No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    জীবিত কিংবদন্তী যোগেশ দত্তর ছত্রছায়ায় শহরে উদযাপিত হচ্ছে মাইম

    জীবিত কিংবদন্তী যোগেশ দত্তর ছত্রছায়ায় শহরে উদযাপিত হচ্ছে মাইম

    Story image

    নৈঃশব্দ্যের শিল্প মূকাভিনয়। কোনও উচ্চারণ নেই, কেবল শরীরের ভঙ্গি। আর তাতেই হাজারও না বলা কথা যেন শব্দ হয়ে ওঠে। পদাবলীর (Padaboli) ৫২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে শহরে আয়োজিত হতে চলছে তিনদিনের মূকাভিনয় উৎসব (Mime Festival)। উৎসব চলবে ২৫, ২৬ এবং ২৭ জানুয়ারি। ফি বছর আয়োজিত হয় মূকাভিনয় উৎসব, এ বছর আয়োজনের ৪৪তম বর্ষ। যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমিতে (Jogesh Mime Academy) অনুষ্ঠিতব্য মূকাভিনয় উৎসবের আহ্বায়ক পদাবলীর প্রতিষ্ঠা-সভাপতি শ্রী যোগেশ দত্ত এবং তাঁর কন্যা পদাবলীর সম্পাদক প্রকৃতি দত্ত।

    কালীঘাটের যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমিতে মূকাভিনয় উৎসব চলবে ২৫, ২৬ এবং ২৭ জানুয়ারি

    মাইম এবং যোগেশ দত্ত কার্যত সমার্থক হয়ে গিয়েছে। ১৯৭০ নাগাদ পদাবলীর পথ চলা আরম্ভ হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে প্রকৃতি দত্ত বলছিলেন, “যোগেশ দত্ত উপলব্ধি করেছিলেন, মূকাভিনয়কে শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে তার ব্যাকরণ জানা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। তারপর ধীরে ধীরে পদাবলী প্রতিষ্ঠা করলেন। যেটা ওঁর ভাবনায় ছিল বা স্বপ্ন ছিল, তা বাস্তবায়িত করলেন। মূকাভিনয়কে একটা ভূমি দেওয়া, না হলে তো গাছ রোপণ করা যাবে না। তার একেবারে সূত্রপাত বা সূত্রটাই হচ্ছে পদাবলী। তারপর শাখা-প্রশাখা ডানা মেলল। প্রথমেই দলটা তিনি রেজিস্টার করলেন। বছর পাঁচেক পর জমি পেলেন। যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি পদাবলীর জমিতেই গড়ে উঠেছে।” 

    প্রকৃতি বলছিলেন, এখনও তাঁদের ত্রিশ শতাংশ শিল্পী মূক ও বধির। যোগেশবাবু ২০০১ সালে শুরু করেন ‘দ্য সাইলেন্ট ওয়ার্ল্ড’, এটি পদাবলীর একটি শাখা। ওঁদের তো আলাদা করে কোনও ভাবপ্রকাশের ভাষা নেই। মাইম-ই ভাব বিনিময়ের মাধ্যম। মাইম এখন রীতিমতো তাঁদের পেশা, মূকাভিনয় দেখিয়েই তাঁদের সংসার চলে।

    প্রকৃতি বলছিলেন, এখনও তাঁদের ত্রিশ শতাংশ শিল্পী মূক ও বধির। যোগেশবাবু ২০০১ সালে শুরু করেন ‘দ্য সাইলেন্ট ওয়ার্ল্ড’, এটি পদাবলীর একটি শাখা। মাইম-ই ওঁদের ভাব বিনিময়ের মাধ্যম। মাইম এখন রীতিমতো তাঁদের পেশা, মূকাভিনয় দেখিয়েই তাঁদের সংসার চলে।

    এ বছর ২৫ জানুয়ারি মূকাভিনয় উৎসবের উদ্বোধন হবে। প্রথম দিনে সমাবর্তন উৎসব হবে। যাঁরা মাইম শিখছেন, তাঁরা ওই দিন ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট পাবেন। (পদাবলীতে সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি অ্যাফিলিয়েটেড কারিকুলাম অনুযায়ী মূকাভিনয়ের কোর্স করানো হয়।) এ বছর পদাবলী সম্মানে ভূষিত হবেন প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব দেবশঙ্কর হালদার। উদ্বোধন-সন্ধ্যায় পৌরহিত্য করবেন তথা উৎসবের আচার্যের ভূমিকায় থাকবেন বিধায়ক দেবাশীষ কুমার। যাঁরা সমাবর্তনে সার্টিফিকেট পাবেন, তাঁরাই উদ্বোধনী মূকাভিনয় পরিবেশন করবেন। তারপর বিভিন্ন জেলা (শান্তিপুর, মালদা, বজবজ) থেকে আসা দল মূকাভিনয় পরিবেশন করবেন। প্রকৃতি জানাচ্ছিলেন, এবারে জেলা ভিত্তিক দল অনেক বেশি আসছে মূকাভিনয় উৎসবে। প্রায় সকলেই কোনও না কোনও সময়ে যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমির শিক্ষার্থী ছিলেন।

    দ্বিতীয় দিনের আকর্ষণ ‘শহিদ ক্ষুদিরাম’। এটা পদাবলীর নিজস্ব উপস্থাপনা, প্যান্টোমাইম। চিরাচরিত মাইমের সঙ্গে এই বিশেষ ধরনটির ফারাক হল, চিরাচরিত মাইমে এককভাবে, পোশাক বা মেক-আপ ছাড়াই উপস্থাপনা সম্ভব। কিন্তু প্যান্টোমাইমে পোশাক ও মেক-আপের সাহায্য নেওয়া হয়। ‘শহিদ ক্ষুদিরাম’ যোগেশ দত্তের সময়ের প্রোডাকশন, তবে হালে নতুন করে সাজানো হয়েছে। এটি পূর্ণ দৈঘ্যের নাটক, প্রায় আশি মিনিটের উপস্থাপনা। তবে দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান শুরু হবে নিউ ড্রিম মাইম গ্রুপের মূকাভিনয়ের মাধ্যমে, তাঁদের উপস্থাপনার নাম ‘আমাদের শৈশব’। গ্রুপের সকলেই যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমির প্রাক্তনী এবং এঁরা থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত। প্রকৃতি বলছিলেন, ২০১৫ সালে যোগেশ দত্ত-কে সরকার দীনবন্ধু পুরস্কার দেয়। তিনি তাঁর পুরস্কারের সমস্ত অর্থ থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বাচ্চাদের চিকিৎসার জন্য দান করে দিয়েছিলেন। সেই সূত্রে ১৫জন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বাচ্চা মাইম শিখতে আসে। তাঁরাই নিউ ড্রিম মাইম গ্রুপ গড়েছে, এখন পেশাগতভাবেই মূকাভিনয় পরিবেশন করেন তাঁরা। উৎসবের তৃতীয়দিনে, মূকাভিনয়ের দুনিয়ায় এই মুহূর্তের দুই তারকা দেবকুমার পাল ও সুমন মুখার্জীর দুটি প্রযোজনা রয়েছে। এঁরা দু’জনেই যোগেশ মাইমের প্রাক্তনী। সুমনবাবু মাইম আর ব্যালে মিশিয়ে কাজ করেন। এছাড়াও মাইম আর পেন্টিং মিশিয়ে ‘লাইনঅ্যাক্টিং’ পরিবেশন করবেন নিশীথ মন্ডল। তিনিও যোগেশ মাইমের প্রাক্তনী। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য বিভাগেরও একটি প্রেজেন্টেশন থাকছে। 

    নতুন করে সেজে উঠেছে যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি

    যে মাইম নিয়ে দিন তিনেকের কর্মযজ্ঞ, আজকের যুগে সেই মাইমের আদত অবস্থাটা ঠিক কেমন? মাইমের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ কতটা? এই নিয়েও কথা বলেছিলাম প্রকৃতি দত্ত'র সঙ্গে। তিনি জানাচ্ছেন, “আগে টেলিভিশন, খবরের কাগজের মাধ্যমে মাইমকে ছড়িয়ে দিতে পারতাম। সিমেনা দেখানোর আগে ‘প্রোমোশনাল ভিডিও’ করে মাইম দেখানো হত। ফলে মাইম সম্পর্কে খুব শক্তিশালী সামাজিক সচেতনতা ছিল। পারিপার্শ্বিক সব কিছুই খুব সক্রিয় ছিল। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত দূরদর্শন, যেহেতু এটা ভিজ্যুয়াল মিডিয়াম। দূরদর্শনে নিয়মিত মাইমের শো হত। সাত বা আটের দশকে জন্মেছেন এমন কাউকে জিজ্ঞাসা করলে বলবে, ‘আমরা তো মাইম টিভিতে দেখতাম।’ অর্থাৎ টিভি একটা ভূমিকা পালন করেছে। সেখান থেকে এখন জিনিসটা অনেকটাই সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ‘কমিউনিটি ওয়াচিং’ এখন নানান সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে গিয়েছে। যেটা কেন্দ্রীভূত ছিল সেটার তরলীকরণ ঘটেছে।” 

    ৪৪তম মাইম উৎসবের সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানসূচী

    নতুন প্রজন্ম প্রসঙ্গে প্রকৃতি বলেন, “বাংলায় বহু বেসরকারি স্কুল রয়েছে যেখানে মাইম শেখানো হয়। স্কুলস্তরে পড়ুয়ারা মাইম শিখে নানান দেশে গিয়ে মাইম দেখিয়ে আসছে। আমরা মাইমকে পাই, নাটক নিয়ে পড়লে তাও কলেজস্তরে অথবা নাটকের দলগুলো যখন মূকাভিনয় নিয়ে ওয়ার্কশপ করে তখন। স্কুলস্তরে কোনও মাইমের ট্রেনিং নেই। তার ফলে যখন পৌঁছচ্ছে তখন আকর্ষণ বাড়ছে। আগে এই আকর্ষণ বাড়ানোর পদ্ধতিগুলো অনেক সংঘবদ্ধ ছিল। প্রতিষ্ঠানের তরফে যতটা পারা যায় আমরা করছি। আগে কলেজের ছাত্রছাত্রীরা, নাটকের দল মাইম শিখতে আসত বেশি সংখ্যায়। এখন ছোটোরা, স্কুল পড়ুয়ারা বেশি আসছে।”

    মাইম-গুরু যোগেশ দত্ত

    এ দেশে মূকাভিনয়ের জন্ম দিয়েছিলেন যিনি, তৈরি করেছিলেন নিজস্ব ঘরানা, ৯২ বছর বয়সী সেই জীবিত কিংবদন্তী যোগেশ দত্ত’র ছত্রছায়ায় এ শহর এখনও মূকাভিনয় উদযাপন করছে ভাবলে আগামীর প্রতি আশা জাগে। তরুণ প্রজন্ম কোনও শিল্পের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে জানলে বড্ড নিশ্চিন্ত লাগে। মনে হয় সেই শিল্পের আয়ু আরও কিছুটা বেড়ে গেল।

    ছবিঋণ: Jogesh Mime Academy 

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @