চোখের সামনেই গুপ্ত যুগে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া পৃথিবীখ্যাত মন্দির – কেদারনাথ

চঞ্চল মন্দাকিনী, বেশ কিছু থাকার জায়গা, অল্প কিছু দোকানপাট, সরু পায়ে চলা পথের পাশে মাঝারি এক জনপদ – এই নিয়েই গৌরীকুণ্ড (Gaurikunda)। কেদারনাথ ট্রেকিং পথের গেটওয়ে বলা যেতে পারে যাকে। এখানকার উষ্ণ প্রস্রবণে কুণ্ডটি সেই ২০১৩-র ভয়ংকর বিপর্যয়ে নষ্ট হয়ে গেলেও পাথরের ফাঁক গলে এখনও গরম জল বেরনোর চিহ্নটি এখানে স্পষ্ট। ভোর ভোর গৌরীকুণ্ড থেকে কেদারনাথজির উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলে সারাদিন সময় থাকে হাতে। তাই এখানকার গৌরীমায়ের মন্দিরটি দেখে নেওয়া যায় সহজেই। প্রচলিত পৌরাণিক মিথ গৌরীকুণ্ডের উষ্ণ প্রস্রবণে স্নানের সময় পার্বতী যে হলুদ মাখছিলেন, তা দিয়েই কৌতূহলবশত একটি শিশুপুতুল বানিয়ে তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে জন্ম হয় গণেশের। আরও একটি মিথ, গৌরীকুণ্ডেই কঠোর তপস্যা করে পার্বতী দেবাদিদেবকে তুষ্ট করেন এবং স্বয়ং নারায়ণকে সাক্ষী রেখে এখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে ত্রিযুগীনারায়ণে হর-পার্বতীর চার হাত এক হয়। কিন্তু আমাদের হাতে আজ সময় কম। ফিরতি পথের জন্য তোলা থাক এই মন্দির দর্শন।
ঘোড়া বা ডান্ডি মারফত কেদারনাথ (Kedarnath) পৌঁছাতে হলে এখান থেকে তা নেওয়া যায়। আর নির্ভেজাল ট্রেকিং শুরু করলে এখানেই শুরু হয় একটানা সিঁড়ি ভেঙে বেশ অনেকটা চড়াইয়ে উঠে কেদারনাথের কংক্রিট বাঁধানো রাস্তা। একেবারে অনভ্যস্ত হলে এইটুকু উঠতেই হাঁপ লেগে যায়। তবে, দম তো রাখতেই হবে, খেলা ঘোরানোর জন্য। সামনে যে অনেকটা পথ। আবহসংগীতে মন্দাকিনীর কলতান, জায়গায় জায়গায় বাঁধানো সে রাস্তায় বেখেয়ালে ঝাঁপিয়ে পড়া পাহাড়ি ঝরনার জলস্রোতের মধ্যেই পিচ্ছিল পথে সাবধানে এগিয়ে যাওয়া, একটু বিশ্রাম, একটু চলা এরকম করতে করতেই এরপর জঙ্গল চটি, ভীমাবলী পেরোলে একসময় সামনে পড়বে এক পায়ে চলা ব্রিজ। ২০১৩-র বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়ে রামওয়াড়া জনপদের স্মৃতিচিহ্ন যেন এটি। নতুন পথ প্রলয়ের সব চিহ্নকে আজও মুছে ফেলতে পারেনি। কত মানুষ হারিয়ে গেল, কত তাজা প্রাণ ভেসে গেল ভয়ংকরী মন্দাকিনীর (Mandakini River) স্রোতে। অতি পাষাণ হৃদয়ও এখানে উদাসী হয়। তবে, গন্তব্য যখন কেদারনাথ, আবেগি মনকে সঙ্গে নিয়েই এরপর পেরোতে হয় লোয়ার লিঞ্চোলি, আপার লিঞ্চোলির বেশ কষ্টসাধ্য খাড়াই পথ। সঙ্গের শুকনো খাবার, জল, চারপাশের অদ্ভুত সবুজ প্রকৃতি আর সামনের উঁচু পথে কেদারশৃঙ্গের হাতছানি পাকদণ্ডী বেয়ে ওপরে ওঠায় অবধারিতভাবে বাড়তি এনার্জি জোগাবেই। এরপর বেসক্যাম্প, নতুন পথের দেওদেখানি বা দেবদর্শনী। অর্থাৎ এখান থেকেই প্রথম নজরে আসবে মন্দির।
তারপর, এখান থেকে প্রায় সমতল রাস্তা ধরে এক কিলোমিটারেরও একটু বেশি এগোলেই সব পরিশ্রম সার্থক। এতদিনকার স্বপ্ন পূরণ। চোখের সামনেই উদ্ভাসিত গুপ্ত যুগে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া সেই পৃথিবীখ্যাত মন্দির - কেদারনাথ। শ্বেতশুভ্র কেদারশৃঙ্গ ও কেদারডোম যাকে ঘিরে রেখেছে, রোদের আলোয় কিংবা চাঁদের কিরণে যার সৌন্দর্য সবসময় অপার্থিব। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে পেরে ঘোর নাস্তিকও কৃতজ্ঞতাবশত এই জায়গায় নিশ্চিত জোড় হাত করে ফেলেন। বিস্ময়ের ঘোর নিয়ে এরপর এগিয়ে যাওয়া মূলমন্দিরের দিকে। প্রবেশ পথেই এখানে যাত্রী সাধারণকে সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন বিশাল আকৃতির নন্দীদেব। ২০১৩-র বিপর্যয়ে এই নন্দীদেবের গলা জড়িয়েই কত প্রাণ টিকে গেছিল কোনওমতে। মূলমন্দিরের তিনটে প্রকোষ্ঠ। প্রথম প্রকোষ্ঠে ঢুকেই ডানদিকে দরজার পাশে দেবী দুর্গার মূর্তি এবং চারদিকের দেওয়ালে কৃষ্ণ, পঞ্চপাণ্ডব-সহ দ্রৌপ্রদীর মূর্তি। দ্বিতীয় প্রকোষ্ঠ নাটমন্দিরে আছে পিতলের তৈরি এক ছোটো নন্দীদেব যার ঠিক সামনেই গর্ভমন্দিরের দরজা। পঞ্চপাণ্ডব থেকে আদি শঙ্করাচার্য়, আদিকাল থেকে কত সাধু সন্ত, কত ভক্ত, কত উৎসাহী যাত্রীজনের উপস্থিতির সাক্ষী এই গর্ভগৃহ।
সেখানে ঢুকতেই প্রদীপের অল্প আলোয়, ধূপ-ধুনো, ঘি, চন্দনের গন্ধ এবং ওম্ নমঃ শিবায়-এর সমবেত উচ্চারণ মিশে গিয়ে, বৃষের পিঠের কুজাকৃতির প্রস্তরময় জ্যোতির্লিঙ্গ তখন এক দুর্নিবার আকর্ষণে যেন আবিষ্ট করে মন-প্রাণকে। কেদার-লিঙ্গের ঠিক পিছনের দেওয়ালের একটি কুলুঙ্গিতে আছে পিতলের মহাদেবের সেই ধ্যানমূর্তি, শীতকালে যাঁকে শোভাযাত্রা করে নিয়ে যাওয়া হয় উখীমঠে। আর মন্দিরের পশ্চিমের দেওয়ালে, ছোটো একটা খুপরির মধ্যে অনির্বাণ জ্বলছে সেই প্রদীপ। সকলের জন্যই সমান কেদারনাথ। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে, স্নানান্তে বা স্নান না করেই, কেবল মনটাকে তাঁর পায়ে ঠেলে দিলেই কেদারনাথকে স্পর্শ ও আলিঙ্গন করতে পারেন যে কেউ। চারধাম যাত্রার তুঙ্গ সময়পর্বে না গেলে দর্শন কিংবা পুজো সেরে এরপর ইচ্ছেমতো নিরিবিলি সময় কাটানোর সুযোগ মেলে বহু প্রাচীন এই মন্দির চত্বরে।
শ্বেতশুভ্র কেদারশৃঙ্গ ও কেদারডোম যাকে ঘিরে রেখেছে, রোদের আলোয় কিংবা চাঁদের কিরণে যার সৌন্দর্য সবসময় অপার্থিব। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে পেরে ঘোর নাস্তিকও কৃতজ্ঞতাবশত এই জায়গায় নিশ্চিত জোড় হাত করে ফেলেন।
মন্দির প্রাঙ্গণেই দেখা মেলে নানারকম সম্প্রদায়ের সাধু সন্ন্যাসীর। তাঁদের মুখে মুখে ফেরে কেদারখণ্ড নিয়ে আরও কত রোমহষর্ক ঘটনা কিংবা প্রচলিত কিংবদন্তি। আবহ সংগীতে হয়তো তখন শিবমহিন্ম স্তোত্রের জলদগম্ভীর উচ্চারণ। মুগ্ধতার রেশ কাটতে চায় না কিছুতেই। বিগত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় কেদার মন্দিরকে তীব্র জলস্রোতের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া ভীমশিলাকে দেখলে সত্যিই অবাক হতে হয়। প্রকৃতির রোষে, বহুদূর পর্বত থেকে গড়িয়ে পড়তে পড়তে ঠিক নির্দিষ্ট একটি দূরত্বে কীভাবে থেমে গেছিল সেই বিশালাকৃতির পাথর খণ্ড, তার কোনও ব্যাখ্যা মেলে না আজও। সব ব্যাখ্যার প্রয়োজনও হয়তো নেই, তা না হলে বিস্ময় শব্দটিরই যে অস্তিত্ব থাকত না।
আগে, মন্দিরের পূর্বদিকে আদিগুরু শঙ্করাচার্যের (Shankaracharya) গদি ঘর ছিল। কথিত আছে এখানেই তিনি লিখেছিলেন বহু স্তোত্র, এখানেই সমাধিস্থ হয়েছিলেন কতশত বার। প্রাকৃতিক বিপর্যয় সেই ঘরের চিহ্ন সম্পূর্ণ মুছে দিলেও বর্তমানে মিলিটারি ক্যাম্পের পাশেই বসেছে শঙ্করাচার্যের বিশাল এক মূর্তি। মন্দির চত্বরটির চারপাশ এখন ২০১৩-র বিপর্যয়ে হারিয়ে যাওয়া কয়েক হাজার মানুষের স্মরণে উৎসর্গীকৃত। মন্দিরকে ঘিরে আগের মতো যে কোনওরকম নির্মাণ-কাজ, আজ তাই একেবারে নিষিদ্ধ। মূল মন্দিরের ডানদিকের পাহাড় ঘেঁষে বেশ খানিকটা উপরে উঠলেই ভৈরবনাথের মন্দির। উত্তরাখণ্ডের মানুষ বিশ্বাস করেন এই ভৈরবনাথই কেদারখণ্ডের ক্ষেত্রপাল। অন্যদিকে, মন্দিরের বামহাতের পাহাড়ের দেওয়াল বরাবর পথ উঠে গেছে অপূর্ব সুন্দর বাসুকিতালের দিকে। পায়ে জোর এবং দু-এক দিন কেদারনাথ মন্দির চত্বরে থাকার পরিকল্পনা থাকলে এই পথেও দিব্যি ট্রেক করা যায়।
অপার সৌন্দর্য আর বিস্ময়ে ঘেরা কেদারমন্দিরে মঙ্গলারতি, সন্ধ্যারতি দেখতে হলে অবশ্য থাকতেই হবে বেসক্যাম্পে বা মন্দির থেকে বেশ কিছুটা নীচের হোটেল, গেস্টহাউস কিংবা টেন্টে। পাহাড় তো প্রতিমুহূর্তে চমকে দেয়, তাই কখনও এখানে আচমকা মেঘ এসে নামে কেদারডোম ধরে, কখনও তীব্র বৃষ্টি বা হঠাৎ তুষারপাতে মন্দির চত্বর সম্পূর্ণ রূপ বদলে ফেলে চোখের নিমেষে। আবার কখনও বা ঝকঝকে পরিষ্কার নীল আকাশে হাজার তারার ঝিকিমিকি আলোয় উজ্জ্বল প্রাচীন কেদারনাথ মন্দির অপার মুগ্ধতায় আবিষ্ট করে দেয় মন-প্রাণ।
সবকিছুরই একসময় ‘সময়’ ফুরোয়। সময় আসে আবার নতুন কোনও গন্তব্যের দিকে যাওয়ার। অতএব, বিদায় কেদার। এবার ফেরার পথ ধরতে হবে। আর তারপর! সেই এক পাকদণ্ডী বেয়ে কেবল নামতে থাকা। প্রতিকূলতার মাঝেও পাহাড়ি মানুষজনের বেঁচে থাকার লড়াই, চড়াই ভাঙার অদম্য সাহস, মনের জোর আর মন্দাকিনীর কলতান সে পথেও সঙ্গী তখন।
কীভাবে যাবেনঃ
ট্রেন-রুটে হরিদ্বার থেকে বাসে/ শেয়ার/ ভাড়া গাড়িতে শোনপ্রয়াগ পৌঁছে শেয়ার জিপে গৌরীকুণ্ড এবং তারপর ট্রেকিং পথে কেদারনাথ। ফ্লাইটে, জলিগ্র্যান্ট এয়ারপোর্ট থেকে হৃষিকেশ হয়ে একইভাবে গৌরীকুণ্ড, তারপর ঘোড়া/ ডান্ডি মারফত অথবা পায়ে হেঁটে কেদারনাথ। হেলিকপ্টারে পৌঁছাতে হলে ফাটা/ সিরসি/ গুপ্তকাশী থেকে হেলিকপ্টার নিন। হেলিকপ্টারের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য মিলবে- heliservices.uk.gov.in এই ওয়েবসাইটে।
কোথায় থাকবেনঃ
গুপ্তকাশী, আপার লিঞ্চোলি, কেদারনাথ বেসক্যাম্পে গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের (GMVN) ব্যবস্থাপনায় বেশকিছু হোটেল আছে। এছাড়াও হরিদ্বার থেকে শোনপ্রয়াগের রাস্তায়, কমবেশি ভাড়ায় প্রয়োজন মতো হোটেল মিলবে রাত্রিবাসের জন্য। গৌরীকুণ্ড, ভীমাবলি, কেদার বেসক্যাম্পে মেডিকেল পরিষেবা পাবেন। ঘোর বর্ষার সময়টুকু এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। যাওয়ার আগে, উত্তরাখণ্ড ট্যুরিজমের ওয়েবসাইট থেকে কেদার যাত্রার নাম রেজিস্ট্রেশন-সহ প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নেওয়াই ভালো।
চলবে...
______________________________________
*কেদারনাথ, মদমহেশ্বর, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, কল্পেশ্বর - পঞ্চকেদারের রোমহর্ষক ভ্রমণকাহিনি এবার বঙ্গদর্শনে। পড়ুন পিয়ালী বসুর (Piyali Basu) ধারাবাহিক ‘পাখির চোখ পঞ্চকেদার’। প্রতি শুক্রবার, দুপুর ৩টেয়।