No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    প্রয়াত ‘গণদেবতা’, ‘পলাতক’, ‘দাদার কীর্তি’-র পরিচালক তরুণ মজুমদার

    প্রয়াত ‘গণদেবতা’, ‘পলাতক’, ‘দাদার কীর্তি’-র পরিচালক তরুণ মজুমদার

    Story image

    নব্বইয়ের দশক। সাদা-কালো থেকে ধীরে ধীরে ঘরে আসতে শুরু করেছে রঙিন টিভি। যৌথ পরিবার মিলে দুপুরের খাওয়া সেরে টিভিতে তখন ম্যাটিনি শো। পাড়ার লোক আসছেন। উপচে পড়ছে ভিড়। তখন সন্ধেবেলা বাংলা মেগা দেখার হিড়িকের থেকেও নজর কাড়ত টেলিভিশনের এই ম্যাটিনি শোগুলো। আট থেকে আশি গোগ্রাসে গিলতেন বাংলা সিনেমা। যাঁদের সিনেমা এই লিস্টে থাকবে, তাঁদের মধ্যে সবার আগে উঠে আসবে পরিচালক তরুণ মজুমদারের (Tarun Majumdar) নাম।

    সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল জমানার মধ্যে থেকেও তরুণ মজুমদার ছিলেন বাংলা সিনেমার ‘চিরতরুণ’। তাঁর চিত্রনাট্য পরিবারকে এক করে রাখার অনুপ্রেরণা জাগায়। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলার ঘর থেকে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছিল যৌথ পরিবারের সংজ্ঞা। নব্বইয়ের দশক দিয়ে শুরু করার কারণ, আশির দশকে টেলিভিশন আসার পর ঘরে ঘরে বাঙালি মননে আরও জাঁকিয়ে বসবেন তিনি। তরুণ মজুমদারের প্রথম ছবি ‘চাওয়া পাওয়া’ (১৯৫৯)। নয়ের দশকে এসে ১৯৯০ সালে তৈরি হল ‘আপন আমার আপন’। অর্থাৎ তাঁর ফিল্ম কেরিয়ারের গ্রাফটা প্রায় এক। নিজের গণ্ডির বাইরে কখনোই বেরোলেন না। বাঙালির খুব চেনা রং, গন্ধ, পরিবেশ, মানুষদের সঙ্গে নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারলেন প্রায় পাঁচ যুগ। এবং বাংলার সিনে-দর্শক কখনোই তাঁকে বর্জন করতে পারলেন না। ২০১৪ সালে প্রথম ধারাবাহিক তৈরি করলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’। যদিও সেই ধারাবাহিক খুব বেশিদিন চলেনি। 

    নিজের গণ্ডির বাইরে কখনোই বেরোলেন না তরুণ মজুমদার। বাঙালির খুব চেনা রং, গন্ধ, পরিবেশ, মানুষদের সঙ্গে নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারলেন প্রায় পাঁচ যুগ।

    সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন ততদিনে নিজেদের জাত চিনিয়েছেন। এর মাঝেই অন্য একটা ঘরানা, যা দর্শকের ভীষণ কাছের, খুব চেনা অথচ নিছক বিনোদন নয়— এমন কিছুই বলতে চাইলেন তরুণ মজুমদার। ‘পলাতক’ (১৯৬৩), ‘বালিকা বধূ (১৯৬৭), ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ (১৯৭৩), ‘গণদেবতা’ (১৯৭৮), ‘দাদার কীর্তি’ (১৯৭৯), ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ (১৯৮৫), ‘আলো’ (২০০৩)- বক্সঅফিস কখনও মুখ ফেরায়নি। অথচ বাংলা সাহিত্যকে বুকে করে বেঁচে ছিলেন তিনি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমল কর, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের উপন্যাস নিয়ে ছবি বানিয়েছেন। আর রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) ছিল তাঁর অন্তরে।

    সেই সময় বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ‘হিট’ পরিচালক আক্ষরিক অর্থে তিনিই। কত কত চরিত্র বুকের ভিতরে আঁকরে ধরে থাকলাম আমরা। পৃথিবীর বিপুল বিস্তৃত আকাশ আমাদের এক করে বেঁধে বেঁধে রাখতে চাইছে। বারবার ঘরে ফেরার টান অনুভব হচ্ছে মজ্জায়। শাপলা শালুক ভরা টলটলে পুকুর। নারকেল গাছের সারি, বাঁশবন। মাঝে মাঝে রোদ ঢুকছে, মাঝে মাঝে ছায়া। খড়ের চালের বসতবাড়ির মাঝে মাঝে টিনের চাল। মাচায় লাউ ডাটা ঝুলছে। তাঁর ছবি দেখেই প্রথম জানা বাংলার বুকে ছড়ানো কত রঙের গ্রাম। পলাশবুনি, কীর্ণাহার, মন্দিরা, বাতাসপুর, খণ্ডগ্রাম, বাতিকর, খয়রাশোল...।

    অযথা খ্যাতি বা প্রচারের আলোয় ছোটেননি কোনোদিন। বড়ো বড়ো ফিল্মি পার্টি চিরকাল এড়িয়ে গেছেন। তরুণ মজুমদারের ছোটোবেলা কেটেছে বগুড়া নামের একটা ছোট্ট শহরে। এখন তা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত। দেশভাগের পর চলে আসেন এপার বাংলার উত্তরবঙ্গে। ভুটান বর্ডারের কাছাকাছি প্রায়। ধীরে ধীরে নিজের মতো খুব সাধারণ ছবিই বানাতে চেয়েছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন বাংলার ঘরে ঢুকে সেই ঘরের মানুষদের কথাই বলবেন। তাঁর শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘ভালোবাসার বাড়ি’ (২০১৮)।

    ১৯৬২ সালে ‘কাচের স্বর্গ’ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার (National Award) পান তরুণ মজুমদার। পরবর্তীকালে আরও ৩টি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। আজ ৯১ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন বর্ষীয়ান এই পরিচালক। শেষ হল বাংলা চলচ্চিত্রের একটি বিস্তীর্ণ অধ্যায়। যখন গ্রামবাংলার কথা বাংলার সিনেমা থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন বারবার উচ্চারিত হয়েছে তরুণ মজুমদারের নাম। যুগের পর যুগ তিনি এভাবেই উচ্চারিত হবেন। অনুপ্রাণিত হবেন বাংলার অসংখ্য তরুণ সিনে-নির্মাতারা।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @