কলকাতার প্রাচীন মুদ্রা ভবন এক সময়ে ছিল রিজার্ভ ব্যাংকের অফিস

মাঝে বেশ কিছু দিন অচল মুদ্রার মতোই পড়ে ছিল কলকাতার প্রাচীন মুদ্রা ভবন। ইদানিং অবশ্য কাদা ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তবে বিমুদ্রাকরণের যুগে সেথায় আজ আর মুদ্রা প্রস্তুত হয় না। বিভিন্ন শিল্পের প্রদর্শনী হয়। শোনা যাচ্ছে, অচিরেই আরো নানান কাজেই ব্যবহৃত হবে। মেরামতির জন্যে আরো কিছু অর্থও বিনিয়োগ হতে চলেছে। ভালোই। শ্যাওলা-জমাট বাড়িটার গায়ে নতুন আলো ফুটছে।
ডালহৌসি চত্বর ছিল সাহেবদের প্রিয় জায়গা। একের পর এক চোখধাঁধানো ইমারতগুলি সেই অঞ্চল ঘেঁষেই তৈরি। চাইলেই যেন এক চক্কর ঘুরে নেওয়া যায় লালদিঘি, রাজভবন, রাইটার্স বিল্ডিং, টাউন হল-সহ পূর্বপ্রান্তের মুদ্রাভবনে। এখন ঝকঝকে সাদা রং এই বাড়িটির। শত বছর আগে অবশ্য কেমন রং ছিল, তা জানা মুশকিল। শহরজুড়ে যখন গথিক ছাদের জয়জয়কার, সেই সময় ইতালীয় ধাঁচায় তৈরি হয়েছিল বাড়িটি। ১৮৩৩ সালে। প্রথমে সেখানে ছিল আগ্রা ব্যাংক, তারপর তাতে যুক্ত হয় মাস্টার্স ব্যাংকিং কনসার্ন। তবে শোনা যায়, সেটি খুব একটা লাভজনক হয়নি। আর তদ্দিনে সরকারের বড়ো প্রয়োজন পড়ে একটি মুদ্রাভবনের। ব্যাংকের পরিচালকেরা বাড়িটি বিক্রি করে দেন সরকারের কাছে।
ভারি ঘটা করে শুরু হয়েছিল মুদ্রা ভবনের যাত্রা। একতলায় ছিল অফিস ঘর। সেখান থেকে ছেপে বেরোত সরকারি কাগজের নোট। প্রবেশপথে তৈরি হয়েছিল এমনি এক লোহার দরজা, যাতে সহজে মরচে পড়ে না। তিনটি ভাগে বিভক্ত কারুকাজময় বিশাল সেই সদর দরজা। সেন্ট্রাল হলটিতে তিনটি গম্বুজের ভিতর দিয়ে সকালের রোদ এসে পৌঁছাত। ছাদে বসানো ছিল কাচের জানলা। যাকে বলা হয় ভেনিস উইন্ডোজ। তাতেও খেলা করত সেকালের সোনা রোদ। ঘরের মেঝেতে ছিল ইতালীয় মার্বল। ছাদ তার বেশ উঁচুতে। এই প্রাচীন বাড়িটির নিচেই ছিল ভূ-গর্ভস্থ নালা। সেখান দিয়ে সরাসরি আসা যাওয়া করত হুগলি নদী। তাতে শীতল হত সদ্যপ্রস্তুত মুদ্রারা। অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নাকি এই নালাটিকে দেখতে ভিড় জমাতেন। এই বাড়িটিই ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত ছিল রিজার্ভ ব্যাংকের অফিস।
লালদিঘির কাছে এই বাড়িটিকে বাইরে থেকে দেখলে তার অন্দরকে বোঝা মুশকিল। বিশাল আয়তন ও সৌন্দর্য নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আজও। এখনকার সময়ের মতো করে সে খুঁজে নিয়েছে নিজের ব্যবহার। এটাই হয়তো ঠিক কাজ। সময়োপযোগী না হলে হারিয়ে যেতে হয়। তবে যা হয়, নতুন সময়ের প্রলেপ বসাতে গেলে পুরোনো চটা খসে পড়ে। সেই সঙ্গে কিছু ইতিহাসও খসে পড়ছে কি? কার কার যাতায়াত...? কী কী নীতি নির্ধারন, কী কী ভাবে মুদ্রায় বদল – এইসবের ছবি কি নতুন এই বাড়িটিতে ধরা দেবে? আমাদের খটকা থেকেই যায়।
আর খটকা থাকে সেদিনের এইসব নির্মাণ ঘিরে। আজকালকার এই যে এত সুবিশাল ইমারত, তেত্রিশ চৌত্রিশ তলার খাড়া উঠে-যাওয়া বাড়ি, এমন সৌন্দর্য তাদের থাকে না কেন? বাইরের হাওয়া-রোদ এমন রঙিন হয়ে ভিতরে প্রবেশের সেখানে অনুমতি পায় না কিচ্ছুতেই। ভয় হয়, এই বদ্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা শেষে মুদ্রা ভবনটির কাঠামোটিকেও ঢেকে না দেয়। নতুনের রং লাগলে পুরোনো সময়টা কিছুতেই আর ধরা পড়তে চায় না তো !