উত্তরবঙ্গের একমাত্র বাজি কারখানার সঙ্গে মিশে রয়েছে এক বিস্মৃত শিল্পীর গল্প

দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো শেষ। এখন সামনে আলোর উৎসব দীপাবলি। আলোর উৎসব ঘিরে এখন ব্যস্ততা বাড়ছে। সেই ব্যস্ততা ছড়িয়ে রয়েছে উত্তরবঙ্গের একমাত্র বাজি কারখানাতেও। শিলিগুড়ি মহকুমার বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ফাঁসিদেওয়ার হাতিরামজোতে রয়েছে সেই বিখ্যাত বাজি কারখানা।
এই কারখানাতে তৈরি হয় বিভিন্ন রকম তুবড়ি, চড়কি, রং মশাল। সবই আতসবাজি। কারখানার মালিক জয়ন্ত সিংহ রায়ের ছোটোবেলা থেকেই বাজি তৈরির প্রতি নেশা। তবে অবশ্যই যে বাজিতে আওয়াজ হবে না, সেই বাজিই। এই নেশা থেকেই ১৯৯৮ সালে তিনি শুরু করেন বাজি কারখানা। তার আগে কলকাতায় গিয়ে নামী বাজি কারখানা থেকে বাজি তৈরির বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন তিনি। বাজি তৈরিতে বিভিন্ন উদ্ভাবনী শক্তিও একসময় প্রয়োগ করতেন জয়ন্তবাবু। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বস্তি এলাকাতে হাতির উৎপাত কমাতে একসময় বিশেষ ধরনের আলো ও শব্দের চকলেট বোম তৈরি করে তা বন দপ্তরকেও সরবরাহ করতেন। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে শব্দবাজি নিয়ে বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায়, হাতি চমকানোর শব্দবাজি তৈরিতে ভাঁটা পড়ে। যদিও তাঁর কথায়, এখনও বন দপ্তর, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ সেইরকম নির্দেশিকা নিয়ে তাঁর কাছে এলে তিনি আবার নতুন করে হাতি চমকানোর শব্দ বাজি তৈরিতে উদ্ভাবনী ভাবনা ভাবতে পারেন।
তবে এবারে দীপাবলির আগে জয়ন্তবাবুর আতসবাজি তৈরিতে বিরাট প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দুর্গাপুজোর আগে লাগাতর বৃষ্টি হয়েছে, লক্ষ্মীপুজোর আগেও বৃষ্টি হয়েছে। ফলে রোদের অভাবে বাজি তৈরির খোল থেকে শুরু করে অনেক তুবড়ি তারা রোদের অভাবে শুকোতে পারেননি। এবার তার মধ্যে অতিরিক্ত সমস্যা হল, বাজি তৈরির অনেক উপকরণ দেরি করে তাদের কারখানায় এসে পৌঁছেছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী তাঁরা এবার আতসবাজি তৈরি করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে চিন্তা দেখা দিয়েছে বলে জয়ন্তবাবু জানান।
তুবড়ি, রং মশাল, চড়কি ছাড়াও কদমগাছ, ঘোড়া গাছ-সহ আরও অনেক আতসবাজি তিনি তৈরি করেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে আতসবাজির প্রদর্শনী করারও ডাক আসে তাঁর কাছে। এবার পুজোয় ষষ্ঠীর দিন রাজ্য পর্যটন দপ্তর পর্যটন মেলার অঙ্গ হিসাবে আতসবাজি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। আর সেই প্রদর্শনীর পুরো পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন জয়ন্তবাবু। বেলা কোবাতে কলেজ মাঠে দশমীর দিন রাবণ পোড়ানো অনুষ্ঠানের পরিচালনাও করেন তিনি। তাঁরই হাতে তৈরি রাবণ বধ বা অন্যান্য বাজি দর্শকদের মন জয় করে। শুধু এবারই নয়, কোচবিহার রাজবাড়ি, সিকিমের রাজ্যপালের অনুষ্ঠান ছাড়াও উত্তরবঙ্গের যেখানেই আতসবাজির প্রদর্শনী হয়, পরিচালনার ভার পড়ে এই বাজি শিল্পীর ওপর। রাজ্য খাদি ও গ্রামীন শিল্পোদ্যোগ-এর উদ্যোগে কিছুদিন আগে গ্রামীন শিল্পের উপর এক অনুষ্ঠানে জয়ন্তবাবুকে রাজ্যভিত্তিক তৃতীয় স্থানাধিকারী হিসাবে পুরস্কৃত করা হয় কলকাতায়।
বাজি নিয়েই অনেক কিছু ভাবছেন এই বাজি শিল্পী। এখন যেসব বাজি তৈরি করেন তার একটি থেকেও কালো ধোঁয়া বা কার্বন বের হয় না। প্রতিটি বাজি থেকেই সাদা ধোঁয়া বের হয়। আর সেই সাদা ধোঁয়া সেভাবে দূষণ সৃষ্টি করে না। তবুও জয়ন্তবাবুর কথায়, একদম দূষণবিহীন বাজি তৈরির জন্য গবেষণা শুরু হয়েছে। ভারত সরকারও দূষণবিহীন বাজি আবিষ্কারের জন্য গবেষকদের উৎসাহিত করছেন। গবেষণার কাজ অনেকটা এগিয়েও গিয়েছে। তাঁরা আশা করছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ দূষণবিহীন বাজি বাজারে চলে আসবে। আতসবাজি তৈরির সময় বিশেষ ধরনের কিছু উপকরণ তাতে মেশানো হবে, যার জেরে বাজি পুড়লেও পরিবেশের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না। এখন তাঁরা গবেষণার ফলের অপেক্ষায়।
স্থানাভাবের কারণে তিনি অনেক কাজ করতে পারছেন না। বর্তমানে তাঁর পৌনে দুই বিঘা জমি রয়েছে। কর্মচারী দশ-পনের জন। আর কুড়ি-পঁচিশ রকমের বাজি তিনি তৈরি করেন। যদি আরও জমি সরকারি সহায়তায় লিজেও পান, তবে আরও বহু কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বহুরকম বাজি তৈরি করে এই শিল্পে আলোর ঝরনাধারা এনে দিতে পারেন বলেও তিনি দাবি করেন।