়া ঝরনা
দেবগ্রাম থেকে নিম্নগামী পথটি ধীরে ধীরে কল্পগঙ্গার উপর শোয়ানো একটি ছোট্ট ব্রিজে গিয়ে থেমে যায়। এ পর্যন্তই গাড়ি যাবে। কারণ সামনেই একটা সাইনবোর্ড জানান দেয়, আর ৩০০ মিটার এগোলেই পঞ্চম কেদারের দরজায় গিয়ে পৌঁছাব আমরা। গাড়ি থেকে নামতেই চোখ টানে সামনের সুউচ্চ পাহাড় থেকে কল্পগঙ্গায় লাফিয়ে নামা এক সুন্দরী ঝরনা। লোহার ঝুলা পেরিয়ে কিছুটা চড়াই পথ ভেঙে এরপর সোজা পৌঁছে যাওয়া কল্পেশ্বর কেদারে। এত শান্ত, ধ্যানমগ্ন দেবস্থান ভারতবর্ষে বোধহয় হাতে গোনা। বিশাল এক ঘণ্টা বাজিয়ে ‘জয় কল্পেশ্বর মহাদেব’ বলে ডেকে উঠতেই তা শোনার জন্য যেন উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এখানকার নন্দীদেব। কালো পাথরের বৃষদেবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই যেন মূল মন্দিরে ঢোকা। গুহার আড়ালে এখানে ফুলের শৃঙ্গারে সজ্জিত কল্পেশ্বর মহাদেবকে দেখলে সত্যিই মন ভরে যায়, প্রকৃতির অপূর্ব প্রকাশে মাথা নত হয়ে আসে। আদি শঙ্করাচার্য প্রতিষ্ঠিত দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ভুক্ত স্থানীয় পুরোহিতরা বংশ পরম্পরায় এই মন্দিরের পূজারী। অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে নিরাপদ, নিরালা আশ্রয়ের নির্ভরতা এনে দেয় এই কল্পেশ্বর দর্শন। এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে মনে।
কল্পেশ্বর
কীভাবে যাবেন
ঋষিকেশ-বদ্রীনাথ রাস্তায় যোশীমঠ থেকে আসুন হেলংয়ে। সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে লিয়ারি হয়ে সোজা দেবগ্রাম আর তারপর ৩০০ মিটার পায়ে হেঁটে কল্পেশ্বর মন্দির।
কোথায় থাকবেন
আগের দিন রাতে হেলংয়ের হোটেলে রাত্রিবাস করলে পরদিন সকালে সেখান থেকে কল্পেশ্বর পৌঁছে, দর্শন করে আবার দুপুরের মধ্যে ভালোভাবেই হেলং ফেরা যায়। তবে ছবির মতো সুন্দর উর্গম ভ্যালি বা দেবগ্রামে থাকতে হলে এখানকার হাতে গোনা কয়েকটি হোম-স্টের সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ করে নেওয়া ভালো। এই মন্দির চত্বরে অবশ্য দর্শনার্থীদের থাকার কোনও ব্যবস্থা নেই।
_________________
পথের দেবতার আশ্চর্য ম্যাজিক দেখতে এবং ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিকতার খানিক স্পর্শ পেতেই আমরা শুরু করেছিলাম পঞ্চকেদার যাত্রা। পাখির চোখ নিয়েই বহু দূর দূর পথে হেঁটে চলেছিলাম। যে কোনও শুরুরই যে শেষ থাকে! সময়ের নিয়মে আজ সেই যাত্রার অন্তিম লগ্ন। তবে ফুরায় যা, তা ফুরায় শুধু চোখে। তাই-ই তো মনের চোখটি এখন দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে। বেড়ানোর নেশা বড়ো অদ্ভুত। এই নেশার টানে মানুষ ঘটি বাটি পর্যন্ত উল্টে দিয়ে সব ছেড়েছুড়ে বেরিয়ে পড়তে পারে। আর এ ক্ষেত্রে বাঙালিদের তো জুড়ি মেলা ভার। তবে প্রাদেশিকতার সীমানা ছাড়িয়ে প্রকৃতিকে দু-চোখ ভরে দেখতে, অজানা দুর্গমকে ভালোবেসে সুগম করে ফেলতে যারা মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এই ‘পাখির চোখ পঞ্চকেদার’ সিরিজটি তাদের জন্য খানিক গল্প বুনে দিল। এবার সেই গল্পকে পূর্ণতা দেওয়ার সুযোগ আপনার হাতে। হাঁটুতে বল আর খাঁচায় দম থাকতে থাকতে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বেরিয়ে পড়ুন দেখি!
সমাপ্ত