No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    “না উড়ে থেমেছো পাখি, সমস্তটা ওড়ো”

    “না উড়ে থেমেছো পাখি, সমস্তটা ওড়ো”

    Story image

    -“আপনি তো অনেক ছবিই ফেসবুকে দিয়ে দেন। চুরি হবার ভয় করে না?”

    -“আমার সব ছবি জনগণকে দিয়ে দিয়েছি। যে যা খুশি করুক।”

    আলাপটা শুরু হয় এভাবেই। বিনম্র, স্বভাব-শান্ত চিত্রশিল্পী মুক্তিরাম মাইতি-কে লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক-লেখকরা খুব ভালোভাবেই চেনেন। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিতে তাঁর কাছেই জমা করতে হয় লিটল ম্যাগাজিন মেলার অ্যাপ্লিকেশন, পত্রিকার সংখ্যা। এ তো তাঁর চাকরি মাত্র। আদতে মনে প্রাণে তিনি ছবি আঁকিয়ে। একটা বড় ক্যানভাসে তুলি দিয়ে আঁকা হচ্ছে কয়েকটা টানা টানা রেখা। লাল, নীল, কালো সেইসব রেখাদের মাঝে ভিড় করে আসছে কোনও মহিলার মুখ কিংবা মায়ের হারিয়ে যাওয়া ছেলেটি। ধরুন, আপনি সকালে প্রতিদিনের মতো বাজার করতে বেরোলেন। থলি ভর্তি বাজার করে বাড়ি ফিরে সদর দরজাটি খুলেই দেখতে পেলেন ঘরের মেঝে হয়ে গেছে সবুজ ঘাসে ভর্তি, আপনার মা ফিরে গেছেন যুবতী বয়সে, কোলে দোল খাওয়াচ্ছেন আপনার শৈশবকে। মাটি থেকে বড় বড় পোকা, লাল নীল পোকা কিলবিল করে উঠে এসে নিজেদের একটা জগত তৈরি করে ফেলেছে। আপনি বেশ কয়েকবছর পিছনে হাঁটতে শুরু করলেন। স্মৃতি সত্তা আর ভবিষ্যতের মাঝে আপনি হয়ে উঠলেন কল্পনা। আপনার চোখ দিয়েই আঁকা হল সেইসব পাহাড় প্রমাণ দৃশ্য। দৃশ্যের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার ভয় মুক্তিরামবাবুর নেই, বরং দৃশ্যকে বাড়ির ভিতর ঢুকিয়ে একেবারে বন্ধুস্থানীয় করে তোলায় বিশ্বাস রাখেন। পাশাপাশি বিনয়ে মাথা নত হয়ে আসে বারবার। মুখে লেগে থাকে মুচকি হাসির রেখা। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। চোখে চোখ রাখেন না, চোখ শুধুমাত্র তাঁর নিজস্ব ক্যানভাসে জাপটে থাকে।

    The Partition

    নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে যখন উত্তীর্ণ হলেন, তখন আলাপ হল চিত্রশিল্পী মৃণালকান্তি দাশের সঙ্গে। অবনীন্দ্রনাথের ঘরানার পর একমাত্র শেষ শিল্পী হলেন এই মৃণালবাবু। ওঁর সঙ্গে থেকেই তৈরি হল মুক্তিরামবাবুর ছবির প্রতি আসক্তি। গ্রাজুয়েশনের জন্য পড়তে গেলেন বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরে। মহারাজদের উৎসাহে পুরোপুরি ঢুকে গেলেন পেন্টিং-এ। সরকারি আর্ট কলেজে পরীক্ষা দিয়েও সুযোগ পেলেন না। অতএব নিজের চেষ্টায় বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে, এই ভরসা আর আত্মসম্বলটুকু নিয়ে আর ফিরে তাকাতে চাইলেন না। ৮৭ সালের স্থির সিদ্ধান্ত। সব ছেড়ে চলে আসবেন ছবিতেই। আলাপ হল প্রকাশ কর্মকারের সঙ্গে। বারবার গল্পকথায় ফিরে আসে ‘প্রকাশদা’র নাম। কীভাবে একটা ছবি নতুন ফরম্যাটে দর্শকদের সামনে আসতে পারে, কীভাবে দর্শক রিলেট করতে পারবেন সেই ছবি ইত্যাদি নানান বিষয়ে সাহায্য করলেন প্রকাশবাবু। প্রকাশদা একসময় তাড়িয়ে দিলেন। বললেন বাড়িতেই কাজ করতে, মাঝে মাঝে এসে ছবি দেখিয়ে যেতে। কথামতো মুক্তিরামবাবু দুমাস তিনমাস অন্তর যাচ্ছেন গুরুর কাছে, গুরু তাঁকে নতুন পথ চিনিয়ে দিচ্ছেন। এইভাবে একটা পারস্পরিক সহাবস্থান শিল্পীসত্তাকে ক্রমশ আঘাত করছে। গুরুশিষ্যের যাপনে ক্যানভাস হয়ে উঠছে একমাত্র ভালোবাসার রূপক।

