No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    কেদারনাথের পর এবার মদমহেশ্বর, যেখানে দেবতার প্রসাদ চকোলেট আর বিস্কুট!

    কেদারনাথের পর এবার মদমহেশ্বর, যেখানে দেবতার প্রসাদ চকোলেট আর বিস্কুট!

    Story image

    গত পর্বের পর

    ঞ্চকেদারের দ্বিতীয় কেদার মদমহেশ্বর (Shri Madmaheshwar) বা মধ্যমহেশ্বর। প্রাচীন কিংবদন্তি অনুযায়ী গুপ্তকাশীতে যে বৃষরূপী মহাদেবকে জাপটে ধরতে চেয়েছিলেন দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম, তাঁরই পেট ও নাভি এসে পড়েছিল গাড়োয়াল হিমালয়ের এই জায়গায়। কথিত আছে, স্বয়ং ভীমই এই মন্দিরের নির্মাতা ও প্রথম তাঁর হাতেই এখানে আদিদেবের পুজো হয়। শিব-শরীরের মধ্য অংশ স্পর্শধন্য  এ জায়গার নাম তাই মধ্যমহেশ্বর।

    জনপ্রিয়তার নিরিখে কেদারনাথের (Kedarnath) মতো ভিড় নেই মদমহেশ্বরের পথে। তুলনায় বেশ দুর্গম হওয়ায় কেদারনাথ ফেরত হাতে গোনা যাত্রী বা উৎসাহী ট্রেকারসই মধ্যমহেশ্বরের পথে পা বাড়ান। আগের পর্বেই আমাদের ব্যাগ খানিকটা গোছানো ছিল, এবারে তাই মদমহেশ্বরের পথে এগোনোই যায়। দ্বিতীয় কেদার মদমহেশ্বরে পৌঁছানোর মূলত দুটি পথ। একটি গুপ্তকাশী থেকে কালীমঠ হয়ে দীর্ঘ ট্রেক পথ, আর আরেকটি হল গুপ্তকাশী থেকে উখীমঠ পৌঁছে সেখান থেকে মদমহেশ্বরের পথটি ধরা। তুলনায় কম সময়ের এই পথটি ধরেই এবারের যাত্রা শুরু হোক।

    জনপ্রিয়তার নিরিখে কেদারনাথের মতো ভিড় নেই মদমহেশ্বরের পথে। তুলনায় বেশ দুর্গম হওয়ায় কেদারনাথ ফেরত হাতে গোনা যাত্রী বা উৎসাহী ট্রেকারসই মধ্যমহেশ্বরের পথে পা বাড়ান।

    শীতের সময় কেদারনাথের মতোই মদমহেশ্বরের দেবতার প্রতীক পুজোও হয় উখীমঠের ওঙ্কারেশ্বর মন্দিরে (Omkareshwar Temple)। উখীমঠে মন্দির দর্শন করার পর, এখান থেকেই  কখনও সবুজ জঙ্গল কখনও বা খাদের পাশ দিয়ে যাওয়া পাহাড়ি পথ ধরে মনশুনা, যোগাসু, ওনিওনা ছাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া যায় পাহাড়ি জনপদ রাঁশির দিকে। এখানেই সবুজে ঘেরা রাস্তায় পড়বে রাকেশ্বরী মন্দির। এরপর আরও ২ কিলোমিটার মতো এগোলে চলে আসবে রাঁশি গ্রাম। ব্যাস, সড়ক পথ এখানেই শেষ। মদমহেশ্বর পৌঁছাতে হলে এখান থেকেই এরপর ট্রেকিং পথ ধরে এগোতে হবে। খুব সকালে উখীমঠ থেকে বেরোলে এই রাঁশি পর্যন্ত পৌঁছবার পরেও দিনের আলো তখনও বেশ কিছুটা থাকবে। তাই পায়ে পায়ে তখনই যদি এখান থেকে সবুজে ঘেরা পথে আরও ঘণ্টা দুই হেঁটে, গৌণ্ডার গ্রাম পেরিয়ে বানতোলি পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া যায়, তাহলে সেদিন রাতে থাকার মতো ছোটখাটো হোমস্টে মিলবে এখানেই। প্রতিকূল পরিবেশে, কম লোকসংখ্যার এই গ্রামগুলিতে হোটেল বা গেস্ট হাউসের আরামদায়ক পরিষেবা না মিললেও দুর্গম পথের রসদ হিসাবে খাবার আর জলের বন্দোবস্ত মেলে, আর মেলে পাহাড়ি মানুষের আন্তরিকতা।

    মদমহেশ্বর যাওয়ার পথে বুগিয়াল

    এই বানতোলি হল মার্কন্ডেয় গঙ্গা আর সরস্বতী নদীর সঙ্গম স্থল। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে মদমহেশ্বর গঙ্গা বা মধুগঙ্গা। পরদিন সকালে এই পথেই শুরু হয় মদমহেশ্বরের খাড়া চড়াইয়ের ট্রেকিং। ১০ কিলোমিটার রাস্তায় ৪০০০ ফুট উপরে উঠতে হয় বলে এই পথে স্বভাবতই কেবল কঠিন চড়াই আর চড়াই। তবে, ‘চড়াইসে নিরাশ না হো’, কারণ সারাটা পথে সঙ্গী হবে রংবেরঙের রডোডেনড্রন, দেওদার, পাইনের অপূর্ব শোভা, আর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে দূরের ধবধবে সাদা চাদরে মোড়া চৌখাম্বা, মন্দানী প্রভৃতি শৃঙ্গগুলি। প্রত্যেক দু-তিন কিলোমিটার পর পর খাটারা, নানুর, মাইখাম্বা, কুনচটি নামে ছোটো ছোটো কয়েকটা চটি পড়বে, যেখানে বসে একটু জিরিয়ে নেওয়া যায়। শুকনো খাবার, জল, কিংবা রামদানার রুটি খেয়ে আবার শেষবারের মতো ‘জয় শ্রী মদমহেশ্বর’ বলে হাঁটতে শুরু করলেই দুপুরের পরপরই পৌঁছে যাওয়া যায় মদমহেশ্বর মন্দির চত্বরে। তবে, কুনচটি থেকে মন্দিরে পৌঁছানোর শেষ দু-আড়াই কিলোমিটার রাস্তা সত্যিই বেশ কঠিন খাড়াই। পুরো ট্রেকিংটাই দিনের আলোয়, রোদের তাপ থাকলে শীত তেমন লাগে না, কিন্তু একটু ছায়া পড়তেই ঠান্ডা হাওয়া ভালোমতোই জানান দেয় তার অস্তিত্ব। তাই উপযুক্ত গরম পোশাক ব্যাগে থাকা আবশ্যক। তিন দিক অদ্ভুত ঘন সবুজে ঘেরা এই মদমহেশ্বরের রূপ আরও খুলে দিয়েছে মন্দিরের ঠিক পিছন দিক থেকে উপরে দৃশ্যমান চৌখাম্বা রেঞ্জ।

    বৃদ্ধ মদমহেশ্বর

    উত্তর ভারতীয় রীতিতে তৈরি মধ্যমহেশ্বর দেখতে অবিকল প্রথম কেদার ‘কেদারনাথ’ কিংবা তৃতীয় কেদার ‘তুঙ্গনাথের’ মতোই। গর্ভগৃহের কালো পাথরে নির্মিত নাভি আকৃতির শিবলিঙ্গ দর্শন সেরে এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়বে আরও বহু প্রাচীন দুটি মূর্তি। একটি দেবী পার্বতীর ও আরেকটি হল চতুর্ভুজ অর্ধনারীশ্বর মূর্তি। মাইসোর, কর্ণাটক থেকে শঙ্করাচার্যের তত্ত্বাবধানে আসা লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের দক্ষিণ ভারতীয় পুরোহিতরাই বংশ পরম্পরায় এ মন্দিরের পূজারী। উত্তর-দক্ষিণের সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন পঞ্চকেদারের প্রায় সর্বত্রই ঘটেছে।  মদমহেশ্বরে মূল মন্দিরের ডানদিকের ছোটো মন্দিরটিতে রয়েছেন জ্ঞান অধীষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর সুন্দর এক প্রাচীন মার্বেল মূর্তি। স্থানীয় মানুষেরা মন্দিরের সন্ধ্যারতির সময়, বাড়িতে আসা অতিথি-সহ এখানে উপস্থিত থাকেন সবাই। বহু প্রাচীন এই সংস্কার। মন্দির চত্বরেই টিনের তৈরি অস্থায়ী আবাসে মোটামুটি প্রয়োজনীয় পরিষেবায় রাতটা কাটিয়ে, সকালে এখান থেকে আরও দুই কিলোমিটার ওপরে উঠে দেখে নেওয়া যায় বৃদ্ধ মদমহেশ্বর মন্দির। এখানে দেবতার প্রসাদ ভারি মজার – চকোলেট আর বিস্কুট।

    অর্ধনারীশ্বর মূর্তি

    উত্তর ভারতীয় রীতিতে তৈরি মধ্যমহেশ্বর দেখতে অবিকল প্রথম কেদার ‘কেদারনাথ’ কিংবা তৃতীয় কেদার ‘তুঙ্গনাথের’ মতোই। গর্ভগৃহের কালো পাথরে নির্মিত নাভি আকৃতির শিবলিঙ্গ দর্শন সেরে এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়বে আরও বহু প্রাচীন দুটি মূর্তি।

    খুবই ছোটো অথচ বহু প্রাচীন এই মন্দিরে এসে দাঁড়ালেই পিছনে দৃশ্যমান হয় অপূর্ব সুন্দরী চৌখাম্বা, মন্দানী রেঞ্জ। সাদা সবুজে ঘেরা এই অপূর্ব শান্ত, সমাহিত দৃশ্যপটের সামনে একবার দাঁড়ালে তা সারাজীবনে আর ভোলা দুষ্কর। মোটের ওপর হাতে দিন দুই সময় থাকলে মদমহেশ্বর ট্রেক ভালোভাবেই করে ফেলা সম্ভব। তবে, পায়ে আরও একটু জোর আর মনে বারো আনা সাহস আরও বেশি থাকলে মদমহেশ্বর মন্দির চত্বরে রাতে টেন্টে কাটিয়ে, পরেরদিন সকালে সেখান থেকে আরও ১৬ কিলোমিটার ট্রেক করে, জনমানব শূন্য, স্বর্গীয় পরিবেশে অবস্থিত কাঞ্চনি তালে পৌঁছানো যায়। তবে, উত্তরাখণ্ড সরকারের বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ; কাঞ্চনি তালের পথ, খুবই দক্ষ ট্রেকারস ব্যতীত সাধারণ যাত্রী বা ট্রেকারদের জন্য একেবারেই সুবিধাজনক নয়। তাই দরকার বাড়তি মানসিক প্রস্তুতি ও শারীরিক সক্ষমতা।   

       কীভাবে যাবেন   

    হরিদ্বার থেকে উখীমঠ হয়ে রাঁশি পেরিয়ে বানতোলি। তারপর, পরদিন বানতোলি থেকে ট্রেকিং পথে মদমহেশ্বর।

       কোথায় থাকবেন   

    রাঁশি, গৌন্ডারা, বানতোলিতে ছোটো ছোটো হোম-স্টে রয়েছে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পরিষেবায়। মন্দির চত্বরে থাকার জন্য নিজস্ব টেন্টই ভালো। প্রয়োজনে মন্দির কমিটির সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ করলে হোমস্টে জাতীয় দুএকটি ছোটো ছোটো টিনের ঘরও মিলতে পারে। সঙ্গে রাখুন শুকনো খাবার, জল, প্রয়োজনীয় ওষুধ।      

    চলবে...       

    __________________________________

    *কেদারনাথ, মদমহেশ্বর, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, কল্পেশ্বর - পঞ্চকেদারের রোমহর্ষক ভ্রমণকাহিনি এবার বঙ্গদর্শনে। পড়ুন পিয়ালী বসুর (Piyali Basu) ধারাবাহিক ‘পাখির চোখ পঞ্চকেদার’। প্রতি শুক্রবার, দুপুর ৩টেয়।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @