শতবর্ষে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘অক্সফোর্ড’

কলকাতার পার্ক স্ট্রিট। তিলোত্তমার অন্যতম প্রাচীন এলাকা। যেখানে স্বদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে এসে মিশেছে পাশ্চাত্যের ব্লুজ, হার্ড রক। পার্ক স্ট্রিটকে নিছক রাস্তা বলে ভাবতে ভালো লাগে না। সে হল বড়লোকের বখাটে সন্তানের মতো। ঠিক যেন অর্ধেক সাহেব। খানিকটা ওই বাবা বিলিতি আর মা বাঙালি গোছের। সন্তান হয়ে উঠল অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। পার্ক স্ট্রিট নাকি প্রথমে ছিল একটা বাগান। হরিণ বাগান। এক সাহেবের বাগান। এই মেম আসছে, সাহেব আসছে, পার্টি হচ্ছে, রাত তিনটের সময় নেশার ফুর্তি হচ্ছে। লোকটার নাম ছিল এলিজা ইম্পে। ১৭৭৩ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস হলেন। তখন সুপ্রিম কোর্ট ছিল তৎকালীন গোবিন্দপুরে। এই এলিজা নামের লোকটাকে বলা হত ‘স্যার’। তারপর সাহেবদের ছোঁয়ায় এই উদ্যান হল স্ট্রিট। তাতে বাসা বাঁধল ঝাঁকে ঝাঁকে ব্যবসায়ী।
তেমনই একটি বই-দোকান অক্সফোর্ড। পার্ক স্ট্রিটের এই অক্সফোর্ড ১০০ বছরে পা দিল। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই ঐতিহ্যবাহী বইয়ের দোকান। বইপ্রেমীদের ডেস্টিনেশন। বাইরে খুঁজে নিতে হবে মনোমুগ্ধকর লাল চিহ্ন, যা আপনাকে বলবে, “By Appointment to HE Lord Mountbatten”।
বিংশ শতকের ব্রিটিশ এবং ভারতীয় ব্যক্তিত্বদের অনেক স্মৃতিকথায় অক্সফোর্ডের নানান উল্লেখ আছে। এছাড়াও ১৯৭০ সালে নকশাল আন্দোলনের মিটিং পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহৃত হত এই অক্সফোর্ড। যা কলকাতার নিজস্ব সংস্কৃতির অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধু। অক্সফোর্ড আয়োজন করে দেশের অন্যতম বড়ো সাহিত্য উৎসব, যেমন- এপিজে কলকাতা লিটেরারি ফেস্টিভ্যাল, এপিজে বাংলা সাহিত্য উৎসব এবং হিন্দি সাহিত্য উৎসব।
আরও পড়ুন: কুঞ্জে ‘অলি’ গুঞ্জে তবু...
দোকানের ভিতর থাকে থাকে সাজানো রয়েছে দেশ-বিদেশের সাড়া জাগানো সব বই। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই চোখে পড়বে চা-বার, ক্যাফে এবং ছোট্ট একটি মিটিং হল। বইপোকাদের একটু চা-কফি তো লাগবেই। সেই কারণেই এই ব্যবস্থা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দিনগুলিতে এই বই-দোকান ছিল যুগান্তকারী। ছিল খেলনা, সুগন্ধি, ছবির ফ্রেম। বয়স্ক মানুষরা তাই এখনও অক্সফোর্ড আসেন। হাতে তুলে নেন প্রিয়তম লেখকের বই। খুঁজে নেন ফেলে আসা সময়ের স্মৃতির ধোঁয়া। যে ধোঁয়া থাকে চায়ের কাপেও।
লেখক এবং বিভাগ অনুযায়ী সাজানো রয়েছে বইয়ের তাকগুলি। প্রবেশের সময় হঠাৎই চোখ পড়ে যায় জর্জ অরওয়েল, ইটালো ক্যালভিনো, অস্কার ওয়াইল্ড, আরকে নারায়ণ, ট্রুম্যান ক্যাপোতে, কাফকা, হারুকি মুরাকামি, ঝুম্পা লাহিড়ী, অরুন্ধতী রায়, মিলান কুন্দেরাদের। সুন্দর মলাটে তাঁরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। কী না নেই এখানে! ধর্মতত্ত্ব, চলচ্চিত্র, কমেডি, ফটোগ্রাফি, রাজনীতি, সমাজনীতি সব ধরনের দুর্দান্ত বিভাগ রয়েছে।
ফ্রেঞ্চ কর্নারে রয়েছে প্রায় ১০০টিরও বেশি শিরোনাম। যেগুলি ফ্রেঞ্চ বুক অফিস থেকে সংশোধিত। রয়েছে ইংরেজি এবং বাংলায় শক্তিশালী অনুবাদ। রয়েছে বিভিন্ন পোস্টার। যা মনে করাবে কলকাতার ইতিহাস। পুরোনো কালি দিয়ে কলকাতা সিটিস্কেপ এবং জল রঙের ছোঁয়ায় আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে সেগুলিকে।
কলকাতা মানেই শুধুমাত্র বাংলার সংস্কৃতি নয়। এখানে এসে মিশেছে পাশ্চাত্যের মধ্যরাত কিংবা অ্যাংলো ইন্ডিয়ার মাধুর্য। নানা ধর্ম, নানা বর্ণ, নানা সংস্কৃতির জন্যই কলকাতা হতে পেরেছে বিশ্বের পর্যটকদের কাছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডেস্টিনেশন, হতে পেরেছে ‘সিটি অফ জয়’। এই শীতের কলকাতায় ঘুরে আসুন অক্সফোর্ড। বই কিনুন। আর চুমুক দিন সুগন্ধি জেসমিনে।