    ১৯৯৩ সালে ‘লব-কুশ’ শিরোনামে মুক্তিরাম মাইতির প্রথম এক্সজিবিশন হল আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসের সাউথ গ্যালারিতে। আর্ট কলেজের ছাত্র না হয়েও এমন বড় মাপের কাজ দেখে অবাক হয়েছিলেন সেযুগের শিল্পীরা। বহুদিন আর কোনো এক্সজিবিশনের সুযোগ পেলেন না কোথাও। ১৯৯৬ সালে আবার প্রবাল রায় এবং কান্তি চৌধুরীর ছবির সঙ্গে মুক্তিরামবাবুর এক্সজিবিশন হল। দুটি ছবি বিখ্যাত হল- ‘জেসাস ক্রাইস্ট’ এবং ‘ফ্যামিলি’। সাদাকালো সরু তুলির টান, তাতে ধরা পড়ছে বিভিন্ন এক্সপ্রেশন। কলকাতা শহর এমন কাজ সেই প্রথম দেখল। কথা প্রসঙ্গে বলে ওঠেন, “আমি নিজেকে এখনও গুটিয়ে রেখেছি। নিজেকে প্রকাশ করবার সময় এখনও আসেনি।” কবিতা পড়তে ভালোবাসেন এই শিল্পী। ছবি আঁকতে আঁকতে বারবার ফিরে যান কবিতার কাছে। মনে করেন শিল্পীর একটা ছবির মধ্যে সাংঘাতিক কবিতা লুকিয়ে থাকে, তেমনই কবিতার মধ্যে থাকে ছবি। অফিস করে প্রতিদিন নিজের বাড়ি সোনারপুরে ফিরতে ফিরতে খুঁজে পান তাঁর আঁকা লাইনের কম্পোজিশন। চারপাশের মানুষ, গাছপালা, ঘরবাড়ি সবকিছুর মধ্যে জুড়ে দিতে চান নিজস্ব রেখার টান। এভাবেই ভাবনা বাঁচে, এভাবেই বাঁচে শিল্পীর স্বাধীনতা।

    ফাইন আর্টসে এক্সজিবিশন তারপর বেশ কয়েকবার হয়েছে। কিন্তু একক হিসাবে এখনও অসম্পূর্ণ। ইচ্ছা আছে একক প্রদর্শন করবেন বড় করে। তার জন্য নিজের কাছে সময় চেয়ে নিচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাক্টিভ থাকায় বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর নাম। বেড়েছে ঘনিষ্ঠতা। বিদেশী বন্ধুরা সবসময় উদ্বুদ্ধ করেন তাঁকে, সেকথা বারবার স্বীকার করে নেন। মুক্তিরামবাবুকে আমরা চিনতে পারিনি। শিল্পীদের চিনে ওঠা সহজ নয়। তাঁদের নিজস্ব পথের প্রতি সম্মান ছাড়া আমাদের হয়ত কিছুই দেবার থাকে না। শিল্পীরা বেঁচে থাকেন তাঁদের শিল্পের মাধ্যমে। মুক্তিরাম মাইতিদের এই জিতে যাওয়ার লড়াই আমাদের এগিয়ে যেতে শেখায়। ভাবনারা রং-তুলি সহযোগে মিলিত হয় বড় বড় ক্যানভাসে। যে লাইনের কম্পোজিশন মুক্তিরামবাবুর নিজস্বতা, তার পথ ধরে হাঁটা যাক আরও দীর্ঘ যাত্রাপথ। হাঁটা যেন না ফুরোয়। 

    The Guitarist

     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @