বিশ্বের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত শিবমন্দির রয়েছে তুঙ্গনাথেই

অনেকটা পথ ফেলে এসেছি। আমাদের এবারের গন্তব্য, পঞ্চকেদারের তৃতীয় কেদার ‘তুঙ্গনাথ’ (Tungnath)। পাঁচ কেদারের সর্বোচ্চ এই তুঙ্গনাথেই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত শিবমন্দির। উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলায়, মন্দাকিনী এবং অলকানন্দার উপত্যকার উপর অবস্থিত তুঙ্গনাথের উচ্চতা প্রায় ১২,০৭৩ ফুট। প্রাচীন মিথ অনুযায়ী, পঞ্চপাণ্ডবের থেকে আড়াল হতে দেবাদিদেব গুপ্তকাশীতে মহিষরূপ ধারণ করলে, এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়া সেই মহিষরূপী শঙ্করকে খুঁজতে থাকেন দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম। তখন শিবের বাহু ছড়িয়ে গিয়ে পড়ে এই তুঙ্গনাথে। পুরাণ অনুযায়ী, তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। হিন্দু-বৌদ্ধযুগে যখন বৌদ্ধধর্ম লোকায়ত হিন্দু ধর্মের আড়ালে উত্তর ভারত ছাড়িয়ে তিব্বত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, সেই সময়পর্বের সাক্ষী এই মন্দির। এখানকার নির্মাণে তাই বৌদ্ধ স্থাপত্য রীতির আদল। পরবর্তীতে আদিশঙ্করাচার্য নতুন করে এই মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে প্রথম এখানে নিয়মিত পুজোর প্রচলন করেন।
মহিষরূপী শিবের হৃদয় ও বাহু পুজো হয় তুঙ্গনাথে। অন্য আর একটি কিংবদন্তি, শিবের বর পেতে লঙ্কাধিপতি রাবণ নাকি তুঙ্গনাথে এসে তপস্যা শুরু করেছিলেন। আবার শিবের ভক্ত রাবণ বধের পাপস্খালনে রামচন্দ্রও নাকি তুঙ্গনাথের সর্বোচ্চ শিখর ১৩,১২৩ ফুট উঁচুতে অবস্থিত চন্দ্রশিলায় তপস্যা করেছিলেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস। চন্দ্রশিলা নামটি ঘিরেও রয়েছে রোমাঞ্চকর এক মিথ। রাজা দক্ষ প্রজাপতির সাতাশ জন কন্যা সন্তানের মধ্যে অন্যতম সুন্দরী তনয়া রোহিণীর প্রেমে পড়েন দেবতা চাঁদ। অপরাধ বলে গণ্য এই কাজের জন্য, রাজার অভিশাপে চাঁদের ‘ক্ষয়’ রোগ হয়। রোগ থেকে মুক্তি পেতে এই তুঙ্গনাথ শিখরেই চাঁদ, শিবের তপস্যা করেন। চাঁদের তপস্যাস্থল থেকেই জায়গার নাম হয় চন্দ্রশিলা। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সীমারেখা পার করে, এই চন্দ্রশিলায় সত্যিই আজও পূর্ণিমার আলোতে চাঁদের অপার্থিব কিছু দৃশ্য তৈরি হয়। দুর্লভ সেই সব দৃশ্যের একমাত্র সাক্ষী প্রাকৃতিক উপায়ে একটার পর একটা জড়ো হওয়া এখানকার নুড়ি পাথর। দেখে মনে হয় কোনও মনোযোগী শিল্পী বুঝি নিজের হাতে সাজিয়ে রেখেছেন এদের।
চন্দ্রশিলা জিরো পয়েন্ট
এমনই সব আশ্চর্যকে ছুঁয়ে দেখতে হলে, তুঙ্গনাথ পর্যন্ত পৌঁছাতেই হবে। আর তার একমাত্র উপায় রডোডেনড্রনের ছায়া ঘেরা চড়াই ধরে ট্রেকিং-পথ বরাবর হাঁটতে থাকা। তুঙ্গনাথের বেস ক্যাম্প চোপতা, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা প্রায় ৯,০০০ ফুট। কুয়াশা ঘেরা সবুজ পাহাড়, ঘন সবুজ বুগিয়াল আর তুষার ধবল পাহাড়ের ব্যারিকেড ঘেরা চোপতাকে বলা হয় ভারতের সুইজারল্যান্ড। নিজের অপূর্ব সৌন্দর্যে চোপতা একেবারে ডাকসাইটে এক সুন্দরী, যার আভিজাত্য আছে প্রবল, সঙ্গে আছে যৌবনের দারুণ দীপ্তি। উখীমঠ থেকে গাড়িতে, সারি হয়ে চোপতা পৌঁছানো যায় একবেলার মধ্যেই। হাতে সময় থাকলে অবশ্যই সারিতে নেমে দুই কিমি খাড়াই পথে ৭,০০০ ফুট ট্রেক করে দেখে নেওয়া যায় ‘দেওড়িয়া’ তাল। শান্ত সমাহিত এই তালের স্বচ্ছ জলে সকাল আর বিকেল শেষে দুধ-সাদা চৌখাম্বা রেঞ্জের অপার্থিব জলছবি যখন তৈরি হয়, তখন মনে হয় সব পরিশ্রম যেন সার্থক। দু-চোখ ভরে সবুজ বুগিয়ালের অপূর্ব নিস্তব্ধতার অনুভব শেষে, রত্নেশ্বর শিবকে দর্শন করে আবার গাড়িতে এসে বসলে বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায় চোপতায়। বেশ ভালো ঠান্ডায়, প্রকৃতির কোলে টেন্টের মধ্যে এখানকার রাত্রিযাপন, পরের দিনের যাত্রাপথের রোমাঞ্চ আর উত্তেজনাকে অবধারিত বৃদ্ধি করবেই।
প্রাকৃতিক উপায়ে একটার পর একটা সাজানো পাথর, চন্দ্রশিলায়
তুঙ্গনাথের বেস ক্যাম্প চোপতা, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা প্রায় ৯,০০০ ফুট। কুয়াশা ঘেরা সবুজ পাহাড়, ঘন সবুজ বুগিয়াল আর তুষার ধবল পাহাড়ের ব্যারিকেড ঘেরা চোপতাকে বলা হয় ভারতের সুইজারল্যান্ড।
রাত শেষে ভোর হয়, সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে, শুকনো খাবার আর জল নিয়ে এরপর ট্রেকিং পয়েন্টে পৌঁছে লাঠি নিয়ে শুরু হয় হাঁটা। কখনও ঘন সবুজ বুগিয়ালের পাশ দিয়ে, কখনও বিচিত্র রঙে মোড়া রডোডেনড্রন, পাইন, ওক, ম্যাপেল, উইলোর ছায়া ঘেরা অপরূপ আঁকাবাঁকা চড়াই পথ ধরে তিন কিলোমিটারের একটু বেশি চললেই, একসময় চোখে পড়ে মন্দির চূড়া। পাহাড়ের প্রকৃতি যে প্রতি মুহূর্তে চমক দেয় তার জলজ্যান্ত প্রমাণ যেন এই পথ। মেঘ রোদের খেলা এখানে চলতেই থাকে অহরহ। মন্দিরের কপাট শীতকালে বন্ধ থাকলেও ট্রেকিংয়ের জনপ্রিয়তার জন্য অল্প শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বসন্তে এ পথে উৎসাহী ট্রেকারসদের দেখা মেলে ভালোই। সবচেয়ে আশ্চর্য এখানকার প্রকৃতিও এক এক ঋতুতে এক একভাবে হতবাক দর্শকের সামনে নিজেকে মেলে ধরে। কখনও বরফে মোড়া এ পথ, আবার কখনও নানা রঙের রডোডেনড্রনের ছায়া ঘেরা। অনেকটা উঁচুতে অবস্থানের জন্য চলতি পথে কখনও অক্সিজেনের অভাবে কারোর কিঞ্চিৎ সমস্যা হয়, তবে পাহাড়ের ঢাল বরাবর, যেন কত যুগের সাক্ষী অতলস্পর্শী সব খাদ আর নিজেকে উজাড় করা প্রকৃতিকে দেখলে, তা বেশিরভাগ নিশ্চিত কেটেই যায়। অবিকল কেদারনাথের মন্দিরের আদলে গ্রানাইট পাথরে তৈরি তুঙ্গনাথ মন্দিরটির দেওয়াল সুন্দর কারুকার্যময়, যার চূড়ায় রয়েছে সোনার প্রলেপ দেওয়া তামার পাত। সামনের বাঁধানো অংশের এক পাশে রয়েছেন পঞ্চেশ্বরী মাতা, ভগবান বিষ্ণু, গৌরীশঙ্কর ও ভৈরবনাথ। গর্ভমন্দিরে ঢুকতেই চোখে পড়ে লিঙ্গ মূর্তি ও তার পিছনে আদিশঙ্করাচার্যের তৈলচিত্র, বাঁদিকে কালভৈরব এবং ডানদিকে ঋষি বেদব্যাস। এখানেও অন্যান্য কেদারের মতো মন্দিরের সামনে আছেন নন্দীদেব। শীতকালে তীব্র ঠান্ডার জন্য টানা ছ-মাস এখানকার পুজোপাঠ বন্ধ থাকে।
তুঙ্গনাথ যাওয়ার পথে গণেশ মন্দির
চোপতা থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মক্কমঠে, তখন দেবতার প্রতীক মুখোশপুজো হয়। আদিশঙ্করাচার্য দক্ষিণ-ভারতীয় লিঙ্গায়েত ব্রাহ্মণদের দিয়ে এখানে পুজো শুরু করেছিলেন। বর্তমানে দীর্ঘকাল ধরে এই মক্কমঠ গ্রামের স্থানীয় মৈথানি ব্রাহ্মণরাই রয়েছেন মন্দিরের পুরোহিতের দায়িত্বে। যাত্রাপথের দুর্গমতা এবং উচ্চতার কারণে অনেক তীর্থযাত্রীরা তুঙ্গনাথে থেমে গেলেও প্রকৃতিপ্রেমী, অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ট্রেকাররা তুঙ্গনাথে রাত্রিবাস করেন, ভোরবেলা খাদ বরাবর, এক্কেবারে ২ কিলোমিটার খাড়াই পথে আরও উপরে ট্রেকিং করে সূর্যোদয় দেখতে চলে যান চন্দ্রশিলায়। চৌখাম্বা, নন্দাদেবী, নন্দাঘুণ্টি, পালকি, কামেট, নীলকণ্ঠ, কেদারডোম, সুদর্শন, মেরু-সুমেরুর মতো তুষারধবল শৃঙ্গের ৩৬০ ডিগ্রির অভূতপূর্ব ‘ভিউ’ পাওয়া যায় এই চন্দ্রশীলা থেকেই। তীব্র ঠান্ডা হাওয়া বেশিক্ষণ এখানকার শিখর দেশে দাঁড়াতে দেয় না ঠিকই, কিন্তু আকাশছোঁয়ার এক অসাধারণ মুক্তির আবেশে বিমুগ্ধ হয় মন-প্রাণ। একবার এই স্বর্গীয় দৃশ্য চাক্ষুষ করলে তা আর সারাজীবনে ভোলা মুশকিল। সাধ্যের মধ্যেই স্বপ্নপূরণের অনবদ্য সুযোগ করে দেয় চন্দ্রশিলা ট্রেক। এর জন্য দরকার কেবল একটু শারীরিক সক্ষমতা আর তার চেয়েও আর একটু বেশি মনের জোর৷ ব্যাস, তাহলেই মোটামুটি ৪-৫ ঘণ্টায় গোটা তুঙ্গনাথ-চন্দ্রশিলার রোমাঞ্চকর ট্রেক সম্পূর্ণ করে ফেলা যায়। বেলাশেষের মিইয়ে যাওয়া আলোয়, আরও একবার তুঙ্গনাথজিকে দর্শন করে যখন ফেরার পথে পা এগোয়, চারপাশের রডোডেনড্রনগুচ্ছে তখন জমে বিকেলের ভিজে হাওয়া। পথের প্রান্তে লেখা হয়ে থাকে, শিখর ছুঁয়ে সুস্থ শরীরে ফিরে আসার এক অদ্ভুত তৃপ্তি।
বসন্তে তুঙ্গনাথ যাওয়ার রাস্তায় রডোডেনড্রন
কীভাবে যাবেন
হরিদ্বার থেকে উখীমঠ পেরিয়ে সারিগ্রাম হয়ে, কিংবা একটু ঘুরপথে হৃষিকেশ থেকে গোপেশ্বর হয়ে, চোপতায় পৌঁছে টেন্টে রাতে থাকুন। পরদিন ভোরবেলা সেখান থেকে গাড়িতে ট্রেকিং পয়েন্টে পৌঁছে তিন কিলোমিটার মতো চড়াই ভাঙলেই, দুই/আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন তুঙ্গনাথ। সেখান থেকে আরও ২ কিলোমিটার উঁচুতে উঠলেই চন্দ্রশিলা। তুঙ্গনাথ পর্যন্ত ঘোড়া বা পিট্টু মিললেও চন্দ্রশিলা হেঁটেই উঠতে হবে। দেওরিয়া তাল থেকে রোহিণী বুগিয়াল ট্রেক করেও তুঙ্গনাথ, চন্দ্রশিলা পৌঁছানো যায়।
কখন যাবেন
তুঙ্গনাথ মন্দির খোলা থাকে মে থেকে কমবেশি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। কালীপুজোর পর মন্দির বন্ধ হয়। অক্টোবরে ঠান্ডা তুলনায় কম, মন্দিরের কপাটও খোলা থাকে বলে ওইসময় সবচেয়ে বেশি মানুষ যান। তবে মার্চ-এপ্রিল মাস নাগাদ নানা রঙের শোভায় মেতে ওঠা রডোডেনড্রন দেখতেও বহু পর্যটক এ পথে আসেন।
তুঙ্গনাথের রাস্তা
কোথায় থাকবেন
চোপতায় রাত্রিবাসের জন্য পর্যাপ্ত টেন্ট আছে। তুঙ্গনাথ মন্দির চত্বরে রাতে থাকতে হলে, রয়েছে মন্দির কমিটির গেস্টহাউজ। মোটামুটি মাথা গোঁজার জন্য যথেষ্ট। এই গেস্টহাউজে জোয়ার-বাজরা বা আটার রুটি, রাজমা, কিংবা খিচুড়ির সঙ্গে মেলে পাহাড়ের কোলে নিস্তব্ধ পরিবেশে রাত কাটানোর এক দারুণ সুযোগ।
_____________________
*কেদারনাথ, মদমহেশ্বর, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, কল্পেশ্বর - পঞ্চকেদারের রোমহর্ষক ভ্রমণকাহিনি এবার বঙ্গদর্শনে। পড়ুন পিয়ালী বসুর (Piyali Basu) ধারাবাহিক ‘পাখির চোখ পঞ্চকেদার’। প্রতি শুক্রবার, দুপুর ৩টেয়।